সিগারেটের উপর শুল্ক না বাড়ানো প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ২১:২৬
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) ধারায় স্বাস্থ্য হানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। অথচ সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে বাজেট পেশ করেছেন সেখানে অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজ সিগারেটের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের পরিবর্তে সিগারেটের ব্যবহার উত্সাহিত করতে নতুন করে কোনো সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেননি। অথচ মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১১-২০১২ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করার সময় বলেছিলেন, ‘নিম্নতম পর্যায়ের সিগারেট সেবন গত কয়েক বছরে খুব বেড়ে গেছে।
তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বিদ্যমান থাকার কারণে দেশব্যাপী তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার সীমিত করার জন্য জনমত সৃষ্টি হয়েছে।’ বাজেট উত্তর সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান সিগারেটের দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, এতে ধূমপান নিরুত্সাহিত হবে (প্রথম আলো, ১১ জুন ২০১১)।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবারের মেয়াদে ক্ষমতাগ্রহণের পর ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে বজেট অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘সিগারেটের উপর একটু বেশি করে কর বাড়িয়ে দিতে হবে। সিগারেটের উপর কমানো যাবে না।’ তারপরও সিগারেটকে আনুকূল্য দিতে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকারক পদক্ষেপ কেন সরকার গ্রহণ করতে যাচ্ছে?
বিগত দিনের ইতিহাস আমরা যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব, সরকারের জনবিরোধী আনুকূল্য বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলো পেয়ে এসেছে বরাবরই। সিগারেটের বাজার সম্প্রসারণের জন্য ২০০৩-২০০৪ অর্থ বছরের সর্বনিম্ন মূল্যস্তরের সম্প্রসারণের জন্য ২০০৩-২০০৪ অর্থ বছরের সর্বনিম্ন মূল্যস্তরের সম্পূরক শুল্ক ৩৫% পরবর্তী ২০০৪-২০০৫ অর্থ বছরে কমিয়ে করা হলো ৩২% এবং এই জনস্বাস্থ্যবিরোধী আনুকূল্য অব্যাহত রাখা হলো পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে। সিগারেটকে গরীব জণগণের হাতের নাগালের ভিতর নিয়ে তাদের প্রলুব্ধ করার জন্য কমদামী সিগারেট প্রচলনের উদ্দেশ্যে চালু করা হলো মূল্যস্তরে চতুর্থ ধাপ।
উল্লেখ্য, বাজেট পরবর্তি সময়ে পত্র-পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার খবরে অন্যান্য কতিপয় পণ্যের সাথে সাথে সিগারেটেরও মূল্য বৃদ্ধি পাবার যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে তাতে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে প্রস্তাবিত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের অতি উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন কোন সিগারেটের উপর শুল্ক বাড়ানো হয়নি, শুধু মূল্যস্তর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে যার কারণে সরকারের রাজস্ব বাড়ার পরিবর্তে মালিক পক্ষই লাভবান হবেন।
আজকে এ কথা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, যেহেতু বাংলাদেশে সিগারেটের উপর শুল্ক অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। তাই পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তার সিগারেটের দেশ বাংলাদেশ। এর ফলে ধূমপানের হার অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০০৭ জানাচ্ছে বাংলাদেশের ৬০ ভাগ পুরুষ সিগারেটে আসক্ত। বাংলাদেশ শহর স্বাস্থ্য জরিপ ২০০৬ জানাচ্ছে নগরের বস্তির ৫০ শতাংশ পুরুষ সিগারেটে আসক্ত।
পুরুষ জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশিকে সিগারেটের নেশায় বুঁদ করার পরেও সরকার বাজেটে সিগারেটকে আনুকূল্য দেখিয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? জনস্বার্থে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যেখানে সিগারেটের উপর অতি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ জনদাবি সেখানে ভোটের আগে কেন সরকার জনগণের বিপক্ষে যেয়ে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত?
জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনে সর্বোপরি জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য অবিলম্বে সরকার সিগারেটের উপর অতি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ এবং ৪র্থ স্লাব বাতিল করবেন এটাই এখন জণগণের প্রত্যাশা।
লেখক :জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ