বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমেছে :বিশ্বব্যাংক

এক দশকে দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে এক কোটি ৬০ লাখ। ২০০০ থেকে ২০১০ সালে প্রতিবছর গড়ে এক দশমিক সাত শতাংশ হারে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে। ২০০০ সালের শুরুতে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিলো মোট জনসংখ্যার ৪৯ ভাগ। ব্যাপক জনসংখ্যা বাড়লেও ২০১০ সাল নাগাদ তা সাড়ে ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ছয় শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে সাফল্য, দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিসহ সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতা বেড়েছে। কমেছে ধনী গরীব বৈষম্য। সর্বোপরি দারিদ্র্য হ্রাসে এই সময়ে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য ও বিরল। বাংলাদেশের দারিদ্র্যতা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। বেশ কয়েকটি খাতে বাংলাদেশের এই অর্জনকে আশাব্যঞ্জক সাফল্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের অর্জনগুলো নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনটি।বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জাটের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন প্রধান অতিথি। খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন বিশেষ অতিথি। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম। মূল পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. ডিন জলিফ ও ড. ইফফাত শরিফ।ইয়োহানেস জাট বলেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমেছে এক কোটি ৬০ লাখ। কমেছে বৈষম্যও। এই অর্জন উল্লেখযোগ্য ও বিরল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সালে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ছয় কোটি ৩০ লাখ। ২০১০ সালে তা নেমে আসে চার কোটি ৭০ লাখে। ব্যাপক হারে দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও এ সময়ে দারিদ্র্যের হার কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমার হার ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এখনও বাংলাদেশে চার কোটি ৭০ লাখ মানুষ দরিদ্র। যাদের মধ্যে দুই কোটি ৬০ লাখ জনগোষ্ঠী চরম দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। তবে শহর অঞ্চলে বৈষম্য তুলনামূলক বেশি। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন হবে তরুণ ও নতুন প্রজন্মের দক্ষতা বাড়ানো। এর পাশাপাশি প্রয়োজন শিক্ষা। যাতে করে তারা উত্পাদনমুখী কাজে নিয়োজিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ২০১৫ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে এমডিজিতে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে চলতি বছরের শেষদিকে বাংলাদেশ এটি অর্জন করবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু টাকা-পয়সা নয়, বিশ্বব্যাংক নানা সমীক্ষা করেও বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও গত চার বছরে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছে। এশিয়ার ছয়টি দেশ ও আফ্রিকার ১০টি দেশ প্রায় ছয় শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে যা বিশ্বের ইতিহাসে আর কখনও হয়নি। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অর্জন ও দারিদ্র্য হ্রাসের এ সাফল্য ধরে রাখতে তিনটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। এগুলো হলো, শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তিনি বলেন, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকায় প্রশাসনের অদক্ষতা ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ও দারিদ্র্য দূরীকরণের সাফল্য ধরে রাখতে হলে সরকার ও প্রশাসনের কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। স্থানীয় শাসন ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে কঠোর ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে আসা দরকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন। খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে উত্তরবঙ্গের মঙ্গা দূরীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বিশ্বব্যাপী সাফল্যের উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।