সংসদের ভাষা নিয়ে সাংসদদের উপযুক্ত ট্রেনিং আছে কি?
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৩, ২১:১৬
পৃথিবীর যে কোন দেশে সংসদকে বলা হয় মহান জাতীয় সংসদ। বাংলাদেশের সংসদও মহান জাতীয় সংসদ এমনটাই স্থির হয়ে আছে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে। সেই মহান সংসদে যাদের পদচারণা ঘটে তারা এদেশের মাননীয় সংসদ সদস্য। এদের মধ্যে অধিকাংশই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে জয়ী হন এবং অল্প সংখ্যক মহিলা সংসদ সদস্য দলের নির্বাচনে নিযুক্ত হন। তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির বদৌলতে আমরা এখন বাংলাদেশের মহান সংসদের কার্যপ্রণালীই শুধু দেখতে পাই না বরং পৃথিবীর অনেক দেশের সংসদের ভিতরের চিত্রও আমাদের চোখের সামনে সমুজ্জ্বল থাকে। একবার দেখেছিলাম ইরানের সংসদে দুই সংসদ সদস্যকে মারামারি করতে। ভারতের সংসদের হট্টগোলও দেখেছি কয়েকবার। কিন্তু তার কোনটাই ছাপিয়ে যেতে পারেনি বাংলাদেশের বর্তমান সংসদকে। সংসদে যখন বিরোধী দল উপস্থিত না থাকে তখন অবশ্য সংসদটি থাকে শান্ত পানির স্রোতধারা বহনকারী নদীর মত। কিন্তু বিরোধী দলের আগমনের সাথে সাথেই সেই নদী হয়ে ওঠে মহাসমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের গর্জনের কাছে ম্লান হয়ে ওঠে সংসদের রীতিনীতি এবং সৌন্দর্য। শালীনতা, ভদ্রতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংসদের ভাষা সবকিছু যেন গৌণ হয়ে পড়ে মাত্র কয়েকজন মারমুখী সংসদ সদস্যের অশালীন ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে। এই সংসদের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের কয়েকজন প্রখ্যাত সংসদ সদস্যের বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের জ্ঞান বৃদ্ধি করার স্বার্থে আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং তারা এসেছিলেনও। এছাড়া অনেক সংসদ সদস্যই বিদেশে গিয়েছেন, সেখানকার সংসদের কার্যকলাপ সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের স্বার্থে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশে বিশেষ করে আওয়ামী লীগে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য আছেন যাদের সংসদের অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের জন্ম থেকে। তবে এ কথাও ঠিক যে, এবারের সংসদে বিশেষ করে অনির্বাচিত মহিলা সংসদ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই অভিজ্ঞতাহীন তরুণ সংসদ সদস্য আছেন। তাদের অনেকে শুধু সংসদেই প্রথম আসেননি বরং রাজনীতিতেও হয়তো গত নির্বাচনের সময় প্রথম এসেছেন। এদের জন্য সংসদ বুঝা, সংসদের কার্যপ্রণালী বুঝা এবং সর্বোপরি সংসদের ভাষা বুঝা কঠিন হতে পারে। আর সেজন্যই হয়তো এবারের সংসদে বিতর্কিত ভাষা ব্যবহূত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু এবারের সংসদে যাদের অশালীন বক্তব্যে অসংসদীয় ভাষার ছড়াছড়ি ছিল তারা কিন্তু সকলেই বেশ শিক্ষিত। কেউ অধ্যাপিকা, কেউ আইনজীবী ইত্যাদি ইত্যাদি। সংসদে মহিলা সংসদ সদস্যগণই কটু কথা অথবা অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগে অগ্রণী থেকেছেন সব সময়। এর একটি কারণ হতে পারে যে, তাদের চোখের সামনে তারা দেখতে পাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় বিরোধী নেত্রী, মাননীয় স্পিকার সকলেই তাদের মত মহিলা। তাই কণ্ঠে হয়তোবা বেশি জোর আসতে পারে। আবার এটাও হতে পারে যে, তাদের অনেকেরই তেমন কোন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নেই। তাই একবার যখন সংসদে আসতে পেরেছেন আবার কবে আসতে পারেন, তাই যত কঠিনভাবে বলা যায় কথাগুলো তারা বলে নিচ্ছেন। কিন্তু সেই কঠিনভাবে বলতে গিয়ে তারা যার বিরুদ্ধে বলছেন তার ক্ষতি করছেন না বরং ক্ষতি হচ্ছে এই মহান সংসদের, ক্ষতি হচ্ছে সংসদীয় রীতিনীতির, ক্ষতি হচ্ছে বক্তার নিজের।
আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতাবান সংসদ সদস্যগণ। কিন্তু বাস্তবে তাদের ভোটারদের জন্য এর বাইরেও অনেক কিছু করতে হয়। পারিবারিক ও সামাজিক ঝগড়া-ঝাটি থেকে শুরু করে কর্মীদের মধ্যে মারামারি, চুরি-ডাকাতিতে পুলিশের হস্তক্ষেপ, গম-আটা-বই বিতরণ, রাস্তাঘাটের মেরামত কোন কিছুতেই তাদের না গিয়ে উপায় নেই। একজন সংসদ সদস্য যতক্ষণ সংসদে থাকেন তখন তার কাজটি থাকে আইন প্রণয়ন করা; আবার ঐ সংসদ সদস্য যখন তার নির্বাচনী এলাকায় থাকেন তখন তার কাজ হয় পরে স্থানীয় বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করা। কিন্তু সংসদে আমরা যা দেখি তাতে অনেক সংসদ সদস্যই কিন্তু আইন প্রণয়ন নিয়ে তেমন কোন মাথা ঘামান না। আর তা করারই বা সুযোগ কোথায়! দল এবং দলের নেত্রী গবেষণা করে নেন সকলের পক্ষ থেকে এবং সংসদে তাদের কাজ শুধু হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ বলা। কোনভাবেই ‘না’ বলার কোন সাংবিধানিক অধিকার কোন সংসদ সদস্যের নেই এবং তা নিশ্চিত করেছে সংবিধানের ৭০ ধারা।
তবে নিয়ম-নীতির সুযোগ থাকুক আর না থাকুক, কিছু অনির্বাচিত মহিলা সংসদ সদস্য সংসদে বিতর্কিত তথ্য এবং কথা বলেই যাচ্ছেন। এই বলার শেষ কবে? সম্মান রেখেই বলতে পারি, বিরোধী দলের এবং সরকারি দলের মহিলা সংসদ সদস্য মহান সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা শুধু অসংসদীয়ই নয়, অশোভনও বটে।
পাঠক নিশ্চয়ই একমত হবেন, গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমাদের আইনপ্রণেতারা যে ভাষায় কথা বলেছেন তা ছিল নোংরা, অশোভন, রুচিহীন এবং অসংসদীয়। এই অশ্লীলতার প্রতিযোগিতায় সাক্ষী হয়ে থাকলো এদেশের মহান সংসদ, বর্তমান সময়ের সকল সংসদ সদস্য এবং টেলিভিশনের কোটি দর্শক-শ্রোতা। আমরা নিশ্চয়ই সংসদে এমন আলোচনা করতে এইসব সংসদ সদস্যদের পাঠাইনি। আমরা খালেদা জিয়ার জন্মকাহিনী জানতে চাইনি, আমরা প্রধানমন্ত্রীর ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য শুনতে চাইনি। মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে কোনো সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে ‘মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্রপতি’ বলবেন এমনটা নিশ্চয়ই আশা করিনি। কোন সংসদ সদস্য কখন কার কোলে বসেছিলেন এমন ধরনের অশ্লীল বক্তব্য সংসদের মধ্যে আলোচনা করা যাবে এমন একটি জাতীয় সংসদ নিশ্চয়ই আমরা চাইনি। কিন্তু এতসব অশোভন বক্তব্য সেই মহান সংসদে বলা হচ্ছে যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেত্রী এবং স্পীকার উপস্থিত আছেন। নিজ দলের সংসদ সদস্যদের প্রলাপ-ভাষণের প্রতি কি দলনেত্রীর কোনই দায়িত্ব নেই? এদের এমন অশোভন বক্তব্য বন্ধ করার জন্য অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের কি কোনই দায়িত্ব নেই? তবে কি কিছু কিছু সংসদ সদস্যের সেই ধরনের কোনো স্কুলে পাঠাতে হবে যে স্কুলে সংসদের রীতিনীতি এবং শোভন-অশোভন বক্তব্যের উপর হাতে-কলমে ট্রেনিং দিবে?
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা