বাজেট-জিডিপি
নিয়ে কিছু
কথা
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ১৯:৪১
গত ৬ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ সালের জাতীয় বাজেট পেশের আগে থেকেই এই বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে যা এখনো অব্যাহত আছে। এবারের বাজেট এ যাবত্কালের সবচেয়ে বড় হওয়ায় প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাজেট কি বাস্তবসম্মত নাকি উচ্চাভিলাষী, ঘোষিত বাজেট কি বাস্তবায়ন সম্ভব? বাজেটের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হল জিডিপির প্রবৃদ্ধি। অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশ, বিবিএস বলছেন ৬.০৩ শতাংশ, সর্বশেষ বিশ্বব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে যে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৫.৮ শতাংশ অর্জিত হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জিডিপি নিয়ে একটা সংশয় ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে যে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে তা নিয়ে কিন্তু তেমন কোন আলোচনা হচ্ছে না। সেটি হল জিডিপি নির্ণয় পদ্ধতি। জিডিপি পরিমাপের জন্য যে দু’টি বিকল্প পদ্ধতি বিদ্যমান রয়েছে তা হল: ১. কোন দেশে একবছরে উত্পাদিত মোট দ্রব্য ও সেবাসমূহের অর্থমূল্যের সমষ্টি অর্থাত্ জনগোষ্ঠীর উত্পাদন বা সেবাকার্যে অংশগ্রহণের ফলে যে আয় বা উপার্জন সংঘটিত হয় তার সমষ্টি। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই উত্পাদন বা সেবাকার্য বা এই কাজে অংশগ্রহণের ফলে সংঘটিত আয় অবশ্যই আইনানুগ ও ন্যায়সংগত হতে হবে। অর্থাত্ আয় কোনমতেই অবৈধভাবে অর্জিত হলে চলবে না। ২. এই আয়ের বিপরীতে কৃত ব্যয়ের সমষ্টি। অর্থাত্ জনগোষ্ঠীর মোট ভোগ ব্যয়। যাহোক সাধারণ মানুষ কিন্তু অর্থনীতির এইসব গূঢ় তত্ত্ব সম্বন্ধে সেভাবে ওয়াকিবহাল নয়, সে কারণে এ বিষয়ে তাদের আগ্রহও কম। তারা যা জানতে চায় তাহলো, বিগত বছর কত বিনিয়োগ হল, এর মাধ্যমে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, এর ফলে তাদের আয় বৃদ্ধি কি রকম হয়েছে, জনসাধারণের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের কি রকম হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে, দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি কি রকম, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে তাদের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে কিনা- ইত্যাদি।
এইসব বিবেচনায় জনসাধারণ হিসাব-নিকাশ করে তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির দৃশ্যমান বিষয়টি নির্ধারণ করে থাকে। দেখা যাচ্ছে যে, বিগত দশ বছরে জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি ঘোষণা করা হয়েছে তার মাধ্যমে জীবনমান এই সময়ে অন্ততপক্ষে নীট পঞ্চাশ শতাংশ বৃদ্ধি পাবার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কি তা হয়েছে? না তা হয়নি। আর তাই জিডিপি পরিমাপের জন্য কোন্ পদ্ধতিটি অনুসরণ করা হয়েছে তা বিবেচনার দাবি রাখে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এই ক্ষেত্রে উত্পাদন-আয় পদ্ধতি অনুসরণ না করে ব্যয় শুমারি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। প্রকৃত তথ্য বিচার-বিবেচনা করে জিডিপি পরিমাপ করা হলে, এর কারণে বিশেষ পার্থক্য অনুভূত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পার্থক্যটি যে কারণে অনুভূত হয় তাহলো ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল জাতীয় উত্পাদন ও সেবাসমূহ বিবেচনায় না নিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের ভোগকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমাদের বিবেচ্য বিষয় এটি নয়। বিবেচ্য বিষয় হল, এই জিডিপিকে ভিত্তি ধরে যখন জাতীয় বাজেট প্রণীত হয় তখন।
বাজেট প্রণয়নের পর অর্থমন্ত্রীসহ সরকারি মহল থেকে বলে হচ্ছে যে, এই বাজেট এমন কিছু বড় নয়, কারণ বাজেটের পরিমাণ জিডিপির মাত্র ১৯ শতাংশ। এটা মোটেই উচ্চাভিলাষী নয় বরং বাস্তবায়নযোগ্য। অথচ বাস্তব অবস্থা কি বলে? গত অর্থবছরে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৬.৮ শতাংশ থেকে ১৪.৫ শতাংশে। তারপরেও কি সরকারের দক্ষতা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে? বাজেটের দু’টি অংশ, অর্থাত্ আয় ও ব্যয়। আয়ের প্রধান অংশটি আসবে কর প্রশাসন তথা এনবিআর খাত থেকে। এবারের বাজেটে আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১.২ শতাংশ। এর মধ্যে আয়কর খাতের বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫.৭ শতাংশ, এটা নিয়ে কিছু সংশয় থাকলেও ভ্যাট খাতের বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই যে অর্জিত হবে তা নিয়ে কোন সংশয় নেই। কারণ ভ্যাট একটি পরোক্ষ কর যা দেবে সাধারণ জনগোষ্ঠী। যার মধ্যে রাস্তার ফকির থেকে প্রধানমন্ত্রীও রয়েছে। মূলত বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে সরকার ব্যয় করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে বেতন ভাতা, গাড়ি ক্রয়, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন অনুত্পাদনশীল খাতের ব্যয়। এই ব্যয় প্রতিবছর দৃশ্যমান হারে বাড়ছে। এক সময় উত্পাদন তথা উন্নয়ন ব্যয় মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ আর অনুত্পাদন খাতে ব্যয় ২৫ শতাংশ থাকলেও এখন এর অনুপাত একদম বিপরীত হয়ে গেছে। এর পরেও উত্পাদন খাত তথা অবকাঠামোসহ উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়নও যথাযথ হয় না। দেখা যায়, প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৬০ শতাংশ দশম মাস তথা এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত অর্জিত হয়। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ ব্যয় মাত্র ২ মাসে দেখানো হয়। ফলে এটা মনে করা অসংগত নয় যে, এর বিশাল অংশ হরিলুট হয়, আর জন্ম নেয় হাজার হাজার কোটি কালো টাকা। প্রতি বছর যা চক্রাকারে বাড়ছে। আমাদের প্রশ্ন সেখানে। বলা হয়েছে যে, আমাদের অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ নাকি জিডিপির পঞ্চাশ শতাংশের বেশি। আর এই কালো টাকা সাদা করার জন্য বাজেটে ব্যবস্থা রাখতে হয়। এর মাধ্যমে যদি সত্যি সত্যি সিংগভাগ কালো টাকা সাদা হত আর সেই অর্থ উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হত তবে অর্থনীতির চেহারা হয়ত বদলে যেত। কিন্তু প্রশাসনিক অব্যবস্থা আর অনিয়মের কারণে এই উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়।
কখনো কখনো তা জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন এবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে জমি, ফ্লাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে। বিগত ২/৩ বছর জমি, ফ্লাটের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় প্রায় সকলের কিছুটা স্বস্তি হয়। কারণ উত্পাদনের প্রধান যে দুইটি উপকরণ তার মধ্যে জমি হল প্রধান উপকরণ, অপরটি পুঁজি। শিল্পের জন্য পুঁজি সংগ্রহের খরচ অর্থাত্ ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। এই অংক খরচ করে আর যাই হোক শিল্প হয় না। এমনিতে জমির পরিমাণ কম হওয়ায় দাম ছিল অনেক বেশি। আর এবার এই খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ায় জমির দাম অনেক বেড়ে যাবে। গত বছর সরকার ভ্যাট আইন ২০১২ জাতীয় সংসদে পাস করেছে এর ফলে ২০১৫ সাল থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আরোপিত প্যাকেজ ভ্যাট তুলে দেয়া হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, মূল ভ্যাট তথা ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়ার পর আমদানি পর্যায়ে এটিভি হিসাবে ৪% অতিরিক্ত প্রদানসহ ভ্যাটযোগ্য পণ্য হাত বদলের প্রতিটি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন হলে ভ্যাট দিতে হবে। জনসাধারণের কাছ থেকে এই ভ্যাট আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের অন্তত ৩/৪টি স্তরে এই ভ্যাট দিতে হলে জনসাধারণের অবস্থা আর মূল্যস্ফীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আর কি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই আইন ভ্যাটের মূল চেতনারও পরিপন্থি। কারণ ১৯৯১ সালে ভ্যাট প্রবর্তনের সময় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ১. ভ্যাটের একটিই মাত্র নির্দিষ্ট হার থাকবে এবং জনসাধারণ একবারই তা প্রদান করবে। ২. পৌনঃপুনিকহারে অর্থাত্ করের উপর কর ধার্য করা হবে না। এর অর্থ একবার কোন পণ্য বা সেবার উপর ভ্যাট ধার্য করা হলে দ্বিতীয়বার তার উপর ভ্যাট ধার্য করা হবে না। ৩. পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট ধার্য করা হবে না। ৪. আবগারী কর ও বিক্রয় শুল্ক উঠিয়ে দিয়েই সমন্বিত একটি কর ব্যবস্থা তথা ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে বিধায় মূল্যস্তরের উপর তার প্রভাব পড়বে না অর্থত্ ভোক্তার মূল্যসূচক বাড়বে না। কিন্তু ভাটের নামে যা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তাকে এসব অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট বরখেলাপ বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না।