নামমাত্র টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট

আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সুবিধা বঞ্চিত মানুষরা নামমাত্র এ টাকায় অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পাচ্ছেন। এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টধারীরা আর্থিক সেবার অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন। একইসঙ্গে তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে উঠছে। অর্থনীতির জন্য এটাকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, অতি দরিদ্র মহিলা, দুস্থ, ছিন্নমূল ও কর্মজীবী শিশু এমকি ভিক্ষুকরাও যাতে ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে সেজন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইভাবে স্কুল পর্যায়েও শিক্ষার্থীরাও যেন এ সুযোগ পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে ব্যবস্থা করেছে। অন্যান্য অ্যাকাউন্টের মত এসব অ্যাকাউন্টের জন্য ন্যূনতম কোন স্থিতি রাখার প্রয়োজন নেই। বাড়তি কোন চার্জও আরোপ করা হয় না। ১০ টাকার এ অ্যাকাউন্টধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অ্যাকাউন্ট রয়েছে কৃষকদের। ন্যূনতম জমায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, কৃষকসহ সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবায় আনার জন্য এ সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এ একাউন্টের আওতায় কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও ভাতার টাকা বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এসেছে। এছাড়া একই একাউন্ট ব্যবহার করে রেমিট্যান্স উত্তোলন, কৃষি ঋণ গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে। এসব একাউন্ট সচল রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে। এমনকি কৃষকদের সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তুলতে অন্য একাউন্টে সঞ্চয় করলে যে পরিমাণ লাভ দেয়া হয় তার চেয়ে বেশি পরিমাণে লাভ দিতে বলা হয়েছে। এসব একাউন্ট সচল থাকলে পরবর্তীতে তা কনভার্ট করে মোবাইল ব্যাংকিং-এ নিয়ে যাওয়ার চিন্তা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এদিকে ১০ টাকায় একাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষকে দেশের সম্মানিত নাগরিকের মর্যাদাও দেয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, সুবিধাবঞ্চিত বিশাল জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত, মানুষকে সঞ্চয়ের প্রতি আকৃষ্ট এবং যার যার প্রাপ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার-মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতা আনা হবে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাবে দেখা গেছে, ১০ টাকার বিনিময়ে খোলা এসব একাউন্টের মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ২২ লাখ ৬১ হাজার ৯৪২, জনতা ব্যাংকে ১৪ লাখ ৯২ হাজার ৬৪৬, অগ্রণী ব্যাংকে ১৪ লাখ ৪৯ হাজার ৭০৫, রূপালী ব্যাংকে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯১, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ২৫ লাখ ১০ হাজার ৮৬৩, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০২ এবং বেসিক ব্যাংকে ১৭৯টি হিসাব খোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত এসব ব্যাংকে কৃষকের নামে ৯৬ লাখ ৩২ হাজার ৫২৮টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় ভাতাভোগী ২৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯০টি, মুক্তিযোদ্ধাদের নামে এক লাখ নয় হাজার ৯৮০টি, ক্ষুদ্র জীবন বীমা গ্রহীতা (১০০ টাকার হিসাব) আট হাজার ৯২০টি, এছাড়া অন্যান্য (হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে অনুদানপ্রাপ্ত দুঃস্থ ব্যক্তি, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগী শ্রমিক, আইলা দুর্গত ব্যক্তি প্রভৃতি) ৭৭ লাখ ৬৪ হাজার ৪৭৫টি একাউন্ট খোলা হয়েছে। দুই বছরে এ স্কিমের আওতায় অ্যাকাউন্ট খুলেছে এক লাখ ৮৭ হাজার স্কুল (১৮ বছরের নীচে) শিক্ষার্থী। বর্তমানে ৪৭টি তফসিলী ব্যাংকের মধ্যে ৪৫টিতে এসব হিসাব খোলা সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় খোলা এসব হিসাবে সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি টাকা। যেখানে হিসাব প্রতি গড় স্থিতি ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকা। এদিকে একইভাবে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পাবে ছিন্নমূল ও কর্মজীবী শিশুরা। ৭ জুলাই থেকে এটির পাইলট প্রকল্প চালু হবে। প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের রূপালী ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংকে এ একাউন্ট খোলা যাবে। ব্যাংক দুটিকে সার্বিক সহযোগিতা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্যা চিলড্রেন ও ব্র্যাক। প্রাথমিকভাবে রূপালী ব্যাংকের মোহাম্মদপুর শাখা এবং পূবালী ব্যাংকের মিরপুর শাখায় এ প্রকল্পটি চালু করা হবে। অন্যান্য অ্যাকাউন্টের মধ্যে কেবল স্কুল শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট দেশের প্রায় সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং অন্যগুলো কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে খোলা যায়। অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও সামাজিক ভাতাপ্রাপ্তদেরও এ সুবিধার আওতায় আনা হয়। এসব হিসাবের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধা ও সামাজিক ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। এ ধরনের ব্যক্তিরা জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট বা কৃষি উপকরণ সহায়তার কার্ড দিয়েই হিসাব খুলতে পারেন। এসব হিসাবে কোনো টাকা জমা স্থিতি রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ কিংবা হিসাবের জন্য কোন প্রকার চার্জ বা ফি আদায় করতে পারে না।