লালন ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতাও নেই, একদিন আমিও থাকব না, কিন্তু লালন ব্যান্ড থাকবে

সুমী। লালন ব্যান্ডের ভোকাল। লালনের গানের মৌলিক সুরকে খানিকটা ভেঙে রক ঘরানায় গেয়ে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দলটি। রকের আদলেই লালনের গানগুলো নতুন করে পৌঁছে যাচ্ছে সবার কাছে। নিজের ব্যান্ডের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও অডিও শিল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবি হাসান সম্প্রতি আপনাদের ব্যান্ডের লাইনআপটা নতুন করে সাজিয়েছেন। এই লাইনআপ পরিবর্তনের কারণ কী? আসলে লাইনআপ পরিবর্তন বলা যায় না। আমাদের ব্যান্ডে ইমরান নামের একজন জয়েন করেছে। ওর জায়গায় আগে সালেকিন ছিল, সে চলে যাওয়াতেই ইমরানকে নেওয়া হয়। সালেকিন চলে যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে কী? সালেকিন চলে যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, সেও মিউজিকেই থাকবে। তবে তার মিউজিকের ক্যারিয়ারটা সে ভিন্নভাবে ডেভেলপ করতে চায়। তাই সে নিজের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করেই এগোচ্ছে। মূল কথা হলো, ব্যান্ড লালন যিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি হলেন আশিক ভাই। তিনিই কিন্তু এখন সোলসের ড্রামার। লালন ব্যান্ডকে একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি, যারা বাংলাদেশের ফোক গানের মূল ভিতটাকে নিয়ে কাজ করে। যিনি এই ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনিই আজ নেই, হয়তো আমিও একদিন থাকব না। আমার জায়গায় অন্য কেউ এসে গাইবে। কিন্তু লালন ব্যান্ড ঠিকই থাকবে। এটা কোনো ব্যক্তির নয়। আপনাদের গাওয়া মৌলিক গান প্রসঙ্গে বলুন। আমাদের যারা নিয়মিত শ্রোতা, তাদেরই অনেকে জানে না আমাদের যেসব গান খুব বেশি হিট হয়েছে তার অধিকাংশই মৌলিক গান। তবে এ পর্যন্ত কখনোই আমরা মানুষের সামনে বিষয়গুলো তুলে ধরিনি। মৌলিক বা সাঁইজির গানও আমাদের উদ্দেশ্য না। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দর্শন। লালনের গানের যে দর্শন, ফোক গানের যে দর্শন, মাটি ও মানুষ এবং তার অস্তিত্বের যেই দর্শন এটাই মানুষের সামনে আমাদের মতো করে তুলে ধরতে চাই। এটা পারলেই যথেষ্ট। ব্যান্ড লালনের নতুন কাজ প্রসঙ্গ বলুন। ব্যান্ড লালন নিয়মিতই মিউজিক করে। লুকিয়ে থাকে সবসময় প্র্যাকটিস প্যাডে... এটাই আমাদের কাজ। এই লুকিয়ে থাকার মধ্য দিয়েই মানুষে সুন্দর করে নিজেদের জায়গাটা বুঝানোর চেষ্টা করি। প্রতিনিয়তই আমরা কাজ করে যাচ্ছি শ্রোতাদের জন্য। আর আমাদের সর্বশেষ প্রজেক্ট ‘লালন’-এ যখন ভালো রেসপন্স পেয়েছি তাই এর পরের প্রোডাকশনটাও যেন কম কিছু না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই হাঁটতে হচ্ছে। আর এখন আমাদের দেশের রাজনৈতিক যেই অস্থিতিশীলতা, এর মধ্যে আসলে অ্যালবাম প্রকাশ না করাই ভালো। এখন ভাবছি, অবস্থা একটু স্থিতিশীল হোক, তারপর আমরা নতুন প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নামব। একটা ব্যান্ডের যখন শুরু হয় তখন মিউজিশিয়ানদের ভেতরে একটা একাত্মতা দেখা যায়। জনপ্রিয়তা পাওয়ার সাথে সাথেই একটা ভাঙন শুরু হয়, এর কারণ কী বলে মনে হয়? মিউজিশিয়ানদের একাত্মতায় আসলে ব্যান্ডের শুরু হয় না, মিউজিকের একাত্মতায় শুরু হয়। ভাঙন শব্দটা এইভাবে না বলি... একটা মানুষ যখন পড়াশোনা শুরু করে তখন সে পুরোপুরি নির্ধারণ করতে পারে না ভবিষ্যতে কী হবে বা কোন বিষয়ে পড়বে। এসএসসি পরীক্ষার পূর্ব মুহূর্তে এসে তার ভবিষ্যত্ বাছাইয়ের একটা সুযোগ হয়। প্রত্যেক মিউজিশিয়ানদের বেলায়ও একই রকম। ক্যারিয়ারের শুরুতে শুধু শুরুটাই করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা সবাই শিখছি। একটা পর্যায়ে এসে সবাই নিজের ক্যারিয়ার ও চাহিদা মোতাবেক হাঁটে। আর এ কারণেই দল পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় ঘটে থাকে। আর ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্বে যদি কারও ব্যান্ড ভাঙে সেটা আলাদা বিষয়। সাঁইজির মতো করেই বলছি ব্যান্ড লালনের মিউজিকের ভাঙন কখনোই হয়নি... এই ভাঙন নেই। একদিন সুমী থাকবে না, তিতি থাকবে না বা ব্যান্ড লালন যারা দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তাদের সবাই হয়তো একদিন থাকবে না... কিন্তু এই ব্যান্ড ভাঙবে না। আমাদের দেশে যেহেতু ভোকাল নির্ভর ব্যান্ড বেশি, সেদিক থেকে মিউজিশিয়ানরা তারকা হতে পারে না, তারা লাইমলাইটেও আসতে পারে না। এর কারণেই কী ভোকাল ও মিউজিশিয়ানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, আত্মপক্ষ সমর্থন করে কী বলবেন? আমাদের ব্যান্ড এটা কোনোভাবেই মানে না। এই প্রশ্নটাও আমাদের ব্যান্ডের মধ্যে নেই। ৫ জন বা ৬ জন মিউজিশিয়ান সবাই কিন্তু সুর তৈরি করে। আমি নিজে একা কখনও লাইমলাইটে আসার চেষ্টা করিনি। যখন আমার ক্যারিয়ার শুরু তখন দুয়েকটা টক শোতে অংশ নিয়েছি। এখন ব্যান্ড লালন ছাড়া আমি একা কোনো টক শো, স্টেজ শো কিংবা কোনো আয়োজনে অংশ নিই না। অন্যান্য ব্যান্ডে যদি ঘটে থাকে তাহলে এর ব্যাখ্যা আসলে তারাই দিতে পারবে। লালন ব্যান্ডের ধরন অনেকটাই আনুশেহর ফর্ম ভেঙে। রক লালনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এখন লালন ব্যান্ডের। অনেকেই আপনাকে ফলো করার চেষ্টা করে, যেমন কপালে বড় টিপ, মাথায় গামছা। তারা কেউ লালন, কেউ সুফী বা অন্য ঘরানার গান করে। এই বিষয়টি কীভবে দেখেন? ব্যান্ড লালন নিজেদের জনপ্রিয়তার জন্য কখনোই কাজ করেনি। মিডিয়া থেকেও অনেকটা আড়ালে থেকেছে। ব্যান্ড লালনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাঁইজির গানকে বা তার দর্শনকে নিজেদের মতো করে তুলে ধরা। আমরা সর্বপ্রথম মানুষ, ছোট-বড় উঁচুনিচু, সব কিছুর ঊর্ধ্বে যে আমরা মানুষ এটাই বুঝানোর চেষ্টা করছি। সাঁইজির দর্শনটা সবার থেকে ভিন্ন ও সুন্দর বলে আমরা মনে করি। এই গেটআপটা আমাদের কখনোই ইচ্ছাকৃত বানানো না, আমরা ব্যক্তিগত জীবনে যে যা তাই আছি, তাতেই সাজি। তিতি যেরকম, বাপ্পি যেরকম, নিজেদেরকে নিজেদের মতো করেই সাজিয়েছি। আমি মনে করি আমাদের ব্যান্ডকে ফলো না করে আমাদের দর্শনকে ফলো করা উচিত। কাউকে ফলো করার জন্য মুখোশ পড়ে নিজেকে আড়াল করার কিছু নেই। প্রত্যেকের মাঝেই এক অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকে। নিজের প্রকৃতটাকে নিজের মতো করে তুলে ধরুন, আপনার আত্মা যা বলে তাকে তুলে ধরুন। তারপরও বলব, ব্যক্তি আমাকে যদি কেউ ফলো করে তাহলে এটা আসলেই খুশি হওয়ার বিষয়।