[ নি র্বা চ ন ]

স্বচ্ছ সিটি নির্বাচনের পরে কেয়ারটেকার কেন দরকার?

১৫ জুন দেশের চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৮ দল সমর্থিত সকল প্রার্থীর বিপুল বিজয় অর্জিত হয়েছে এবং মহাজোট প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে—ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে নির্বাচনকে মুক্ত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হিসেবে উল্লেখকরণেও সরকার ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বেশকিছু অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও আচারণবিধি লংঘনের অভিযোগ করা হয়েছে, যা নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নির্বাচন পদ্ধতিকে প্রশ্নমুখী করছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন কি বর্তমান সরকার ও বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে নাকি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার বা কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মহাসংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এবং সেজন্য এর একটি সমাধানও এ মুহূর্তে সকলের প্রত্যাশিত। যে চারটি সিটিতে নির্বাচন হলো, তার প্রত্যেকটিতে মহাজোট সমর্থিত মেয়র ক্ষমতাসীন রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে দু’জনের রাজনৈতিক অর্জন অসাধারণ। এটা একটা সংগত প্রশ্ন যে, এত বিজয়মুখী উপাদান থাকা সত্ত্বেও কেন সরকার সমর্থিত প্রার্থিগণ এমন অবিশ্বাস্য পরাজয় বরণ করলেন। এ প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর অর্জিত হলেই কেবল সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্তে আসা সহজ হবে। সরকারের নির্বাচনী ভরাডুবির সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় কৌশলের পরিবর্তে মহাজোট সরকারের জাতীয় সরকার নির্বাচনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলও একইভাবে পাল্টা কৌশল নির্ধারণ করে। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় ইস্যু প্রাধান্য পায়। স্পষ্টত: জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক অর্জনের ক্ষেত্রে সরকারের সর্বব্যাপী ব্যর্থতা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ন্ত্রিত করে। ফলে মহাজোটের চার কীর্তিমান আঞ্চলিক প্রাণপুরুষকে জনগণ ভোট দেয়নি, তারা ভোট দিয়েছে দলকে। অর্থাত্ জনগণের রায় বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের পক্ষে এবং আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় মহাজোটের বিপক্ষে। স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী-এমপিগণ অনেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে এমন অর্বাচীন প্রচারাভিযানে অংশ নিয়েছেন যে, তাদের কথাবার্তা, চলাফেরা এবং বাচনবিষয়ও জনপ্রত্যাশার সীমা অতিক্রম করে। অধিকন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ প্রান্তিক বিষয়গুলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রচারকার্যে প্রতিফলিত করার পরিবর্তে কেবল ঐ সব কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোকে উপস্থাপিত করেছেন, যেগুলোর ব্যাপারে পূর্ব থেকেই সাধারণ মানুষের অপরিবর্তনযোগ্য মনোকাঠামো বা মাইন্ডসেট তৈরি হয়েছিল। কোন কোন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর অতিকথন ও চর্বিত চর্বনকে জনগণ আদৌ পছন্দ করেনি। ১৬ জুন দিবাগত রাতের ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় টক শোগুলোতে এ নির্বাচনে ধর্মের গুরুত্বের দুর্দান্ত আলোচনা দেখেছি। শাহবাগের গণজাগরণ এবং এর অব্যবহিত পর হেফাজতের দেশব্যাপী জাগরণের প্রেক্ষিতে যে সুশীল, সাংবাদিক, অধ্যাপক, তাত্ত্বিকগণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের গুরুত্বকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন, তারাও নির্বাচনোত্তর টকশোতে সংশোধিত বক্তব্য দিচ্ছেন বলে অনুমিত হচ্ছে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ফল নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন আর কোন সংশয় থাকছে না যে, এদেশের মাটি, মানুষ ও রাজনীতির হিমোগ্লোবিনে ধর্ম এমনভাবে মিশ্রিত যা পরস্পর বিচ্ছিন্নতায় টিকে থাকতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অর্থাত্ ধর্মকে রাজনৈতিক কার্যাবলীর বাইরে রাখা তাত্ত্বিক ও প্রয়োগিকভাবে অশুদ্ধ, অনুপযোগী ও অবাস্তব। ১৬ জুন মুন্নী শাহার সঞ্চালনায় এটিএন এর টকশোতে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়টিকে খুবই নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ১৭ ও ১৮ জুনে বিভিন্ন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। হেফাজতের মৌলিক দাবি মূল্যায়ন করে ধর্ম অবমাননাকারীদের আইনী প্রক্রিয়ার আওতায় এনে একে অতি সহজেই হেফাজতের বিরোধিতা পাশ কাটানো যেতো। নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে সরকারি হেভীওয়েট নেতা ও মন্ত্রীরা ১৪ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে এমন সব কার্যাবলীতে অংশ নিয়েছেন, যা নির্বাচনী আচরণবিধি বহির্ভূত। সেই নেতৃবৃন্দ এমনি, যাদের অনেকে আওয়ামী লীগে নবাগত, জনগণের ভাষা বুঝতে অপারগ। দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া ত্যাগী নেতৃবৃন্দ প্রচারবলয়ের বেশ বাইরেই থেকেছেন। এমনি অকপট নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ প্রবীণ নেতৃবৃন্দ যথা নূরে আলম সিদ্দিকী, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুল জলিল প্রমুখের প্রতি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনীহা ও অসম্মান দলটিকে আওয়ামীপন্থি আমজনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সম্প্রতি উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপিদের দ্বন্দ্বও এ অগ্নিতে ঘৃতাহুতি ঢেলে দেয়। সর্বোপরি হলমার্ক, শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, সোনালী ব্যাংক অর্থ তসরুফসহ নানান ইস্যুতে তৈরি হওয়া সরকার বিরোধী মনোভাব জনগণকে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ভোটদানে বাধ্য করে। ফলে ভোটের রাজা কামরান উন্নয়নের রূপকার লিটনসহ আওয়ামী লীগের ৪ জন প্রার্থীকেই করুণ পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। অনেকে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জেল-জুলুম, হয়রানিও জনগণকে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচন অনেক দিক থেকে বাংলাদেশের মত অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে নির্বাচনের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে সর্বমহলে। জয়-পরাজয়ের পর দল হতে নির্বিশেষে প্রান্তিক নেতৃবৃন্দ বিশেষত মেয়র প্রার্থিগণ একে অন্যের প্রতি শুভেচ্ছা ভালোবাসা ও অভিনন্দন জানিয়ে নির্মল রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, যা জাতীয় নেতৃবৃন্দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষণীয়। রাজনৈতিক মারামারি খুলনায় ব্যালট ছিনতাই, লিটনের মিডিয়া ক্যুর অভিযোগ, প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের সরকারি পরিবহন ও স্থাপনা ব্যবহারের অভিযোগসহ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এ নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে ৭৫-৮০% ভোটারের উপস্থিতি বিশ্বমিডিয়ায় তাক লাগিয়েছে। নতুন ভোটার ও তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণ নির্বাচনী হাওয়ায় পাল তুলেছে। টাকা-পয়সার ছড়াছড়িতেও সম্ভব নয় এমন নতুন এক বাস্তবতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমতাবস্থায়, প্রশ্ন হচ্ছে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন একই পদ্ধতিতে হলে দোষের কি? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী আমলা এমপিগণ বলছেন, কেয়ারটেকার সরকার ছাড়াই নিরপেক্ষ নির্বাচন যেহেতু সম্ভব, কাজেই কেয়ারটেকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন অনাবশ্যক। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক চাইলে নির্বাচনই হবে না। বিরোধী দলের মওদুদ আহমদসহ অন্য নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন, নির্বাচনে ১৮ দলীয় জোটের জয় বার্তা দিচ্ছে যে, ১৮ দলীয় জোটের দাবি কেয়ারটেকার ব্যবস্থার অধীনেই জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। এমন দ্বিমুখী অবস্থায় রাজনৈতিক সংকট পুনরায় ঘনীভূত হচ্ছে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। এ মুহূর্তে সম্ভবত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে কেয়ারটেকার ব্যবস্থাকে ঘিরে সৃষ্ট জটিলতার যৌক্তিক সমাধান বের করতে হবে। এখন আর আবেগ, বাগাড়ম্বর, শঠতার আশ্রয় নেয়া ঠিক হবে না। আমরা সুশীল সমাজের সাথে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বারবারই বলে আসছি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বা অনুরূপ একটি নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। কিছুদিন আগে একটি পত্রিকার জরিপের মাধ্যমে বিষয়টার একটা ধারণাও দিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনার শিকার হয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও রেডিও-টিভিতে বিশ্লেষকগণের অধিকাংশই কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পক্ষেই মত দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ বারবার বলছে, বিএনপির আমলে নির্বাচনে ভোট চুরি হয়, কিন্তু আওয়ামী আমলে জনগণ নির্ভীকভাবে ভোট দিতে পারে। আওয়ামী লীগের এ বক্তব্য সত্য বললে তা কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার প্রযোজ্যতাই প্রমাণ করে। কেননা, আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আমলের অনুষ্ঠিত নির্বাচন যেহেতু অস্বচ্ছ, অমুক্ত ও অনিরপেক্ষ হয়ে থাকে এবং জনগণ যেহেতু নির্ভীকভাবে ভোট দিতে অক্ষম হয়, সুতরাং বিএনপি সরকারের সেই অসাধু (?) নির্বাচনী প্রাকটিস থেকে মুক্তি পেতে হলেও অন্তত কেয়ারটেকার ব্যবস্থা জরুরি। আমরা যদি নিশ্চিন্ত হতে পারতাম যে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে অন্তত আগামী ১০/২০ বছর একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকবে, তাহলে হয়ত এ দাবি অনুযায়ী কেয়ারটেকার ব্যবস্থা না হলেও চলতো। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ-আমেরিকায় উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনী সংস্কৃতির উত্কর্ষতার বৈশিষ্ট্যসমূহ বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বতঃবিকশিত নয় বলেই এখানে কেবল দলীয় সরকারের গঠিত তথাকথিত পুতুল-স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত নির্বাচনে আস্থা রাখা যায় না। উপসংহারে আমরা বলবো, সুশীল সমাজের বক্তব্য-বিশ্লেষণ গণরায়ের আলোকেই তৈরি হয়, সুশীলরা কমই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট থাকেন। তাদের বিশ্লেষণের নিরিখে, জনগণের দাবির আলোকে এবং দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বন্ধুদেশের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান এখন সময়ের দাবি। এ দাবি উপেক্ষা করে কালপেক্ষণ কারো জন্য শুভ হবে না। বিদগ্ধ বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ‘দলের জন্য অশনি সংকেত’, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘পরাজিতদের জন্য সতর্কবার্তা’, সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও অপকর্মের বিচার’, হায়দার আকবার খান রনোর ‘সাড়ে চার বছরের কর্মকাণ্ডের জবাব’ প্রভৃতি সতর্কতামূলক নির্বাচনী মূল্যায়ন সরকার অবজ্ঞা না করে যদি সুষ্ঠু বাস্তবিক ও ফলপ্রসূ প্রশাসনমূলক কৌশল অবলম্বনে সচেষ্ট হয়, তাহলে বিস্ফোরণোন্মুখ জাতীয় রাজনৈতিক ধসের করাল গ্রাস হতে দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।