চট্টগ্রাম মেডিক্যালে সরঞ্জাম সঙ্কটে রোগীদের ভোগান্তি
মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৩, ২২:৪২
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে চিকিত্সা সরঞ্জাম সংকটে ক্যান্সার ও বার্ন চিকিত্সার হীনদশা বিরাজ করছে। কোবাল্ট মেশিনটি প্রায় অকার্যকর। ক্যান্সার রোগীরা থেরাপি দিতে পারছে না। বার্ন ওয়ার্ডে চিকিত্সক ও ওটি নার্সসহ দক্ষ জনবল পদায়ন না করায় রোগীরা চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিকিত্সকরা জানান, এসব বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিমাসেই লেখা হচ্ছে। কিন্তু তা কর্তা-ব্যক্তিদের নজরে আসছে না।
চট্টগ্রাম মেডিক্যালের রেডিওথেরাপি বিভাগে ক্যান্সার রোগীদের চিকিত্সা দেয়া হয়। ওয়ার্ডের আন্তঃবিভাগে ২৪টি বেড রয়েছে। এছাড়া বহির্বিভাগেও রোগীদের চিকিত্সা দেয়া হয়। পর্যাপ্ত চিকিত্সক রয়েছে কিন্তু জটিল ক্যান্সার রোগীরা উন্নত চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের এক পর্যায়ে থেরাপি অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। কোবাল্ট মেশিনের মাধ্যমে রোগীদের থেরাপি প্রদান করা হয়। হাসপাতালে না থেকেও নির্ধারিত সময়ে এসে রোগীরা থেরাপি নিতে পারে। কিন্তু ওয়ার্ডে একমাত্র কোবাল্ট মেশিনটি কার্যক্ষমতা কয়েক বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছে।
চিকিত্সকরা জানান, ২০০০ সালে কোবাল্ট মেশিনটি চালু করা হয়। চীনের তৈরি মেশিনে রাশিয়ার সোর্স লাগানো হয়েছে। বর্তমানে কোবাল্ট মেশিনে থেরাপি নিতে গিয়ে রোগীরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি ভালো কোবাল্ট মেশিনে একজন রোগীকে ১/২ মিনিটের মধ্যে থেরাপি দেয়া যায়। এখন থেরাপি দিতে ১০ থেকে ১২ মিনিট সময় লেগে যায়। আবার মাঝখানে অচল হয়ে পড়ে। তাছাড়া বুকে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের জরাজীর্ণ কোবাল্ট মেশিন দিয়ে থেরাপি দেয়া একেবারেই সম্ভব হচ্ছে না। এসব রোগীদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। চিকিত্সকরা জানান, কোবাল্ট মেশিনে ৩/৪ বছর পরপর সোর্স পরিবর্তন করতে হয়। মেশিনটি বসানোর পর থেকে একবার সোর্স পরিবর্তন করা হয়। কোবাল্ট মেশিনের দৈন্যদশা নিয়ে প্রতিমাসেই মন্ত্রণালয়ে লেখা হচ্ছে। কিন্তু গুরুত্ব পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় কোবাল্ট মেশিনের সোর্স কেনার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮০ শতাংশ টাকাও পরিশোধ করেছে। কিন্তু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
চিকিত্সকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রোগীর যে চাপ কমপক্ষে দুটি কোবাল্ট মেশিনের প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় কোন হাসপাতালে কোবাল্ট মেশিন নেই। বগুড়া, রাজশাহী ও রংপুর মেডিক্যালে স্বয়ংসম্পূর্ণ কোবাল্ট মেশিন রয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫ কোটি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কোবাল্ট মেশিন বরাদ্দ মিলছে না। সূত্র জানায়, কোবাল্ট মেশিনটি চালানোর জন্য একজন টেকনিশিয়ান রয়েছে। একজনে এসব মেশিন বেশিক্ষণ চালালে তেজষ্ক্রিয়তায় শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। তিন শিফটের জন্য কমপক্ষে চারজন টেকনিশিয়ানের প্রয়োজন। বর্তমানে কোবাল্ট মেশিনটির সোর্স পরিবর্তনসহ ওভারহলিং জরুরি।
চিকিত্সকরা জানান, ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগীকে চিকিত্সা দেয়া হয়। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই গরীব রোগী। তাদের পক্ষে ঢাকায় গিয়ে চিকিত্সা নেয়া সম্ভব নয়। গতকাল রেডিওথেরাপি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক রোগী ওয়ার্ডের ফ্লোরে বসে রোগের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। চিকিত্সকরা বলেন, মেশিন নষ্ট থাকায় থেরাপি দেয়া যাচ্ছে না।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে আলাদা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ড চালু করা হয়। ওয়ার্ডে ২৬টি বেড থাকলেও ৬৪ জন রোগী চিকিত্সাধীন। ফ্লোরে রেখে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। অন্যান্য ওয়ার্ড থেকেও ক্যান্সার, দুর্ঘটনার অঙ্গ বিকৃতি ও জন্মগত ত্রুটি থাকা রোগীরাও চিকিত্সা নিতে এই ওয়ার্ডে আসে। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ ওটি না থাকায় রোগীরা চিকিত্সা পাচ্ছে না। ওটিতে লাইট নেই, ওটি নার্স নেই। রোগীদের নির্ধারিত সময়ে অপারেশন ও নিয়মিত ড্রেসিং করা যাচ্ছে না। ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. মৃণাল কান্তি দাস ইত্তেফাককে বলেন, ‘এ ধরনের ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা চিকিত্সক থাকা জরুরি। কলেজের শিক্ষকরা অফিস সময়ের বাইরে ওয়ার্ডে আসে না। ইন্টার্নি চিকিত্সকদের ডিউটি না দেয়ায় অফিস সময়ের পর ওয়ার্ড চিকিত্সকশূন্য হয়ে পড়ে। জেনারেল ওটিতে সপ্তাহে একদিন বরাদ্দ পাওয়া যায়।’