নদীবক্ষ হইতে সম্পদ আহরণ

বর্তমানের সামান্য লাভের আশায় দেশ-কালের বিরাট ক্ষতি করিয়া ফেলিতে প্রায়শই আমরা দ্বিধাহীন। চারপাশে আমাদের অপরিণামদর্শী কার্যকলাপের দৃষ্টান্ত রহিয়াছে ভূরি ভূরি। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্ট হইতে জানিতে পারা যায় যে, অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের পরিণামে হুমকির মুখে পড়িয়াছে নির্মাণাধীন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাঁধ। তিস্তার গ্রাস হইতে সীমান্ত জেলা লালমনিরহাট এবং নীলফামারীর বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষার্থে ডিমলা উপজেলার চরখড়িবাড়ি এলাকায় এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বাঁধটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হইলে তিস্তা পাড়ের হাজার হাজার মানুষ ভাঙ্গন ও বানভাসির বিপদ হইতে রক্ষা পাইবেন। কিন্তু, তাহার আগেই নির্বিবাদে চলিতেছে সেই সম্ভাবনা নস্যাত্ করিয়া দিবার কর্মকাণ্ড। নিষিদ্ধ বোমামেশিন পাতিয়া বাঁধের অদূরবর্তী তিস্তা নদী-বক্ষ হইতে সমানে উত্তোলন করা হইতেছে বালু ও পাথর। নদীবক্ষেই আবার স্তূপ করিয়া রাখা হয় সেই বালু-পাথর। ফলে বিঘ্নিত হইতেছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। এমনিতেই প্রমত্তা তিস্তা আজ ধু ধু বালুচর। তাহার স্বাভবিক প্রবাহ নাই। নাব্যতার সংকট তীব্র। এই ভরা বর্ষায়ও পানি নাই তিস্তাবক্ষে। ইহার কারণ যে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার সে বিষয়ে নূতন করিয়া বলিবার প্রয়োজন নাই। সেই সমস্যার সমাধানের বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সূত্রে গ্রথিত। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিপন্ন তিস্তাবক্ষে বালু ও পাথর উত্তোলনের নামে যাহা করা হইতেছে, তাহা মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা বলিয়া মনে করেন অনেকেই। এই কথা ঠিক যে, বালু ও পাথর বাংলাদেশের নদী-প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গুলি আমাদের সম্পদও বটে। নির্মাণ কাজের জন্য বালু অত্যাবশ্যকীয়। ইহার চাহিদা ক্রমাগত বাড়িয়া চলিয়াছে। পাথরও নির্মাণ কাজে বিশেষ করিয়া রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট ও সেতু নির্মাণে ব্যবহূত হয়। বাংলাদেশের সব নদীতে পাথর পাওয়া যায় না। তিস্তা নদী দ্বারা গঠিত উপ-বদ্বীপটি প্রধানত মৌটা দানা বিশিষ্ট বালু, বেলে ও নুড়ি পাথরের স্তর দ্বারা গঠিত। কাজেই এই নদীবক্ষের উল্লিখিত সম্পদ দুইটি মোটেও উপেক্ষা করিবার মত নহে। বলাই বাহুল্য, যেখানে সম্পদ আছে, সেখানে মানুষ যাইবেই, তাহা যত দুর্গমই হউক না কেন! কিন্তু, সম্পদ আহরণের মধ্যে নিয়ম-শৃংখলা থাকিতে হইবে। নদীবক্ষ হইতে বালু ও পাথর উত্তোলন করা যাইতেই পারে। আমাদের প্রয়োজনেই উহা উত্তোলন করিতে হইবে। কিন্তু, এই ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা যেমন প্রয়োজন, তেমনই অত্যাবশ্যকীয় হইল সেই নীতি মানিয়া চলা। যেখানে ইচ্ছা সেইখানে খনন করিয়া, বোমা মেশিন লাগাইয়া বালু বা পাথর তুলিয়া নেওয়া হইবে আর তাহাতে নদীর পাড়ের ভাঙ্গন ত্বরান্বিত হইবে কিংবা নিকটবর্তী বাঁধ-ব্রিজ হুমকির মুখে পড়িবে, এমনটি মানিয়া নেওয়া যায় না। নির্বিচারে বালু উত্তোলনের পরিণামে নদীপাড়ের কোনো জনপদে মারাত্মক ভাঙ্গন দেখা দিবার খবর ইতিপূর্বে পত্রিকায় ছাপা হইয়াছে। অনেক বাঁধ ও সেতু হুমকির মুখে পড়িয়াছে। অথচ পরিকল্পিত উপায়ে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হইলে আমাদের নদী ব্যবস্থায় কিছুটা হইলেও উপকার যুক্ত হইতে পারিত। নদীর নাব্যতার জন্য অতিরিক্ত বালু ও পাথর অপসারণ করিতে হয়। বালু উত্তোলনকারীদের দ্বারা সেই কাজের সামান্য অংশও যদি হইয়া যায়, তাহাতে আপত্তি করিবার কিছু থাকিতে পারে না! কিন্তু তাহা হইতে হইবে সুশৃংখল পন্থায়, বিশেষজ্ঞ নির্দেশিত নীতিমালা অনুযায়ী।