যে কারণে কাতারে অফিস খুলেছে তালেবান
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৩, ২০:৩২
আফগানিস্তানে দীর্ঘ ১২ বছর রক্তপাতের পর তালেবানের সঙ্গে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবান ও কারজাই সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দোহায় তালেবানের অফিস খোলার পদ্ধতিতে মারত্বক ক্ষুব্ধ কারজাই সরকার প্রতিনিধি না পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এর আগে শর্ত সাপেক্ষে তালেবানকে দোহায় অফিস খোলার অনুমতি দেন আফগানিস্তান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। আমেরিকাসহ অন্য পশ্চিমা দেশগুলোও তালেবানের এই অফিসের ব্যাপারে কোন আপত্তি তুলেনি। কেন তালেবান অফিস চালুর জন্য কাতারকে বেছে নিয়েছে এবং কেন আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো এই বিষয়ে সম্মতি দিচ্ছে?
গত কয়েক বছর ধরেই আফগান সরকার এবং তাদের বন্ধু পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছে। কিন্তু তালেবানের কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছিল না। আস্থা প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে, শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণকারী নেতাদের সুরক্ষা প্রদান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান হাই পিস কাউন্সিলের সুপারিশে তালেবানের জন্য একটি চিরস্থায়ী ঠিকানা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। সেই জন্য একটি অফিস খোলার বিষয়টি আসে।
তালেবান কাতারকে ভেন্যু হিসেবে পছন্দ করার কারণ হলো তারা একে একটি নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে বিবেচনা করে। তারা মনে করে কাতার হলো এমন একটি দেশ যেটি সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ভারসাম্য রক্ষা করে। ইসলামি বিশ্বেও কাতারের অবস্থান বেশ মর্যাদাকর। কাতারকে পছন্দ করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও খুশি। দেশটির সঙ্গে মার্কিন সরকারেরও সুসর্ম্পক রয়েছে। কাতারে তালেবানের অফিস খোলার পর সারাবিশ্বের নজরে এখন কাতারের দিকে।
কাতারে অফিস চালুর আগে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই তালেবানের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা নিয়েছেন যে সেখানে সংক্ষিপ্ত আকারে কর্মকাণ্ড চলবে এবং এটি শুধু শান্তি আলোচনার স্থান হিসেবে ব্যবহার হবে। কারজাই চান না সারাবিশ্বে তালেবানের বিস্তার, নিয়োগ ও তহবিল গঠনের মতো কাজে এটি ব্যবহার হোক। আফগানিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত তালেবানদের দোহায় অফিস চালুর বিষয়টি শান্তি প্রক্রিয়ারই অংশ ছিলো। কিন্তু তাদের কার্যালয়ের ধরণ তালেবান সরকারের বিদেশি কার্যালয়ের মতো হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে কারজাই সরকার।
ইতিমধ্যেই দোহা অফিসে উত্তোলন করা তালেবানদের একটি পতাকা নামিয়েও ফেলা হয়েছে। এছাড়া অফিসের বাইরে ‘পলিটিকাল অফিস অব ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান’ লেখা একটি নামফলকও খুলে ফেলা হয়েছে।
অফিস খুলে শান্তি আলোচনা হলে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও কাতারের অনেক লাভ। তালেবানের সঙ্গে সন্ধি করে সার্জেন্ট বোয়ে বারগধালের মুক্তি চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে মার্কিন এই সেনা ২০০৯ সাল থেকে তালেবানের হাতে বন্দী। বারগধালের বিনিময়ে গুয়েনতানামো বে কারাগারে বন্দী শীর্ষ পাঁচ নেতার মুক্তি চেয়েছিল তালেবান। এছাড়া ধীরে ধীরে পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সারাবিশ্বে নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে চায় তালেবান। পাকিস্তান সরকারও চাইছে বিশ্বকে দেখাতে তালেবানের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আফগান সরকার চাইছে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি দূরত্ব তৈরি হোক এবং তালেবানদের পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার না করে শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে দিক। কাতার সরকার চাইছে আফগানিস্তানে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে তালেবান শাসনামলে কাতার সেই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। যেটি করেছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ওই সরকারের পতনের পরও নেতাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি কাতার।
তবে এখন কাতারে তালেবান প্রতিনিধি ও তাদের কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমানে কাতারে ২০ জনেরও বেশি জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতা সপরিবারে বসবাস করছে। দোহায় তালেবান অফিসের প্রধান হলেন মোহাম্মদ তায়েব আঘা। তিনি কাতারে প্রভাবশালী তালেবান প্রতিনিধি। তালেবান নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তিনি বেশ সম্মানিত। কাতারের অন্য প্রভাবশালী নেতারা হলেন, মৌলভী শাহাবুদ্দিন দেলওয়ার, যিনি সৌদি আরবে তালেবান দূত ছিলেন। কাতারে তালেবান অফিসের প্রধান মুখপাত্র মোহাম্মদ নায়েম। ক্বারী দীন মোহাম্মদ হানিফ সাবেক তালেবান সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। শির মোহাম্মদ আব্বাস স্টানাকজাই ছিলেন তালেবান সরকারের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আফগানিস্তান নিয়ে আলোচনার জন্য গত দু’বছর ধরে তালেবান কাতার থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে জাপান, ফ্রান্স ও জার্মানিতে। ইরানে একটি প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে তালেবান। কাতারের বাইরে আফগানিস্তান সরকার তুরস্ক ও সৌদি আরবেও তালেবানের জন্যও অফিস খুলতে চাইছে।