‘সুফিয়া কামাল বিবেক ও কল্যাণের কণ্ঠস্বর’

সুফিয়া কামাল বিবেক ও কল্যাণের কণ্ঠস্বর—মনুষ্যত্ব ও শুভবুদ্ধির প্রতীক। ছিলেন তিনি স্নেহ ও শক্তির আধার। নারীমুক্তি মানেই মানবমুক্তি—এই ছিল তাঁর জীবনের বীজমন্ত্র। একথাও তাঁর অজানা ছিল না, নারীর মুক্তি ও বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ধর্মীয় মৌলবাদ এবং অন্যদিকে মানবমুক্তির ও মিলনের পথরোধ করে আছে সাম্প্রদায়িকতা। কবি সুফিয়া কামালের গতকাল বৃহস্পতিবার ১০২তম জন্মদিন উপলক্ষে লালন গবেষক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর দেয়া স্মারক বক্তৃতায় এভাবেই ‘জননী সাহসিকা’র মূল্যায়ন করা হয়। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে গতকাল বৃষ্টিস্নাত বিকালে ‘মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলন এবং সুফিয়া কামাল’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। ‘বিনীত শোভিত ঘর, সামান্য আসবাব....কবির সামান্য ঘর নিমিষেই সারা বাংলাদেশ হয়ে যায়’—জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের প্রতি এভাবেই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পংক্তিতে সাজিয়েছিলেন কবি শামসুর রাহমান। শোভিত সেই ঘর থেকেই সুফিয়া কামাল দেখতেন নারীর মুক্তি। স্বপ্ন বুনতেন মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী এক বাংলাদেশের। সেই লক্ষ্যেই ইস্পাতদৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। জননীর জন্মলগ্নের এই শুভক্ষণে তাঁকে স্মরণ করলো বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। স্মারক বক্তৃতায় অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী আরো বলেন, আজ আমরা এক ক্রান্তিকাল পার হচ্ছি। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নতুন শক্তি ও ভয়ংকর কদর্য রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির। মানবতা-গণতন্ত্র-স্বাধীনতা বিপন্ন-লাঞ্ছিত। তাই নতুন লড়াইয়ের ডাক এসেছে। তা আসবেই, কেননা ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চলে কাল থেকে কালান্তরে। এই অপশক্তির পরাভব ও উত্খাত সম্ভব শুভবুদ্ধির মানুষের ঐক্যবদ্ধ স্থির লক্ষ্যমুখী লড়াইয়ে। আর সেই চূড়ান্ত সংগ্রামে আমাদের শক্তি, সাহস ও প্রেরণা জোগাবেন জাতির বিবেক জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল—তাঁর কাজ আর কথাই হবে আমাদের শত্রুবধের শাণিত আয়ূধ। অনুষ্ঠানে এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে ‘সুফিয়া কামাল সম্মাননা স্মারক’ প্রদান করা হয়। এ সময় তাঁর জীবনসঙ্গিনী সিদ্দীকা জামান বেবী উপস্থিত ছিলেন। পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। ড. আনিসুজ্জামানের জীবনী পাঠ করেন মহিলা পরিষদের প্রচার ও গণমাধ্যম সম্পাদক কাজী সুফিয়া আখতার। সম্মাননা গ্রহণ করে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। এক পক্ষ ধর্মকে দাবার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় অসাম্প্রদায়িক শক্তি যেন আপোষ করার চেষ্টা না করে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক লাভের চেয়ে সমাজে সুদূরপ্রসারী কল্যাণ জরুরি। আমরা আশা হারাবো না। আমরা সত্যের পথে চলবো। সেই চলার পথে সুফিয়া কামালকে নিত্য স্মরণ করবো।