জন্মসূত্রে নয় স্বেচ্ছায় বাংলাদেশি হয়েছি

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি বলেছেন, জন্মসূত্রে নই বরং নিজের পছন্দে আমি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছি। আমি কখনোই এদেশে আত্মগোপনে ছিলাম না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় তত্কালীন সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সুপারিশে আমি প্রথম বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। বুধবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের উপস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেয়া নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্যে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষ্য প্রদানকালে ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি তিনি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে আসা, পাসপোর্ট গ্রহণ, ব্যবসা পরিচালনা, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেন। নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বার বার রাষ্ট্রপক্ষের বাধার মুখে পড়েন এই সংসদ সদস্য। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় জবাব দেন তিনি। নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। বাংলাদেশের জনগণ এবং মুসলিম উম্মাহর পক্ষে তার অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এছাড়া কোন বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বা দলের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নেই বলেও জানান। জবানবন্দি শেষে মামলার কার্যক্রম আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল। জবানবন্দিতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি তখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলাম। সে সময় ডিপার্টমেন্টের একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন বিচারপতি স্যার জাফর উল্লাহ খান। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক আদালতের একজন বিচারক। ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবে জন্ম নেয়ায় তার দেশপ্রেম নিয়ে একজন ছাত্র প্রশ্ন তুলেছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি পাকিস্তানি কারণ তোমার মা পাকিস্তানি। কিন্তু আমি নিজ পছন্দের কারণে পাকিস্তানি। আর আমিও পছন্দসূত্রে একজন বাংলাদেশি। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমি লন্ডনের বাসিন্দা ছিলাম। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে আমি ঢাকায় আসি। ব্রিটিশ ভ্রমণ ডকুমেন্ট নিয়ে আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বিভাগে প্রবেশ করেছিলাম। সে সময় বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের সুপারিশ বাধ্যতামূলক ছিল। এটা রেকর্ডে থাকা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে জন্ম নেয়া অনেক মানুষ বাংলাদেশে ফিরেননি। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে লিংকন্স ইন থেকে আমি বার পরীক্ষার প্রথম পর্ব শেষ করি। ১৯৭৪ সালে আমি দ্বিতীয় পার্টের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং কাউটস এন্ড কোম্পানিতে কাজ করছিলাম। এরই মধ্যে ১৯৭৩ সালের ১৮ই জুলাই আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। লন্ডনে আমি খুব ভালো ছিলাম। কিন্তু তার পরও দেশে ফিরে আসি। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের বর্ণনা মতো চুপিচুপি আমি বাংলাদেশে ফিরিনি। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি আমি আত্মগোপনে ছিলাম। কিন্তু ১৯৭৪ অথবা ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময় পর্যন্ত আমি কখনোই আত্মগোপনে ছিলাম না। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে আমি কিউসি শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমার কার্যক্রম শুরু করি। এ কারণে আমি কমপক্ষে ছয় বার দেশের বাইরে ভ্রমণ করেছি। যদিও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় আমি দেশের বাইরে ছিলাম। আমি এবং আমার পরিবার এ বর্বর হত্যাকাণ্ড রুখতে কোনো অবদান রাখতে না পারায় আমি খুবই কষ্ট পাই। তিনি বলেন, সেদিন যাদের দায়িত্ব ছিলো বঙ্গবন্ধুকে নিরাপত্তা দেয়া তারা সেদিন দায়িত্ব পালন না করে এখন মায়াকান্না করছে। তিনি বলেন, আজ যদি বঙ্গবন্ধু বা তার স্ত্রী কিংবা আমার বন্ধু শেখ কামাল বেঁচে থাকতেন তাহলে আমাকে এ মামলার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো না। তবে ট্রাইব্যুনাল এ বক্তব্য জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করেনি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার মরহুম পিতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যকার সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু নিজে তার আত্মজীবনীতে বর্ণনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কিছুদিন পর প্রথমবারের মতো আমাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সালাউদ্দিন কাদের তার আগের দিনের দেয়া জবানবন্দির একটি অংশের সংশোধনী দিয়ে বলেন, বঙ্গভঙ্গের সময় ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড কার্জন। তিনি বলেন, ২০০ বছর ধরে ভারতে মুসলমানরা ব্রিটিশ রাজের ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। যারা ভাগ এবং শাসনের (ডিভাইড এন্ড রুল) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি অনুসরণ করেছিল। ব্রিটিশরা হিন্দুদের সুবিধা দিয়েছিল আর মুসলিমদের করেছিল বঞ্চিত। বাংলা ভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কবি রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের বিরোধিতা মুসলিমদের আহত করেছিল। ব্রিটিশরাজও এতে বিরক্ত হয়েছিল। জবানবন্দির সময় রাষ্ট্রপক্ষের বারংবার বাধা প্রতিদিনই জবানবন্দি দেয়ার সময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। জবানবন্দিতে সালাউদ্দিন কাদের বলেন, আমার অনুমান ও বাস্তবতার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ৯০ দশকের শুরুর দিকে ভারতের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিং প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সফরসঙ্গী হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। যশোবন্ত সিং এবং আমি জর্জটাউন স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের এ্যালামনাই’র সদস্য। ভালো বন্ধুও। তার আসার পর আমার অফিসের কেউ আমার একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে এক ঝুড়ি আম পাঠিয়েছিলো। এজন্য তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রেড এলার্ট জারি করে। তারা ভেবেছিলেন, এর মধ্যে বিস্ফোরক থাকতে পারে। এ বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ বলেন, সালাউদ্দিন কাদের তার বিশ্বাস, অনুমান এবং নিজের মতাদর্শ তুলে ধরছেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগের সম্পর্ক নেই। তখন তিনি সময় নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে বলেন। এ সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, দেড় বছর ধরে আপনারা ৪১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। এখন জবানবন্দি তিন দিন হয়নি তাতেই সময় দিতে চাইছেন না। তিনি ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ। আমার সম্পর্কে মানুষের কিছু ধারণা রয়েছে। কথায় কথায় বলা হচ্ছে, ভারত বিরোধী, পাকিস্তানের লোক। শেকসপিয়ারের ম্যাকবেথ নাটকের ভূতের চরিত্রের মতো অনুমান নির্ভর। তাই এ বিষয়ে আমাকে তো বলতে হবে। তিনি বলেন, আমার বাবা একেএম ফজলুল কাদের চৌধুরী রাজনীতি করতেন। আমি কি তার পক্ষে মিছিল মিটিং করেছি? আমার বাবার চিন্তা-ভাবনা আর আমার চিন্তা-ভাবনা যে একরকম হবে এমন তো কোনো কথা নেই। নিজের বিশ্বাসগুলো তুলে ধরার জন্য এসব প্রসঙ্গ এনেছি। তখন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আপনাকে বলার জন্য অমরা সময় দিতে চাই। তবে আপনাকে সংক্ষেপ করে বলতে হবে। আপনি যেভাবে সুযোগ চেয়েছেন আমরা দিয়েছি। হয়তো দু’- একটি বিষয়ে আমরা একমত হতে পারিনি। এসময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম বলেন, এখানে ৩৩ বছরের সংসদ সদস্য রাজনীতিক সালাউদ্দিন কাদেরের বিচার হচ্ছে না। ১৯৭১ সালে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার হচ্ছে। তার অনুভূতি, বিশ্বাস এগুলো জবানবন্দিতে যাবে না। আমরা এজন্য আবেদন করছি। তখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমিতো বলেছি, জবানবন্দিতে মামলার তিনটি বিষয়ে আমি বক্তব্য দেব। এর বাইরে গেলে আপনারা থামিয়ে দেবেন। পরে আবার জবানবন্দি দেয়া শুরু করেন সালাউদ্দিন কাদের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ বলেন, এ বইটি ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়নি। তখন সালাউদ্দিন কাদের বলেন, এটা জাতীয় উত্তরাধিকার। এটা প্রদর্শন করার প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি বলেন, রাজনৈতিক জীবনে আমি সীমান্তে মাছির মতো বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছি। তখন সুলতান মাহমুদ বলেন, এসব বাক্য যাবে না। এ সময় সালাউদ্দিন কাদের বলেন, আমি ভারত বিরোধী কোনো কথা বলছি না। জাতীয় স্বার্থে কথা বলছি। তখন সুলতান মাহমুদ বলেন, এটা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে ঘটছে। তখন সালাউদ্দিন কাদের বলেন, এর জন্যই তো ৪০ বছর পর বিচার করা হচ্ছে। ১৯৭৫ এর আগে তো মামলা হয়নি। পরে সীমান্তে বাংলাদেশির কথাটি বাদ দিয়ে জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এ সময় অপর কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম বলেন, সালাউদ্দিন কাদের ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর সময়কালের বিষয়ে বলবেন। তিনি যা বলছেন সব কিছুতে আমাদের আপত্তি রয়েছে। তাকে এ ধরনের জবানবন্দি দেয়ার সুযোগ দিলে আমাদের অন্য আবেদন করতে হবে। তখন সালাউদ্দিন কাদের বলেন, প্রসিকিউটর মালুম ট্রাইব্যুনালকে হুমকি দিচ্ছেন। এটা হতে পারে না। তখন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মিস্টার মালুম আপনি আবেদন আনেন আমরা সেটা দেখতে চাই। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের অপর কৌঁসুলি তুরিণ আফরোজ বলেন, এটা কোনো জবানবন্দি হতে পারে না। এর মাধ্যমে সময় নষ্ট হচ্ছে। তখন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সালাউদ্দিন কাদেরকে বলেন, যেভাবে পারবেন বলবেন। আপনাকে বলার পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে। তবে আপনি আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না। এ সময় সালাউদ্দিন কাদের বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ দেড় বছরে ৪১ জন সাক্ষী এনেছেন আর এখন একজনকে সহ্য করতে পারছেন না। ট্রাইব্যুনাল বললে আমি এখনই নেমে যাবো। এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ফাঁসিতো দেবেন। তার আগে কিছু বলতে দেন যাতে রেকর্ডে থাকে।