গ্যালারি কায়া’র দশ বছরে শিল্পীদের মিলনমেলা
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ২৩:০১
দশ বছরে পা রাখলো দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প প্রদর্শনী কেন্দ্র ‘গ্যালারি কায়া’। এ উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার উত্তরায় গ্যালারি প্রাঙ্গণে দেশের নবীন-প্রবীণ শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের মিলনমেলা বসেছিল। দেশের শিল্পচর্চাকে শিল্পরসিকদের সামনে তুলে ধরবার যে প্রয়াস গ্যালারিটি শুরু করেছিল; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই লক্ষ্য পূরণ করে দেশের শিল্পযাত্রায় ইতিমধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। মিলনমেলায় সেই দশ বছরের যাত্রাকে স্মরণ করলেন সবাই। আর মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশের ৩০ জন শিল্পীর ৩৯টি ছবি নিয়ে শুরু হয়েছে ‘গ্লিমসেস’ বা ‘ঝলক’ শীর্ষক মাসব্যাপী চিত্র প্রদর্শনী।
গ্যালারি কায়ার পরিচালক গৌতম চক্রবর্তী একজন শিল্পী। তার বাবা প্রয়াত শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী দেশের স্বনামধন্য শিল্পীদের একজন। শিল্পী পরিবারের সদস্য হিসাবেই গৌতম শুরু করেছিলেন এই গ্যালারি। তিনি বললেন, ‘দশ বছর আগে যখন এই গ্যালারি শুরু করি তখন জানতাম না কতদিন এটা চালাতে পারবো। এই দশ বছরে অনেক কাজ করেছি। অনেক স্বপ্ন ছিল যা করতে পারিনি। আগামীতে নিশ্চয়ই সেসব স্বপ্নপূরণ করা সম্ভব হবে। তবে খুব ভালো লাগছে গত দশ বছরে যারা একসঙ্গে চলেছি, যাদের সহযোগিতা পেয়েছি — সেই শিক্ষক, শিল্পী, বন্ধুরা সবাই এসেছেন। তাদের এই উপস্থিতি নতুন প্রেরণা তো দিচ্ছেই।’
শিল্পী রফিকুন নবী বললেন, গৌতম শিল্পী পরিবারের ছেলে। বাবার উত্তরাধিকার নিয়ে বেড়ে উঠেছে। এই গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করে সে চেয়েছে বাবার শিল্পবলয়ের ধারা ধরে রাখতে। শিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্কটা অটুট রাখতে। কারণ, একজন শিল্পীর পক্ষে গ্যালারি চালানো খুব কঠিন। তার মধ্যে এই উত্তরায়। যেটা ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে নয়। সেই দিক থেকে শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী একটা ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু সে সফলতা পেয়েছে।
তরুণ শিল্পী আশরাফুল হাসান বললেন, এই গ্যালারির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা তরুণদের সুযোগ দিয়েছেন। সম্ভাবনাময় শিল্পীদের একক প্রদর্শনীর সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সাধারণত দেশের গ্যালারিগুলো জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে প্রদর্শনী করে থাকে। কারণ তাদের ছবি শিল্পরসিকরা বেশি সংগ্রহ করেন। কিন্তু তরুণদের পরিচিত করে তুলবার আগ্রহ গ্যালারিগুলোর মধ্যে খুব কম। গ্যালারি কায়া এই দিক দিয়ে ব্যতিক্রম ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।
প্রদর্শনীতে যেসব শিল্পীদের চিত্রকর্ম রয়েছে, তারা হলেন— শিল্পী আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, কাইয়ূম চৌধুরী, নিতুন কুন্ডু, সমরজিত্ রায় চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, হামিদুজ্জামান খান, কালিদাস কর্মকার, মনসুর-উল-করিম, চন্দ্র শেখর দে, তরুণ ঘোষ, শম্ভু ঘোষ, কাজী রাকিব, রনজিত্ দাস, গোলাম ফারুক বেবুল, মাসুদা কাজী, শিশির ভট্টাচার্য, ফারেহা জেবা, সমিরন চৌধুরী, রফি হক, আনিসুজ্জামান, নাগারবাসি বর্মন, তরিকত ইসলাম, শেখ মো. রোকুনুজ্জামান, আশরাফুল হাসান, কামালউদ্দিন, বিশ্বজিত্ গোস্বামী ও সোহাগ পারভেজ। প্রদর্শনী ২০ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
ছায়ানটের বর্ষাবরণ :শুক্রবার বর্ষাকে নৃত্য-গীত আর কথামালায় বরণ করলো দেশের ঐহিত্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। বর্ষাবরণের পাশাপাশি জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালকে স্মরণ করলো তারা। সন্ধ্যায় ছায়ানট মিলনায়তনের এ আয়োজনের সূচনাতেই প্রিয়াংকা গোপ পরিবেশন করেন ‘মিয়া কি মালহার’ রাগ। এর আগে বর্ষা-কথনে অংশ নেন ছায়ানটের সহ-সভাপতি সারওয়ার আলী। এরপর জয়ন্ত রায় আবৃত্তি করেন জীবনানন্দ দাশের ‘বৃষ্টির জল’ কবিতা। এর পর পর পরিবেশিত হয় কবিগুরুর বর্ষা বিষয়ক গান। গাইলেন মিতা হক, ইফফাত আরা দেওয়ান, অদিতি মহসিন, এটিএম জাহাঙ্গীর, সিফায়েত উল্লাহ, মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না প্রমুখ। গানের পর আবার পাঠ। এবার সুধীন্দ্রনাথ দত্তের রচনা ‘শ্রাবণ বন্যা’ পাঠ করেন জহিরুল হক খান। এরপর নজরুলের বর্ষা বিষয়ক গান পরিবেশন করেন খায়রুল আনাম শাকিল, সুমন মজুমদার, বিজনচন্দ্র মিস্ত্রী, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি ও শামীমা পারভীন শিমু। তৃতীয় দফার গানের আয়োজনে ছিল বর্ষাবিষয়ক লোকসঙ্গীত। এই পর্বে নাদিরা বেগম, চন্দনা মজুমদার, বিমানচন্দ্র বিশ্বাস, ইলোরা আহমেদ শুক্লা, লাইসা আহমেদ লিসা, আজিজুর রহমান তুহিন প্রমুখ গান পরিবেশন করেন। ছায়ানট বিদ্যায়তনের শিল্পীদের কণ্ঠে পাঁচটি সম্মেলক গান পরিবেশনের মধ্যে শেষ হয় ছায়ানটের বর্ষা উত্সব।
ফুলপ্র্রেমি রবীন্দ্রনাথ :নিজের সৃজনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের বিপুল অভিজ্ঞতার কথা যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনি তুলে ধরেছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের বিবরণ। তাঁর বহু গান বৃক্ষলতা, ফুলের গন্ধে সুরভিত হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র সঙ্গীতে প্রায় ৭০টির মতো পুষ্প-বৃক্ষের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রকাব্যে ফুলের রং, রূপ, রস ও গন্ধে মাতানো ৩টি কবিতা ও ১৭টি সঙ্গীতের পরিবেশনায় শুক্রবার হয়ে গেলো ‘ফুলের প্রেমে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক আয়োজন। সঙ্গীত সংগঠন উত্তরায়ণ এর আয়োজন করে। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি মঞ্চস্থ হয়।
উত্তরায়ণের শিল্পীদের পরিবেশনায় সঙ্গীত ও আবৃত্তি পরিবেশনের সঙ্গে ছিলো ভিডিও প্রজেকশন ও যন্ত্রসঙ্গীতের ঐকতান। উত্তরায়নের পরিচালক শিল্পী লিলি ইসলামের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ ধরনের ঐকতান পরিবেশনের জন্য অংশ নেন ভারতের বেহালা শিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক দুর্বাদল চট্টোপাধ্যায়, সেতার শিল্পী রাহুল চট্টোপাধ্যায়, এস্রাজ শিল্পী শুভায়ূ সেন মজুমদার, কিবোর্ড শিল্পী গৌতম সোম, তবলা শিল্পী জয়দেব নন্দী ও তালবাদ্য শিল্পী সঞ্জীবন আচার্য। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও সঞ্চালনায় ছিলেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডালিয়া আহমেদ।
নাটমন্ডলে চিরকালের বাঁশি :শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমন্ডলে অনুষ্ঠিত হলো ‘চিরকালের বাঁশি’ শীর্ষক আবৃত্তি প্রযোজনা। প্রযোজনাটি সাজানো হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা দিয়ে। আর কবিতা নিয়ে এমন আয়োজনের উপলক্ষ ছিল দু’টি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির শতবর্ষ পূর্তি এবং প্রকাশ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের ২৩ বছর পূর্তি। প্রকাশ আয়োজিত এই আবৃত্তি প্রযোজনার নির্দেশনায় ছিলেন ফয়জুল আলম পাপ্পু। রবীন্দ্রনাথের ১৭টি এবং একটি নিবেদিত কবিতায় সাজানো হয় আয়োজন।