[ রা জ নী তি ]

আলোচনার দরজা খোলা রাখতেই হবে

ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস উপলক্ষে গত ৭ জুন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে আলোচনার আর সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তার এরূপ বক্তব্যের কারণ নিজেই উল্লেখ করেন এবং তা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য বিএনপির জমা দেয়া মূলতবি প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়া। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুলতবি প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে বিএনপি সংলাপের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন ২২ মে একটি মুলতবি প্রস্তাব সংসদ সচিবালয়ে জমা দেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৬১ বিধি মোতাবেক একজন সংসদ সদস্য স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সামপ্রতিক ও জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন কোনো নির্দিষ্ট বিষয় আলোচনার উদ্দেশ্যে সংসদের কাছে মুলতবি করার জন্য প্রস্তাব করতে পারেন। বিধি ৬২(১) অনুযায়ী মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস লিখিত হতে হবে ও আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি লিখিত বিবরণী নোটিসের সঙ্গে থাকবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী কার্যপ্রণালী বিধি মোতাবেক দেয়া ওই নোটিসে বলা হয়, “সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল করা হোক।” প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, বিএনপি সব সময় আলোচনার কথা বলছে। সরকারই তা শুনছে না। সরকার আলোচনার জন্য চিঠি দেয়ার কথা বলে তা থেকে সরে এসেছে। সকালে এক কথা, বিকেলে আরেক কথা বলে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছে। আশার কথা, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ মর্মে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিলেও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী আলোচনার সুযোগ রয়েছে মর্মে বক্তব্য রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রদানের পরদিন রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে স্পিকার বলেছেন, আলোচনার পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। আলোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, বাজেট আলোচনার সময় অন্য কোন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ সীমিত। তবে বাজেট পাসের পরও যে কয়দিন সংসদ চলবে তখন আলোচনার সুযোগ আছে। বিরোধী দল চাইলে যে কোন বিষয়ে আলোচনার সুযোগ দেয়া হবে। এছাড়া, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমস্যা সমাধানের সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে তিনি বলেছেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়েই নির্বাচনকালীন সরকার হতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য বিএনপির একজন সংসদ সদস্যের জমা দেয়া মুলতবি প্রস্তাব বিরোধী দল নেত্রী খালেদ জিয়ার নির্দেশে প্রত্যাহার প্রসঙ্গে একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন । তাদের মতে, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার পুনর্বহালে সরকার নীতিগতভাবে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দল এ প্রসঙ্গে কোনো প্রস্তাব উপস্থাপন বা আলোচনা করতে চায় না। তারা জানতো এ মুলতবি প্রস্তাবের ভাগ্যে শেষে কি ঘটতো। তাই মুলতবি প্রস্তাবটির ওপর শুধু আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা সরকারকে কোনো ফায়দা হাসিলের সুযোগ দেয়নি। আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো কিরূপ হবে তা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি একমত হতে পারছে না। বিএনপি দাবি করছে, বর্তমান সরকারের আমলে বিলুপ্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে সে সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না এবং সে নির্বাচন হতে দেবে না। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে তারা গত দুই বছর যাবত্ লংমার্চ, হরতাল, অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। সম্প্রতি (১২ জুন) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত বিএনপির এক সমাবেশে দলটির নেতৃবৃন্দ বলেছেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়া হলে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।’ তারা নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানান। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, আগামী সংসদ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনের যে পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রয়েছে সে মোতাবেক বাংলাদেশেও নির্বাচন হবে। সংসদ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি নাকচে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুক্তি হলো, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে এবং শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যগণ দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। সুতরাং অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাছাড়া, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে। অতি সমপ্রতি (১৬ জুন) প্রধানমন্ত্রী সংসদের বাজেট অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, যা সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির অসারতা প্রমাণ করেছে। বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আবারো নাকচ করে দিয়ে তিনি তাদেরকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আর কোনো অসাংবিধানিক কাউকে (সরকার) আনার চেষ্টা করবেন না। তাতে কারো লাভ হবে না, নির্বাচনই হবে না।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত।’ দেশের রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এ ধরনের বক্তব্য গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তাছাড়া এর ফলে তৃতীয় শক্তি উত্সাহিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, সংবিধানে নেই বিরোধী দল নির্বাচনকালে এমন পদ্ধতির সরকার চাইলে ‘নির্বাচনই হবে না’ মর্মে প্রধানমন্ত্রী সংসদে যে বক্তব্য রেখেছেন তা বিরোধী দলকে চাপে রাখার জন্য একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। রাজনৈতিক কৌশল হোক বা না হোক, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনার দরজা সব সময় খোলা রাখতেই হবে এবং একাধিক কারণে সরকারকেই আলোচনার বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে। এগুলো হলো- এক. সুপ্রিম কোর্টের সংক্ষিপ্ত রায়ে পরবর্তী দুইটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অর্থাত্ দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে করার কথা থাকলেও সরকার পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধোনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের মার্চে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে বর্তমান সংকটের সৃষ্টি করেছে। সুতরাং সংকট সৃষ্টিকারীকে সংকট সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। দুই. অতীতে সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনা সব সময় সফল না হলেও আলোচনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ১৯৯৪ সালে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথম বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বিরোধী দলের চারজন এবং সরকারি দলের পাঁচজনকে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার বাদ দেয়ার ইস্যু নিয়ে সংসদ ভবনে আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ও বিএনপির তত্কালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ না দেখলেও আলোচনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ তত্কালীন বিএনপি সরকার নিয়েছিল। তিন. দেশের সুশীল সমাজ, সাধারণ জনগণ ও বিদেশি সুহূদরা সরকার ও বিরোধী দল উভয়কে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের আহ্বান জানালেও তারা আশা করেন সরকার এই বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তাদের অনেকে মনে করেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারের পরিষ্কার রূপরেখা দিতে হবে; কারণ আলোচনার ভিত্তি নিয়ে সমঝোতা না হলে কোনো ফল হবে না। চার. আলোচনার দরজা খোলা না রাখলে এবং সমঝোতা না হলে অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে নিকট অতীতের ইতিহাস বলে দেয় সরকারি দল আওয়ামী লীগ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবশেষে যা বলা যায় তা হলো, আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে তার অবসানে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিরোধী দলকেও সংকট সমাধানের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের গণতন্ত্র বিপন্ন হলে জনগণ সরকারি ও বিরোধী কোনো দলকেই ক্ষমা করবে না। লেখক :সাবেক সচিব Email:latifm43@gmail.com