পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন
আবুল হোসেনের কমিশন ৪ ভাগ
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৩, ২২:৩৫
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ অনুযায়ী, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে ঘুষ বাবদ কার্যাদেশের ৪ শতাংশ অর্থ দেয়ার কথা ছিলো। রমেশ সাহার ডায়েরিতে লেখা ঘুষের তালিকায় সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর নাম থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে আসামি করেনি। মোট আটজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থাকলেও মামলা করা হয়েছে সাতজনের বিরুদ্ধে। বাদ পড়েছেন সৈয়দ আবুল হোসেন। আর বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ বাদ পড়ে যাওয়া আবুল হোসেনকে নিয়েই। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে করা দুদকের তদন্ত সম্পূর্ণ ও সঠিক হয়নি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ১১ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী হিসেবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের দায় তিনি এড়াতে পারেন না। জানুয়ারিতে বিশেষজ্ঞ প্যানেল দুদককে লিখিত আকারে জানিয়েছিলো যে, মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হিসেবে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সাবেক সচিবের অনুরোধে তিনি এসএনসি-লাভালিনের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে দেখা করে সম্ভবত অবৈধ অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা করেন। প্যানেল মনে করে, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর নাম মামলায় আসামি হিসেবে এনে তাকে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি হওয়ার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে মোট দুইবার বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছিলো বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সরকার মন্ত্রিসভায় রদবদল করলেও দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঋণ চুক্তি বাতিল না করে পর্যাপ্ত সময় দিয়েছিলো বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সরকার তা করেনি। পরবর্তীতে ঋণ চুক্তি বাতিল করলে সরকারের টনক নড়ে। পরবর্তীতে ৪ শর্তে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরে আসতে সমঝোতা হলেও সরকার শেষ পর্যন্ত তা মানেনি। সমঝোতা অনুযায়ী সম্পূর্ণ ও সঠিক তদন্ত করা হয়নি।
চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুদকের মামলা থেকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে বাদ দেয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত ও উপযুক্ত কারণ নেই। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত দুদক ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক এবং চিঠির মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অক্টোবর ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত জাপানের টোকিওতে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, অন্যান্য দাতা এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বৈঠক হয়। এরপর ১৪ অক্টোবর দুদক প্যানেলকে জানায়, সন্দেহ করার মতো কোনো তথ্য দুদকের হাতে নেই। পরবর্তীতে নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি সম্পর্কিত পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দুদকে হস্তান্তর করে। ডিসেম্বর ২ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত ঢাকায় দুদক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক তদন্তকারী দল। বৈঠকে সরকারি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাজা হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলেও আলোচনা হয়।
পরবর্তীতে ডিসেম্বর ১৭ তারিখে দুদক তদন্ত শেষ করে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে অন্য সাতজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি। তবে এজাহারে বলা হয়েছে, অনিয়মে এ দু’জনের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে। পরবর্তীতে ৯ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে সৈয়দ আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতাসহ প্রমাণাদী দুদককে দেয়া হয়। ২১ জানুয়ারি প্যানেলের প্রশ্নের জবাবে দুদক চিঠিতে জানায়, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে আসামি করার মতো দালিলিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে চিঠি দিয়ে জানান যে, পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সাহায্য বাংলাদেশ নেবে না। তবে পদ্মা নিয়ে অনিয়ম বিষয়ে তদন্ত চলবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরবে না জাইকা
পদ্মা সেতু প্রকল্পে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জাইকাও ফিরবে না বলে জানিয়েছে। বিডিনিউজ২৪.কম-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাইকার প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা বলেছেন, তাদের এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে জটিলতার কারণে সরে গেলেও পদ্মা সেতু প্রকল্পে জাইকা আবার ফিরতে পারে এমন গুঞ্জনের অবসান ঘটল তানাকার এই কথায়। গত মাসে নয়াদিল্লিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাইকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে জাইকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মাসাকাত নাকাহার আভাস দেন, বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিলে জাইকা পদ্মা প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। ভারত সফররত জাইকা প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার বলেছেন, পদ্মায় ফেরার কথা তারা ভাবছেন না।
এটা দাদাগিরি: আবুল হোসেন
বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের এ রিপোর্ট আন্তর্জাতিক আইন, ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও একটি সার্বভৌম স্বাধীন দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের প্রতি অবজ্ঞার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, এ রিপোর্ট আন্তর্জাতিক দাদাগিরির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, পরামর্শক নিয়োগে আমার কোন সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা সফরের সময় বিশেষজ্ঞ প্যানেল চেয়ারম্যান লুইস মোরেনো ওকাম্পো দুদক ও বাংলাদেশ সরকারের উপর আমাকে অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করার যে যুক্তিহীন চাপ দিয়েছিল এ রিপোর্ট তারই পুনরাবৃত্তি। এফআইআর-এ আমাকে আসামি না করায় “দুদক-এর তদন্ত পরিপূর্ণ ও সঠিক হয়নি” বিশ্বব্যাংক প্যানেল বিশেষজ্ঞদের এ মতামত অগ্রহণযোগ্য এবং যে কোন যুক্তি, আইন ও বিচারে ভুল সিদ্ধান্ত।
পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমি এসএনসি-লাভালিনকে সুযোগ করে দিয়েছি এবং অনৈতিক সুযোগ নিয়েছি রিপোর্টের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, সত্যতা ও যথার্থতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি ভুল সংকেত। পরামর্শক নিয়োগের মূল দায়িত্ব ছিল টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির।
মূল্যায়ন কমিটি ও বিশ্বব্যাংক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সুপারিশ চূড়ান্ত করে। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়নে প্রথমে এসএনসি-লাভালিন দ্বিতীয় হয়। বিষয়টি সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংককে অবহিত করা হলে বিশ্বব্যাংক দুইটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়নের জন্য নির্দেশনা দেয়। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করায় মূল্যায়নে এসএনসি-লাভালিন দ্বিতীয় থেকে প্রথম হয়। এমতাবস্থায় এসএনসি-লাভালিনকে দ্বিতীয় থেকে প্রথম করতে কোন অনিয়ম বা ব্যত্যয় হয়ে থাকলে তা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের ওই নির্দেশনার কারণে, মূল্যায়ন কমিটির তরফ থেকে। এর সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা খোঁজা যে কোন যুক্তিতে উদ্দেশ্যমূলক।
বিশ্বব্যাংকের এক্সটারনাল বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চূড়ান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী মন্ত্রী হিসেবে আমি অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ-এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, উদ্দেশ্যমূলক এবং পক্ষপাতমূলক মন্তব্য। মন্ত্রী হিসেবে আমি চূড়ান্ত ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ নই, চূড়ান্ত অনুমোদনকারী নই। মন্ত্রী হিসেবে আমি মূল্যায়ন কমিটির সদস্যও নই। এক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদনকারী।
পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন না করে সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করা, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীকে আমার সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা দেয়ার জন্য এ উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।