খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের বাধা-বিপত্তি
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ২১:৪৯
মহামতি মার্কস বলেছেন, পুঁজির ধর্ম মুনাফা, এক’শ টাকার লাভ দশ টাকা দেখলে চোখ ছলছল করে, বিশ টাকা হলে জিহ্বায় লালা আসে। এক’শ টাকায় এক’শ টাকা লাভের সম্ভাবনা থাকলে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা করা হয় না। পাঠ্যসূচিতে মার্কসের থিয়োরি মুখস্ত করলেও প্রাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় মানুষের বৈষয়িক জীবনে। খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধে সরকারি জনবলের অব্যবস্থাপনা, বাধা-বিপত্তি এই নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলেও মার্কসকে উদ্ধৃত করার বিশেষ কারণ নিবন্ধপাঠে পাঠকেরা বুঝতে সক্ষম হবেন বলে ভরসা রাখছি। সরকার ইতিমধ্যে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩’ সংসদে পাসের আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। কোনো কোনো দৈনিকের লিড নিউজ দেখে মনে হয়েছে অনুরূপ আইন বা কার্যক্রম দেশে আগে ছিল না। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের পরিণতি সম্পর্কে দেশের জনগণ যথেষ্ট সচেতন থাকায় সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ অব্যাহত থাকে। ফলে খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধে সরকার কিছু কার্যক্রম গ্রহণে বাধ্য হয়। যার মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন অন্যতম। এর সুবিধা হলো আমজনতাকে বোঝানো যায় যে, খাদ্যের ভেজাল রোধে সরকার আন্তরিক। শুভঙ্করের ফাঁকিটা এখানেই। বিগত সরকার খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণের মাদার-ল ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আইন- ১৯৫৯’র যুগোপযোগী সংশোধনী আনেন ২০০৫ সালে। যে সংশোধনীতে National Food Safety Advisory Council নামে ১৬ সদস্যের আমলানির্ভর একটি পরিষদও গঠন করা হয়েছিল। নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানে যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা। যাদের কাজ খাদ্যের নিরাপত্তা, প্রশাসন, মাননির্ধারণ ও কৌশল গ্রহণ বিষয়ে সরকারকে যথাযথ পরামর্শ দান। বিগত ৮ বছরে এই পরিষদের কোনো বৈঠক হয়েছিল কিনা, এতদিবষয়ে সরকারের প্রতি কী কী পরামর্শ রয়েছে তা জনগণ জানে না। বিগত সরকারগুলোর আমলে আইনের সংশোধন সত্ত্বেও ভেজালের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকায় সরকারের উদাসীনতা জনগণকে হতাশ করে। জনস্বার্থে সংক্ষুব্ধ হয়ে HRPB-র সভাপতি বরেণ্য আইনজীবী মনিজল মোরসেদ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মহামান্য হাইকোর্টে রীট পিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট ২০০৯ সালে সরকারকে একটি যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেন। যার মর্মার্থ— অবিলম্বে জেলায় জেলায় ফুড-কোর্ট ও ফুড-ল্যাবরেটরি স্থাপন করে খাদ্যের ভেজালবিরোধী কাজে গতিশীলতা আনতে হবে। প্রস্তাবিত নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩ কি এরই ধারাবাহিকতা না অন্য কিছু? চলতি বাজেটে জনস্বাস্থ্যের রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিশেষ বরাদ্দ থাকবে কি?
সমসাময়িক বাংলাদেশে প্রচলিত আইন-কানুনের ভিত্তিতে হাফ ডজনের বেশি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা খাদ্যের ভেজাল নিরোধক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো ভেজালের ধরন-ধারণ, সার্বিক তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের কেন্দ্রীয় একক ব্যবস্থা না থাকায় বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক চিত্র সরকারের কোনো দপ্তর বা সংস্থা পরিসংখ্যান দিয়ে বলতে পারে না। স্থির লক্ষ্য উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে গৃহীত কর্মকৌশল ও গন্তব্য দৃশ্যমান না থাকায় সমস্যার মূলোত্পাটন বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। ভেজালের মূল বেনিফিশিয়ারি গোষ্ঠীগুলো কৌশলে লেফাফা দুরস্ত তত্পরতার মধ্যে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রমকে উত্সাহিত করে চলেছে, যা কখনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
খাদ্যের ভেজাল জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় এবং বিজনেস রুলস অব ১৯৯৬ অনুযায়ী উপযুক্ত দক্ষ জনবল তৈরির দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। বৃটিশ আমলে স্থানীয় সরকার বিভাগ অনুরূপ কাজের দায়িত্ব পালন করলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশবলে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের (১৯২৭ সালে থানাভিত্তিক সৃষ্টি করা পদ) স্বাস্থ্য বিভাগে আত্মীকরণ করা হয়। মূলত এই স্যানিটারি ইন্সপেক্টরগণই হচ্ছেন খাদ্যের ভেজাল ও রোগ প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত বুনিয়াদি জনবল। মানব কল্যাণে চিকিত্সাবিজ্ঞানের মূল তিনটি কর্মপদ্ধতি i) Preventive (প্রতিরোধমূলক) ii) Curative (চিকিত্সামূলক) ও iii) Analysis (বিশ্লেষণমূলক) অনুস্মরণ করে বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে স্বার্থান্বেষী মহল সুচতুর কৌশলে Preventive বা রোগ প্রতিরোধমূলক ধারাকে দুর্বল করে রেখেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ের বিনিময়ে খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধ ও রোগ প্রতিরোধের দক্ষ জনবল তৈরির ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। ১৫০০ উদ্বৃত্ত জনবল কোনো কাজে আসছে না। এই অব্যবস্থাপনার মূলে অসত্ মুনাফা বৃত্তি। প্রশাসনিক ডাক্তারগণ ব্যবসায়ী-চিকিত্সক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শ্রেণি স্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন। জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের রোগ প্রতিরোধমূলক ধারা শক্তিশালীকরণে চরম অনীহা। মানুষ মরুক পচুক তাতে কী? ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ নামক দোকানের প্রসার ও মক্কেল বৃদ্ধি চাই। উদ্বৃত্ত জনবলের এত বড় রাষ্ট্রীয় অপচয় উপরস্থ আমলার চোখে পড়ে না। চোখ অন্ধ। কারণ পুঁজির স্বার্থ আর আমলার স্বার্থ মিলেমিশে একাকার।
ভেজাল নিরোধ কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিএসটিআই মূলত পণ্যের মান নির্ধারণী সংস্থা। মাঠ পর্যায়ে জনবল সীমিত। ভোক্তার কার্যক্রম বড় শহর কেন্দ্রিক ও এক ধরনের পুলিশি ব্যবস্থা। খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধ, রোগ প্রতিরোধ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে উপযুক্ত দীর্ঘমেয়াদি (৪ বছর) প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনবলের পরিমাণ সর্বাধিক। তার পরের অবস্থান এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের। সকল বাধা-বিপত্তির অবসান ঘটিয়ে মাঠে কর্মরত বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থার কর্মীবাহিনীর জন্য পৃথক ডাইরেক্টরেট গঠন করে একই উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে কর্ম পরিচালনার বিকল্প নেই। খাদ্যমন্ত্রী দেশের জনগণকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তার বাস্তব রূপ যেন আমরা দেখতে পাই।
ঢাকা