ফলে বিষ:খাবেন সাবধানে
ডা. সজল আশফাক সহযোগী অধ্যাপক, নাক কান গলা বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ২০:০৮
চেম্বার:কমফোর্ট ডক্টরস চেম্বার, গ্রীন রোড ঢাকা
ফলকে বলা হয় বেহেশতের খাবার। বিজ্ঞানের চোখেও ফল খুবই উন্নত ধরণের খাবার হিসাবে পরিগণিত। আর তাই অসুখ-বিসুখে রোগীর বিছানার পাশে দেখা যায় ফলের সমাহার। সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত কিছু না কিছু ফল গ্রহণের কথা বলা হয়ে থাকে। শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেলসহ বিভিন্ন উপাদানের যোগান দেয় এই ফল। জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই তাই শিশুকে ফলের রস খাওয়ানোর উপদেশ দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু সামপ্রতিককালে আমাদের দেশে ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে বেহেশতের খাবার ফলকে এখন আর আমাদের দেশে নিরাপদ বলা যাচ্ছেনা। ফলের পচনরোধে ফলে ব্যবহার করা হয় ফরমালিন, ফল পাকানো ও রঙিন করার জন্য ব্যবহার করা হয় কার্বাইডসহ নানা রাসায়নিক উপাদান। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর একথা এখন সচেতন মানুষের অজানা নয়। তাই কাউকে ফল খাওয়ার উপদেশ দিতে গেলে, উল্টো ফরমালিনের ঝুঁকির কথাটা শুনতে হয়। ফলে ফরমালিন ব্যবহারের ব্যাপ্তি এতটাই বেড়েছে যে, এখন গাছে থাকা অবস্থাতেই আম, লিচুতে সেপ্র করা হয়। কিন্তু তাই বলে কি ফলের মত উন্নত একটি খাবার খাওয়া বন্ধ থাকবে? ফলের যত গুণাগুণ তুলে ধরা হোক না কেন বারবার ফল গ্রহণের ঝুঁকির বিষয়টা সামনে এসে দাঁড়াবে।
আমাদের দেশে প্রায় সারা বছর ধরে বিভিন্ন ফল পাওয়া গেলেও শুধু জৈষ্ঠ্য মাসকে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে মধু মাস বলে। এই মাসে দেশে আম, জাম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ধরণের ফলফলাদি সহজলভ্য হয়ে ওঠে। এই সব ফলের প্রতিটিই পুষ্টি প্রাচুর্যে অনন্য। আমের কথাই ধরা যাক। আম সকলের কাছেই প্রিয় ফল। কাঁচা কিংবা পাকা, টক কিংবা মিষ্টি, যাই হোক সবই প্রিয়। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক সকলেরই পছন্দ আম। একেক জন একেকভাবে খাচ্ছেন। আমের সবগুলো পরিবেশনাই মজাদার ও পুষ্টিকর। আম যেভাবেই পরিবেশন করা হোক না কেন এতে আমের পুষ্টিগুণ খুব একটা হেরফের হয় না। তবে সাধারণভাবে বলা যায় রান্না করা খাবারে যেমন ভিটামিন সি এর গুণাগুণ বজায় থাকে না, আম রান্না করে খেলে একই ব্যাপারটা ঘটে থাকে। তবে অটুট থাকে অন্যান্য
ভিটামিনের গুণাগুণ।
প্রতি ১০০গ্রাম পাকা আমে রয়েছে ৮৩০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন, একই পরিমাণ পাকা কাঠালে ক্যারোটিনের পরিমান ৪৭০০ মাইক্রোগ্রাম। উল্লেখ্য এই ক্যারোটিন শরীরের ভিটামিন-এ তে রূপান্তরিত হয়। এছাড়াও প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে রয়েছে ৪১ মিলি গ্রাম ভিটামিন সি। যা ১২ বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর ভিটামিন-সি এর দৈনিক চাহিদার দ্বিগুণ। আমের চেয়ে জামে ভিটামিন সি এর পরিমাণ কিছুটা বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম কালো জামে রয়েছে ৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, লিচুতে এর পরিমাণ ৩১ মিলিগ্রাম। তবে ভিটামিন সি সবচেয়ে বেশি রয়েছে পেয়ারায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পেয়ারায় রয়েছে ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। আর এ কারণে আর আঙ্গুরে এর পরিমাণ ২৯ মিলিগ্রাম। স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন সি খুবই কার্যকরী। উল্লেখ্য ভিটামিন সি এর অভাবে মাঢ়ি দিয়ে রক্তপাত হয়ে থাকে। এ ছাড়াও ভিটামিন সি ক্ষত সারাতে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে। এ কারণে যে কোন অপারেশনের পর ডাক্তাররা ভিটামিন সি গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ভিটামিন এ-এর চাহিদা পূরণে আম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই মধুমাসে বেশি বেশি আম খাওয়া উচিত। খাবারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভিটামিন-এ গ্রহণে ক্ষতি নেই। কারণ বাড়তি ভিটামিন-এ লিভারে সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে। ফলের ব্যাপারে একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, সব ফলেই রয়েছে কিছু না কিছু খনিজ পদার্থ, ক্যালশিয়াম, লৌহ, ভিটামিন-বি১, বি২, ভিটামিন সি, এ। এইসব উপাদানের অনেকগুলোরই রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট গুনাগুণ। এন্টি অক্সিডেন্ট শরীরকে বুড়িয়ে যাওয়াকে ধীর করে। হূদপিন্ডকে সুস্থ রাখে। আর ফলের আঁশ দূর করে কোষ্ঠকাঠিন্য, শরীরে মেদ জমতে বাধা দেয়। যে কোন বয়সের জন্য অনবদ্য খাবার হল ফল। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ফল বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলের বিকল্প ফলই। প্রতিদিন কিছু না কিছু ফলে গ্রহণ করলে পৃথকভাবে ভিটামিন ক্যাপসুল, ট্যাবলেট কিংবা সিরাপ গ্রহণের কোন দরকারই পড়ে না। ফল দীর্ঘ জীবনের নিয়ামক, ফল জীবনকে সুন্দর করে, সুস্থ রাখে।
ফলে ফরমালিন
হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
আজকাল বাজারে ফলমূলের দোকানে গেলে মাছি কিংবা মৌমাছি কোনটাই চোখে পড়ে না, ফলের গায়ে হাঁটে না পিপঁড়ার সারি। এর কারণ কী? উত্তর একটাই। কারণ, কারবাইড ও ফরমালিন মেশানোর কারণে মৌমাছি আর মধু আহরণ করতে ওই ফলে যায় না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ফল তাজা রাখার উদ্দেশ্যে ফরমালিন, আর পাকানো ও উজ্জ্বল করার জন্য কারবাইড ব্যবহার করে থাকে। এসব কেমিক্যাল একধরনের বিষ, যা অল্পমাত্রায় খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হবে না; কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।
ফরমালিন সাধারণত মানুষের লাশসহ বায়োপসির নমুনা তাজা রাখতে ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাত্ক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেনসহ সবকিছুুকে
ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল
করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়।
শেষ পর্যন্ত ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং
শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে
ওঠানামা করে। ফরমালিন ও
অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত
ফলমূল খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুরও জন্ম হতে পারে। এ থেকে প্রতিকার পেতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। বাজারে ফল-মূল দেখে-শুনে কিনতে হবে। ফলের মত প্রয়োজনীয় একটি খাবারকে এখন শিশুর হাতে তুলে দিতে ভয় পাচ্ছেন অভিবভাবক। জনগণের সম্পৃক্ততা, সচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগের দৃঢ়তার মাধ্যমেই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।