জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে রহস্য
প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৩, ২২:৫৭
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এখন আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম। গত চারদিন ধরে তার হদিস না মেলার বিষয়টি নির্বাচনি মাঠে সাধারণ ভোটার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে রহস্যের সৃষ্টি করেছে। সর্বত্র একই প্রশ্ন-জাহাঙ্গীর কোথায়?
১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের সমর্থনে জাহাঙ্গীর ‘স্বেচ্ছায়’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমন প্রচারণা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর নিজে কিছু বলেননি। তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় কর্মী-সমর্থকদের একাংশ এখনও জাহাঙ্গীরের ‘আনারস’ প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন। ফলে জাহাঙ্গীর নির্বাচনি লড়াইয়ে আছেন কী নেই, এনিয়ে রীতিমত ধোঁয়াসা সৃষ্টি হয়েছে।
তবে তিনি রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকাল রাতে হাসপাতালে তাকে দেখতে যান আওয়ামী লীগ নেতা ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ মির্জা আজম। ওবায়দুল কাদের একটি বার্তা সংস্থাকে জানান, জাহাঙ্গীর রবিবার এলাকায় যাবেন এবং সোমবার থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামবেন।
গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এমপি গতকাল বলেছেন, ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে নয়, জাহাঙ্গীর আলম স্বেচ্ছায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। জাহাঙ্গীর বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন, তার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। আজ রবিবার তিনি গাজীপুরে উপস্থিত থেকে আমার সঙ্গে আজমত উল্লাহর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেবেন। আর এর মধ্য দিয়ে সকল বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে।’
প্রসঙ্গত, আগামী ৬ জুলাই অনুষ্ঠেয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজমত উল্লাহ খান। তার প্রতীক ‘দোয়াত-কলম’। আর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন প্রথমে তার প্রার্থিতা বাতিল করলেও পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান, এরপর তিনি ‘আনারস’ প্রতীক বরাদ্দ পান।
গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট-এই চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে পরাজয়ের কারণে গাজীপুরের নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল। দল ও সরকারের ইমেজ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জয় চায় আওয়ামী লীগ। এ কারণে নির্বাচনি মাঠে দল ও জোট সমর্থিত একক প্রার্থী রাখার জন্য জাহাঙ্গীর আলমকে গত মঙ্গলবার ডেকে নিয়ে কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে জাহাঙ্গীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। এমনকি এলাকায় ফিরে আজমত উল্লাহর সমর্থনে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন বলেও জাহাঙ্গীর প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিয়েছেন।
তবে মঙ্গলবার রাতের পর থেকে জাহাঙ্গীরকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়েও তিনি নিজ কর্মী-সমর্থক ও মিডিয়াকে কিছু জানাননি। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। গাজীপুর সদরে ও গ্রামের বাড়িতেও তিনি নেই। তার এই রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আদালতের নির্দেশে ‘আনারস’ প্রতীক পান জাহাঙ্গীর আলম। গাজীপুর পৌর আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, প্রতীক বরাদ্দের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাহাঙ্গীরের বেশকিছু পোস্টার লাগানো হয়। তার নেতা-কর্মীরা প্রচারণায় নামেন। প্রচারণা চালাতে চালাতে সন্ধ্যায় তিনি যান টঙ্গী দলীয় কার্যালয়ে। কিছু সময় পর ঢাকা থেকে একটি গাড়িতে কয়েকজন সঙ্গীসহ সেখানে এসে পৌঁছান ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি লিয়াকত শিকদার। কিছুক্ষণ তারা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর জাহাঙ্গীর নিজের গাড়ি রেখে লিয়াকত সিকদারের সঙ্গে তার গাড়িতে করেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাতে সংসদ ভবনে তার সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে আজমত উল্লাহ খানকে জয়ী করে আনার জন্য কাজ করতে বলেন। এরপর রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ থাকেন জাহাঙ্গীর।
শহর ও গ্রামের বাড়িতে ভিড়
গাজীপুর শহরের বাসনসড়ক এলাকায় জাহাঙ্গীরের একটি ভাড়া বাসা রয়েছে। গত ক’দিন ধরেই সেখানে শত শত নেতা-কর্মীর ভিড় দেখা যাচ্ছে। তার গাড়িটিও পড়ে আছে গ্যারেজে। গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার কানাইয়াতেও একই দৃশ্য। জাহাঙ্গীর না থাকলেও তার কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, তার নির্বাচন করার ইচ্ছা রয়েছে। যেহেতু ব্যালটে তার ‘আনারস’ প্রতীকও থাকবে, তাই তারা তার পক্ষে কাজ করছেন, মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজন ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আজিজুল ইসলাম জানান, যেহেতু জাহাঙ্গীর নিজে তাদের কিছু জানাননি, এ কারণে তারা মনে করছেন তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এখনও রয়েছেন।