সুদের হার গণনার ক্ষেত্রে জটিল হিসাব বাংলাদেশের উদ্যোক্তার বিকাশে বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়াইতেও কার্যকর ভূমিকা রাখিতেছে। দণ্ড সুদ আরোপ করিয়া খেলাপি ঋণ হিসাব করিলে তাহা পরিমাণগতভাবে বাড়িবে ইহাই স্বাভাবিক। ডলারের মূল্য বৃদ্ধিও এইখানে ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। উদ্যোক্তা যখন প্রকল্পটিতে ঋণ গ্রহণ করেন, তখন ডলারের দাম যাহা থাকে, পরবর্তীকালে তাহা বাড়িয়া যায়। এই বাড়তি অর্থ উদ্যোক্তাকে বহন করিতে হয়। অথচ এর দায় উদ্যোক্তার নহে, ঐ বাড়তি অর্থ উদ্যোক্তা ব্যাংক হইতে গ্রহণ করেন নাই। তথাপি ব্যাংকের খাতায় ইহার দায় উদ্যোক্তার। সত্ ও প্রকৃত উদ্যোক্তারা এই দায় কাঁধে লইয়া বাঁচিয়া থাকেন। আবার কেহ রহিয়াছে সবগুলি কিস্তির অর্থ ঠিকভাবে পরিশোধ করিয়াছেন। তাহাদের কোনো প্রণোদনা না থাকিলেও বিশেষ গোষ্ঠীকে সুদ মওকুফসহ নানান সুবিধা দেওয়া যেন রেওয়াজে পরিণত হইয়াছে।
স্বাধীনতার পর হইতে এখন পর্যন্ত কেহই ‘কম্পাউন্ড’ সুদের এই বিষয়টিকে চিহ্নিত করেন নাই। বরং এক ধরনের ‘ডাকাতি’ কারবার চালাইয়া যাইতে ব্যাংকগুলিকে উত্সাহিত করা হইয়াছে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি সুদ লইয়া বলিয়াছেন ব্যাংকগুলি রীতিমতো ডাকাতি করিতেছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সুদের হিসাব কষিবার নিয়মটি সহজ করিবার ঘোষণা দিলে কেহ কেহ আবার সমালোচনায় অবতীর্ণ হইয়াছেন। ইহাদের অনেকেরই শিল্প কিংবা ন্যূনতম ব্যবসা চালাইবার পূর্ব অভিজ্ঞতা নাই। তাহারা বুঝিতেও চাহিতেছেন না যে, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কতোটা কষ্ট করিয়া প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করিয়া জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখিতেছেন। শুধু যদি জ্বালানির কথাই বলি, গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটে কলকারখানা সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা অসাধ্য। ব্যাংকের অর্থায়নে কোনো প্রকল্প লইলে সময়মতো অবকাঠামো সুবিধা না মিলায় কারখানা চালু করা দুরূহ হইয়া পড়ে। অথচ নির্দিষ্ট সময়ের পর হইতে উদ্যোক্তার সুদসহ ঋণের কিস্তি পরিশোধের সিডিউল চালু হইয়া যায়। এই ধরনের নানান কারণে উদ্যোক্তারা খেলাপি হইয়া পড়িলে ইহার দায় কিন্তু উদ্যোক্তার ঘাড়েই আসিয়া পড়ে। এই ধরনের অনিচ্ছাকৃত খেলাপিরা যখন কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন, তখন দণ্ডসুদ আরোপ করিয়া তাহাকে আরো চাপে ফেলিয়া দেওয়া হয়। এইভাবে দিন যত যায়, খেলাপি ঋণের বোঝা ততই বাড়িয়া যায়।
এই পরিস্থিতি থেকে বাহির হইয়া বরং একটি সচল অর্থনীতির দিকে আগাইতে নূতন কিছু কথা অর্থমন্ত্রী বলিয়াছেন। তিনি সরল সুদহার চালু করিবার কথাও ঘোষণা দিয়াছেন, যাহা চলতি মে মাস হইতে কার্যকর করিবার ইঙ্গিত দিলেও হয়তোবা প্রক্রিয়াগত কাজ চলিতেছে। শীঘ্রই ইহার ঘোষণা আসিবে বলিয়া আমরা মনে করি। কিছু লোকের সমালোচনায় পিছপা হইলে চলিবে না। মনে রাখিতে হইবে যে, একটি বাজার সৃষ্টি করা এবং তাহাকে গতিশীল করিতে পারিলে কর্মসংস্থান বাড়িবে। উত্পাদনশীলতায় যোগ হইবে রুগ্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠানও, যাহা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়াইতে সহায়ক হইবে—ইহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই।