নির্বাচনে এমপিদের পথের কাঁটা উপজেলা চেয়ারম্যান!

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপিদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিজ দলেরই উপজেলা চেয়ারম্যানরা। আগামী সংসদ নির্বাচনে অন্তত ১০০টি সংসদীয় আসনে বর্তমান এমপিদের পুনরায় মনোনয়ন দেয়া হলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় উপজেলা চেয়ারম্যানরা সরাসরি অবস্থান নেবেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে এসব জায়গায় এমপি বনাম উপজেলা চেয়ারম্যানরা কার্যত মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। এদিকে যেসব সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এসেছে, তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, যেসব জনপ্রতিনিধি জনস্বার্থ উপেক্ষা করে অপকর্মে জড়িয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না। তিনি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের ভরাডুবির ঘটনা থেকে নেতাকর্মীদের শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার নিজ জেলা নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার রামেন্দ্র মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন। দেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দেশে এখন নেতার ভিড়ে কর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। ফসল মার খেলেও নেতাদের বাম্পার ফলন, এরা সব হাইব্রিড নেতা। আগামী নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে আমাদের কাজের বিচার-বিশ্লেষণ করে। ডিজিটাল চেহারা আর হোন্ডা-গেইট গুনে কেউ ভোট দেবে না।’ এদিকে সম্প্রতি দেশের চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল অপ্রত্যাশিত ফলাফল করায় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বলে দলীয়সূত্রে জানা গেছে। শুধু উন্নয়ন করলেই যে ভোট পাওয়া যায় না সেটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে বেশ পরিষ্কার। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলটি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া অনেক জায়গায় এমপিদের অযাচিত খবরদারিতে উপজেলা পরিষদ যেমন অকার্যকর হয়েছে, তেমনি দলের অন্তর্কলহ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব আগামী নির্বাচনে অবশ্যই পড়বে বলে জানিয়েছেন দলটির উপজেলা চেয়ারম্যানরা। বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর রশিদ ইত্তেফাককে বলেন, ৪৮১ জন উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে ৩৪৭ জনই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত। এই ৩৪৭টি উপজেলার মধ্যে অন্তত ১৫০টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এসব আসনে ক্ষমতাসীন দলের এমপি রয়েছেন। উপজেলা পরিষদ আইনে এমপিদের উপদেষ্টা রাখায় তারা পরিষদের উপর খবরদারি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ পর্যন্ত করেন না। এ নিয়ে চেয়ারম্যানদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে এসব এমপিকে পুনরায় মনোনয়ন দেয়া হলে উপজেলা চেয়ারম্যানরা তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। এতে নির্বাচনের ফলাফলের উপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এখনো সময় আছে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন বাস্তবায়ন করে উভয়ের মধ্যে দূরত্ব দূর করা। এটি করা হলে ফলাফল ভিন্ন রকম হতেও পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান বাদশা ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে ১০০টি সংসদীয় আসনে বর্তমান এমপিরা উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছেন; যা এলাকার সাধারণ মানুষ ‘নির্যাতন’ হিসাবে দেখছেন। এসব ‘নির্যাতনকারী’ এমপিকে পুনরায় মনোনয়ন দেয়া হলে মানুষ তাদের প্রতিরোধ করবে এবং নির্বাচনে এর শতভাগ প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। প্রসঙ্গত, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে বিএনপির ৮১ জন, জামায়াতের ২০ জন, জাতীয় পার্টি (জাপা) ও জেপিসহ অন্যান্য দলের উপজেলা চেয়ারম্যান রয়েছেন ৩৩ জন। এদিকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের অপর একটি অংশের নেতারা গতকাল রাজধানীতে এক সেমিনারে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে বর্তমান এমপিদের পরাভূত করতে উপজেলা চেয়ারম্যানরা সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবেন। অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শফিকুল আলম বলেন, চার সিটি নির্বাচনের চেয়েও শোচনীয় পরাজয় ঘটবে আসন্ন এমপি নির্বাচনে। তিনি বলেন, যেসব আসনে এমপিরা উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোণঠাসা করে রেখেছেন, তাদের জনগণ ক্ষমা করবে না। নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের যারা পদে পদে হয়রানি করছেন, সেই হয়রানির সমুচিত জবাব ভোটারদের কাছ থেকে তারা পাবেনই। বরগুনার আমতলী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, সারাদেশে উপজেলা চেয়ারম্যানদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতিবাজ বহু এমপিকে সাধারণ ভোটাররা এখন বিদায় জানানোর জন্য ক্ষণ গুনছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।