দুদক নখদন্তহীন বাঘ
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৩, ২২:৩৬
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দুদককে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ বলে মন্তব্য করে বলেছেন, দুর্নীতি দমনে তাই তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে আইনের সংস্কার ও দুদককে শক্তিশালী করতে হবে। গতকাল বুধবার দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিদায়ী সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ কথা বলেন। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে দুদকে যোগদানের পর ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, দুদক এখন একটি দন্তহীন ব্যাঘ্র। তার নখগুলোকে কেটে দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাহীন করার প্রক্রিয়া চলছে। চার বছর পর বিদায়ের মুহূর্তে আবার তিনি একই কথা বললেন। গোলাম রহমান বলেন, বর্তমান বিচার ব্যবস্থা ও একাধিক আইনি জটিলতায় দুদক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। দুদক যদি সমাজের চিহ্নিত দুর্নীতিগ্রস্ত কমপক্ষে একশ’ লোককে শাস্তি দিতে না পারে তাহলে দুদক নখ-দন্তহীন বাঘই থেকে যাবে। আইনি প্রক্রিয়ার কারণেই দুদকের এ অবস্থা। দুদক চেয়েছে সব সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার কারণেই তা হয়নি। সমাজের চিহ্নিত শ’ খানেক অপরাধীও যদি দুর্নীতির দায়ে শাস্তি পেত, তাহলে মানুষ দুদকের ক্ষমতা বুঝতে পারতো। কিন্তু এখন সংস্থার কর্মকাণ্ড অনেক বেড়েছে, তিনশ’র মতো তদন্ত কর্মকর্তা এবং বছরে কয়েক কোটি টাকা আইনজীবীদের পিছনে খরচ করার পরও দুর্নীতি দমনে তেমন কোন অগ্রগতি হচ্ছে না।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক হৈ চৈ হয়েছে। অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। আদালত অনেক মামলা ৫ বছরের জন্য স্থগিতাদেশ দিয়ে রেখেছেন। মামলায় তারিখের পর তারিখ পড়ে। কোটি কোটি টাকা আইনজীবীদের পেছনে খরচ হয়। এর রেজাল্ট কি? রেজাল্ট কিছুই না। চার বছরে আপনার কি সাফল্য? এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম রহমান বলেন, না, আমি সফল নই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা রয়েছে, সেগুলো বিবেচনা করবে জনগণ। যদি দুর্নীতির দায়ে দ্রুত বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারতাম, তাহলে নিজেকে সফল মনে করতাম। চার বছরে নিজেকে হতাশ মনে হয়েছে। তবে এ বিষয়টি আমার হাতে নেই। আইনের সীমাবদ্ধতার জন্য কিছুই করা যায় না।
বিশ্ব ব্যাংকের কথায় দুদক চলবে না
বিশ্ব ব্যাংক যা বলবে তাই স্বতঃসিদ্ধ নয়। কিছু বিষয়ে অহেতুক হৈচৈ করে তারা। তাদের কথা অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত চলতে পারে না। দুদক নিজের আইনের ধারা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিশ্ব ব্যাংকের কথায় দুদক চলবে না। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক অনেক হৈচৈ করেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছে। তাকে সরিয়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আমরাও মসিউরকে দুদকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। কিন্তু ফাইনাল রিপোর্টে তার নাম-গন্ধও নেই। এ পর্যন্ত ৩২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কেউ-ই মসিউরের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেননি। বিশ্ব ব্যাংকের কথায় দুদক চলে না, চলবে না। দুদক তাদের কথায় কেন চলবে? দুদক দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী চলবে। দুদকের মামলায় সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রীকে আসামি করতে বিশ্ব ব্যাংকের মতামত প্রসঙ্গে গোলাম রহমান বলেন, ‘ওরা (বিশ্ব ব্যাংক) একজন ভদ্রলোককে এফআইআর-এ আসামি করতে বলেছিল। আসামি করা হয়নি। উনি একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান, এ কারণে তার সম্মতি ছাড়া কিছুই হয়নি-এমন সন্দেহে আসামি করতে বলেছে। দুদক বিষয়টি আইনিভাবে দেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাকে আসামি করার মতো কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই তাকে আসামি করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে তদন্তে দোষ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং তাকে আসামি করা হবে।
পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি নয় দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে
গোলাম রহমান বলেছেন, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি নয় বরং দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি এখনো মনে করি, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পদ্মা সেতুর মতো এত বড় একটি প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করা ঠিক হয়নি। ষড়যন্ত্রকারীরা যাতে কোনোভাবেই দুর্নীতি করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন করা উচিত ছিল।
চার বছরের মেয়াদ শেষে গোলাম রহমান সংস্থার চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিদায় নেবেন আগামী ২৩ জুন। তিনি এ পদে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৯ সালের ২৪ জুন। দুদক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর গত ৪ বছরে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয় দুদকের কার্যক্রম। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলা ও সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার ঘটনায় দুদকের তদন্ত ও ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এছাড়া তার আমলে হলমার্ক এবং ডেসটিনি কেলেঙ্কারির মতো আলোচিত ঘটনার অনুসন্ধান ও মামলা হয়।