শুধু ঢাকাতেই ৪০ হাজার ভবন রয়েছে যেগুলো আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। অথচ ওইসব ভবনেই লাখ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে পুরো শহর অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হতে পারে। বড় ভূমিকম্প হলে গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণ ঘটবে ও বিদ্যুতের লাইন থেকে স্পার্ক হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। এ অবস্থায় ভূমিকম্প হলে বাঁচার উপায় কী?
বাংলাদেশে ঘনঘন ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে। মাঝে মাঝেই ভূমিকম্পে কাঁপছে বাড়িঘর। সবার ভয় এই বুঝি ভেঙে পড়ছে মাথার ওপর। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং সুনামির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর লক্ষণ হিসেবে প্রায়ই দেশের কোথাও না কোথাও মৃদু ও মাঝারি মাত্রায় ভূমিকম্প হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ভূমিকম্প মোকাবেলায় বাংলাদেশ কি প্রস্তুত? বনানী এফ আর টাওয়ার, পুরান ঢাকার অগ্নিকাণ্ড আর রান প্লাজা ধসের পরই আমাদের সক্ষমতা কতটুকু তা আর বুঝতে বাকি থাকে না।
ভূমিকম্প পরবর্তী প্রস্তুতি খুবই জরুরি। হাল সময়ে যেসব ভূমিকম্প হয়েছে, এর উত্পত্তিস্থল ছিল মায়ানমার, নেপাল এবং চীনে। এসময় ৭.৪ এবং ৭.৯ মাত্রায়ও ভূমিকম্প হয়েছে। এ ছাড়াও এ সময়ে ছোট এবং মাঝারি কয়েকদফা ভূকম্পন অনুভূত হয়। মাত্রা হিসাবে নেপাল, চীন এবং ভারতের প্রায় অর্ধেক মাত্রায় ভূমিকম্প অনুভূত হয় বাংলাদেশে। নেপালের সমমাত্রায় বাংলাদেশে ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ভবন ধসে এবং হেলে পড়ার আশঙ্কা করেন বিশেষজ্ঞরা। সারা দেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন হলো এক রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধারে দীর্ঘ সময় লেগেছে। আরও উচ্চমাত্রায় ভূমিকম্প হলে উদ্ধার তত্পরতার কী হাল হবে তা সহজেই আঁচ করা যায়।
সরকারের তরফ থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও বড় ধরনের ভূমিকম্প-পরবর্তী বিপর্যয় সামাল দেওয়ার ন্যূনতম প্রস্তুতিও যে আমাদের নেই, তা স্পষ্ট। ব্যাপক অভাব রয়েছে জনসচেতনতারও। ভূমিকম্পের ব্যাপারে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার প্রচারণার কোনোটাই সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে না। কিন্তু ইতোমধ্যে অনেক মূল্যবান সময় অপচয় হয়েছে। আর বিলম্ব করা সমীচীন হবে না। ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের প্রকৃত সময় এখনই।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুইটি। প্রথমত, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে নিম্নতম পর্যায়ে রাখা এবং দ্বিতীয়ত, ভূমিকম্প-পরবর্তী বিপর্যয় সামাল দেওয়া। বাংলাদেশ একটি আরো বড় মাত্রার ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তে বিশেষজ্ঞদের এমন সতর্কবাণীর পর আর চুপ করে থাকা যায় না। একেকটা ভূমিকম্পের পর আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। আর এ ভয় যেন জয় করার কোনো উপায় নেই। এ আতঙ্ক গোটা দেশবাসীকে পেয়ে বসেছে। ভূমিকম্প কোথায় হবে? কখন হবে এবং তা কত মাত্রায় হবে তা আগবাড়িয়ে কেউ বলতে পারে না। ভূমিকম্পের বিষয়টি সম্পূর্ণই অনুমেয়। তবে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার কিছু পূর্বলক্ষণ আছে, যা বাংলাদেশে বেশ লক্ষণীয়। এর লক্ষণ হিসেবে প্রায়ই দেশের কোথাও না কোথাও মৃদু ও মাঝারি মাত্রায় ভূমিকম্প হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ভূমিকম্পই নয়, দেশের উপকূলীয় এলাকা ঘিরে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টির জন্য সাইসমিক গ্যাপ বিরাজমান রয়েছে। এ গ্যাপ থেকে যে কোনো সময় সুনামিও হতে পারে। তাদের মতে বঙ্গোপসাগরের উত্তরে আন্দামান থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাবডাকশন জোন বরাবর ৬শ’ কিলোমিটারের একটি সাইসমিক গ্যাপ রয়েছে। আমাদের দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তি এই সাইসমিক গ্যাপে জমা হয়ে আছে। এই সাইসমিক গ্যাপ আমাদের জন্য অশনিসংকেত। এখান থেকে ৮ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা যদি সাগরতলে হয় তাহলে সেই ভূমিকম্প সুনামি সৃষ্টি করতে পারে।
ভূমিকম্পে উঁচুতলার বিল্ডিংগুলো আগে ভেঙে পড়বে, এ কথাও ঠিক নয়। বরং ভূমিকম্পে হাইরাউজ বিল্ডিং থেকে ছোট বিল্ডিংগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। ৬ তলার নিচের বিল্ডিংগুলো বেশি অনিরাপদ। ভূমিকম্পে বিল্ডিং সাধারণত দুমড়েমুচড়ে গায়ে পড়ে না। হেলে পড়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এ সময় নিজেকে রক্ষা করতে হবে। ভিম কিংবা কলামের পাশে শক্ত কোন কিছুর পাশে থাকতে হবে। বিশেষ করে খাট কিংবা শক্ত ডাইনিং টেবিল হলে ভালো হয়। আগে থেকেই আশ্রয়ের জায়গা ঠিক করে নিতে হবে। ঘরে রাখতে হবে সাবোল এবং হাতুড়ি জাতীয় কিছু দেশীয় যন্ত্র। ভূমিকম্প হলে অনেকেই তড়িঘরি করে নিচে ছোটেন। তারা জানেন না ভূমিকম্পে যত ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় অস্থির লোকদের ছোটাছুটিতে। ভূমিকম্প খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়। প্রলয় যা হবার তা হয় কয়েক সেকেন্ড কিংবা মিনিট সময়ের মধ্যে। এ সময়ে আপনি কি নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবেন? রাস্তায় গিয়ে তো আরও বিপদে পড়তে হবে আপনাকে। বাড়ি ঘর হেলে গিয়ে তো রাস্তার ওপরই পড়বে। বরং রাস্তায় থাকলে চাপা পড়ে, মাথা কিংবা শরীরের ওপর কিছু পড়ে আপনি হতাহত হতে পারেন। যারা একতলা কিংবা দোতলায় থাকেন পাশে খালি মাঠ থাকলে দ্রুত দৌড়ে যেতে পারেন। রাজধানী ঢাকায় যারা বসবাস করেন যারা উঁচু বিল্ডিংয়ে থাকেন, এদের ভয়টা যেন একটু বেশি। তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, আমাদের দেশে ৬ তলার উপরে নির্মিত বিল্ডিংগুলো সাধারণত বিল্ডিং কোড মেনেই হয়। বড় বিল্ডিংয় তৈরির ক্ষেত্রে অনেকেই ঝুঁকি নিতে চান না। একটু দেখভাল করেই নির্মাণ করেন। আর এসব বিল্ডিং পাইলিং হয় অনেক গভীর থেকে এবং বেজ ঢালাই দেওয়া হয় পুরো বিল্ডিংয়ের নিচ জুড়ে, তাই শুধু কলামে দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিং থেকে হাইরাইজ বিল্ডিং কিছুটা হলেও নিরাপদ বলা যায়।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় রয়েছে। প্রথমত, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে নিম্নতম পর্যায়ে রাখা এবং দ্বিতীয়ত, ভূমিকম্প-পরবর্তী বিপর্যয় সামাল দেওয়া। দীর্ঘদিন যাবত্ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকির কথা বলা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের অবস্থা এখনো খুবই শোচনীয়। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিম্নতম পর্যায়ে রাখতে হলে বাড়িঘর ও হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আর বিলম্ব করা সমীচীন হবে না। ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের প্রকৃত সময় এখনই। আর কালক্ষেপণ না করে এ ব্যাপারে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
n লেখক : গবেষক