উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো এখন উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলেছে আফ্রিকা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি এসবের নাম অনেকটাই ঘুচিয়ে বর্তমানে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাফল্যের সাক্ষর রাখছে। এক সময়ে আফ্রিকার নাম শুনলেই যেমন ভেসে উঠতো কিছু কংকালসার মানুষের মুখ; সেই অধ্যায়কে পিছনে ফেলে এখন তারা অনেকটা সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখেছে। অন্তত সামপ্রতিক সময়ে আফ্রিকার অর্থনেতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে তেমনই চিত্র ফুটে উঠে। তবে প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলেও এই উন্নয়নের সুবিধা প্রকৃতপক্ষে কারা ভোগ করছে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে আফ্রিকার অগ্রগতি আশাব্যাঞ্জক হলেও এটি তাদের জীবনযাত্রার মানকে কতটুকু প্রভাবিত করছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকার এই চলমান উন্নতি বিশ্বের অনেক দেশের উন্নয়নকে ছাপিয়ে যাবে। কিন্তু এতে করে সাধারণ মানুষের ভাগ্য কতখানি ফিরবে তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এই মহাদেশটিকে এখন বিশ্বের অনেক দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধশালী দেশের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের মতে, এখানকার কিছু কিছু দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার সত্যিকার অর্থেই তাদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করছে। বিশেষ করে সিয়েরালিওন, ঘানা, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া ও মোজাম্বিকের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, ইউরোপের মধ্যে যেমন গ্রিস, স্পেন প্রভৃতি দেশে বেকারত্মের হার ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে আফ্রিকার অর্থনৈতিক দিক থেকে উঠে আসা সত্যিকার অর্থেই একটা বড় ব্যাপার। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব ব্যাংক বলছে ,আফ্রিকার মধ্যে ওই পাঁচটি দেশের অর্থনৈতিক দিক থেকে একটা ভালো অবস্থানে চলে আসা প্রকৃতপক্ষেই প্রশংসার দাবিদার। বর্তমান এ অবস্থার কারণে সেখানে একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছে। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এএফডিবি) প্রধান অর্থনীতিবিদ মিথুলি কিউবে বলেন, উন্নয়নের এই গতিধারা সত্যিই পাল্টে দিয়েছে আফ্রিকাকে, যাকে কোনভাবেই থামানো অসম্ভব। অর্থনীতিবিদ জেফারি স্যাকস বলেন, এখানে মানুষের মাঝে যে হারে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়ছে, তাতে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে তারই জানান দিচ্ছে। ইন্টারনেটের ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তারা এখন একটু স্বচ্ছল, একটু উন্নত জীবনের দিকে বেশি ধাবিত হচেছ। আর এ থেকেই বলা হচ্ছে, তারা উন্নয়নের সিঁড়িতে পা রেখেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্যাবলেট কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার বেড়েছে। এটিও তাদের উন্নয়নকে নির্দেশায়িত করছে। এই মহাদেশের সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়া; সেখানেও ৭০ ভাগেরও বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তাই মোবাইল বা স্মার্টফোনের ব্যবহার তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার যে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে তাই-ই বলে দিচ্ছে। এছাড়া তাদের বাড়ছে ক্রয়ক্ষমতা, সম্প্রসারন হচ্ছে পণ্যের বাজার। সেইসঙ্গে বাড়ছে নব্য বিলিওনিয়ারের সংখ্যা। কেনিয়াতেও মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে। সেখানে গড়ে উঠেছে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা ধরণের ব্যবসা। বিক্রি হচ্ছে মোবাইলের বিভিন্ন সফটওয়্যার। বাড়তি সুবিধা হিসাবে দরিদ্র কৃষকেরা মোবাইলে এসএমএসে প্রতিদিন পেয়ে যাচ্ছেন নানা তথ্য। এতে করে কৃষিকাজে আগাম তথ্য পাওয়ায় তারা উত্পাদনমুখী কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারছেন। একই চিত্র ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোরও। লন্ডনে আফ্রিকার বিজনেস ম্যাগাজিনের প্রকাশক কেনিয়ার নাগরিক আনভার ভার্সি বলেন, আগামী ৫০ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে আফ্রিকায়। কেননা এখানে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তেমন রয়েছে লোকবল। তাই এই বিবেচনায় আফ্রিকার সামনের চলার পথ মসৃণ। বিনিয়োগের জন্য আফ্রিকাই হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। হাফিংটন পোস্টের কলাম লেখক ওবাদিস দাবা বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে আফ্রিকা। তারা অচিরেই দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছে। ইকোনোমিস্টে বলা হয়েছে, আফ্রিকা এখন দ্রততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ। বিনিয়োগের স্থান হিসাবে এ মহাদেশটিতে রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা। টাইম ম্যাগাজিনে ‘আফ্রিকা রাইজিং’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, এটি বিশ্বের পরবর্তী অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে। সেইসঙ্গে সামনে তাদের অনেক চ্যালেঞ্জ। সেটি মোকাবিলা করেই এগুতে হবে। ম্যাককিনসকি গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ান ব্যাঘ্রদের পর এখন আফ্রিকান সিংহদের পালা। ফোর্বস ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, আফ্রিকা দ্রুত উঠে আসছে। বিবিসির প্রতিবেদক আলেক্সিস অ্যাকওয়াগিরাম বলেছেন, অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আফ্রিকার উত্থান ঘটলেও এর সুফল কাদের ভাগ্যে জুটবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে এটি যদি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে আফ্রিকা হবে উজ্বল সম্ভাবনার দ্বার।