স্পিকারের দায়িত্ব এড়ানো যায় না
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ২৩:১১
কোনো সুপরামর্শই কাজে আসিতেছে না। জাতীয় সংসদে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের যেই সীমারেখাটি দীর্ঘদিন যাবত্ বলবত্ আছে— তাহা লঙ্ঘিত হইয়াছে আগেই। এখন লাগামহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের তোড়ে শালীনতার সর্বজনস্বীকৃত সীমারেখাটিও লুপ্ত হইবার উপক্রম হইয়াছে। সংসদের অধিবেশনে সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করা হইতেছে— যাহা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নহে। শালীনতাবিবর্জিত এই আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইতেছেন না জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও। কয়েকদিন যাবত্ এই অবস্থা চলিয়া আসিলেও গত বৃহস্পতিবার তাহা চরমে পৌঁছায়। এই সময়ে অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী। তিনি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে বারবার বাজেটের উপর আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখিবার আহ্বান জানাইলেও কোনো কাজ হয় নাই। এক পর্যায়ে মাইক বন্ধ করিয়া দেওয়ার দাবি উঠিলেও স্পিকার তাহাতে সাড়া দেন নাই। কেন দেন নাই তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। বস্তুত স্পিকারই হইলেন সংসদের কাণ্ডারি। সংসদ অধিবেশন চলাকালে তাঁহার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সুষ্ঠুভাবে সংসদ পরিচালনার স্বার্থে তিনি সীমালঙ্ঘনকারী সদস্যের মাইক বন্ধ করিয়া দেওয়া এবং অবাঞ্ছিত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করাসহ যে কোনো সিদ্ধান্তই গ্রহণ করিতে পারেন। সংসদে সীমালঙ্ঘনের ঘটনা যেমন কমবেশি সর্বত্রই ঘটিয়া থাকে, তেমনি এই ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিতে হয় তাহাও স্পিকারের গুরুদায়িত্ব যাহারা পালন করেন তাহাদের অজানা নহে।
দীর্ঘ বিরতির পর বিরোধী দলের সংসদে যোগদানকে কেন্দ্র করিয়া সংসদে প্রাণ সঞ্চারের যেই সম্ভাবনার সৃষ্টি হইয়াছিল গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ তাহাকে অনেকটা ম্লান করিয়া দিয়াছে। প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক অশ্রদ্ধা ও অসহিষ্ণুতা নূতন নহে। আসন্ন সংসদ নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হইবে— সেই বিতর্ককে কেন্দ্র করিয়া এই অসহিষ্ণুতার মাত্রা বাড়িয়াই চলিয়াছে। ইহা লইয়া সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কোনো সীমা-পরিসীমা নাই। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় উপনীত হইবে— এই প্রত্যাশা সর্বজনীন। বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারদের মনোভাবও ভিন্ন নহে। সমঝোতায় উপনীত হইবার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পন্থাটি হইল, সাংঘর্ষিক বা বিরোধাত্মক বিষয়গুলিকে যথাসাধ্য সজ্ঞানে পরিহার করা বা এড়াইয়া চলা এবং উভয়ের মধ্যে দূরত্ব কমাইয়া আনা। সংসদের চলতি অধিবেশনে সেই ধরনের একটি সুযোগও সৃষ্টি হইয়াছিল। কিন্তু সংসদে যাহা চলিতেছে তাহাতে অনৈক্য ও সংঘাতের পথ যে আরও প্রশস্ত হইতেছে— তাহা নির্দ্বিধায় বলা চলে। ইহাতে সরকারি বা বিরোধী দল কেহই যে বিন্দুমাত্র লাভবান হইবে না তাহাও নিশ্চিত। দেশের লাভক্ষতির প্রশ্ন নাইবা তুলিলাম।
প্রশ্ন হইল, যাহা কাহারও জন্য হিতকর নহে সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দিনের পর দিন সেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য কেন চলিতে থাকিবে? সন্দেহ নাই যে স্ব স্ব সংসদীয় দলের পক্ষ হইতে ইহার লাগাম টানিয়া ধরা গেলে ভালো হইত। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পর্যায়ে পৌঁছাইলে হয়তো এই সম্পাদকীয় লিখিবারই প্রয়োজন পড়িত না। লাগাম অবশ্যই টানিয়া ধরিতে হইবে। আর এই দায়িত্বটি পালন করিতে হইবে স্পিকারকেই। অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে কাহারও মুখাপেক্ষী হইবার অবকাশ নাই।