প্রধানমন্ত্রীর বাণী

আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এদিনে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি সংগঠনের অগণিত নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীসহ দেশবাসীকে। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক শামসুল হককে। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক এবং সাধারণ মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের সুমহান গৌরব অর্জন করেছে। আমি স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতাসহ আমাদের পূর্বসূরি নেতাকর্মীদের যাদের অক্লান্ত শ্রম, মেধা ও ত্যাগের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ আজ গণমানুষের এক বিশাল সংগঠনে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর এ ভূখণ্ডে যা কিছু বিশাল অর্জন তা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সঙ্গে এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ’৫২’র ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, ’৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২’র আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৪’র দাঙ্গার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা, ’৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯’র গণঅভ্যুত্থান সবই পরিচালিত হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ’৭০’র নির্বাচনে বাঙালি জাতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে নিরঙ্কুশ রায় দেয়। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু করে ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা। গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু তত্কালীন ইপিআর-এর ওয়ারলেসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন করে। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে সরকার শপথগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত সফল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের ফসল—স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন জাতির পিতা তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় রূপান্তরের সংগ্রামে ব্যস্ত তখনই ঘাতকরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে তাকে সপরিবারে হত্যা করে। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ৩ নভেম্বর কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং নির্যাতন আর নিপীড়নের মাধ্যমে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয় জনগণের সংগঠন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে। কিন্তু এ অপচেষ্টা সফল হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে জনগণের ভোটে আবারো রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এই সময়টি ছিল জাতির ইতিহাসে স্বর্ণকাল। বাংলাদেশ পরিণত হয় দারিদ্র্য দূরীকরণ, দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতিগত সংঘাত নিরসন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও উদার গণতন্ত্রের রোল মডেলে। খাদ্য ঘাটতির দেশ বাংলাদেশকে আওয়ামী লীগ সরকারই উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশে পরিণত করে। আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় মহান ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পায়। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কারও মধ্যস্থতা ছাড়াই স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরায় ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিশাল বিজয় অর্জন করে। এই বিজয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ ও জনগণের ধৈর্যের ফসল। জনগণের প্রাণের সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্য-সন্ত্রাস-দুর্নীতি-নিরক্ষরতামুক্ত, সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ, অসাম্প্রদায়িক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বিরোধী অপশক্তি জনগণের এই উন্নয়নকে নস্যাত্ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং সকল ষড়যন্ত্র নস্যাত্ করে দিবে—এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বাঙালি জাতির প্রতিটি মহত্ এবং শুভ অর্জনে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী ও ত্যাগী ভূমিকা রয়েছে। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগ এদেশের জনগণের পাশে থাকবে। দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।