স্মরণ
আখতার-উল-আলম :জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এক সমন্বিত পুরুষ
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৩, ২২:২৩
সর্বজন গ্রাহ্য সংজ্ঞা অনুযায়ী জ্ঞান হচ্ছে বিবেচিত আত্মিক বিশ্বাস। যথার্থ বিশ্বাস ব্যতীত প্রকৃত জ্ঞান অর্জন হতে পারে না। বস্তুত ‘যাহাই সত্য তাহাই জ্ঞান’। সুতরাং জ্ঞান ও বিশ্বাসের সাথে সত্যের একটি অনিবার্য সম্পর্ক রয়েছে। জ্ঞানের উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে সত্যের স্বরূপ সন্ধান। স্বাভাবিক ভাবেই সত্য অনুসন্ধিত্সু বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের সাথে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কার্যক্রম বিবেচিত হবে। জ্ঞান জগতের প্রাজ্ঞ পুরুষ প্লেটো, দেকার্তে, লক, হিউম অবশেষে ইম্যানুয়েল কান্ট জ্ঞানের সাথে বিশ্বাসের বিবিধ সম্পর্ক নির্ণয় করেছেন। ইউরোপীয় রেঁনেসা উত্থিত উদারনীতিক ও মানবিক যে জ্ঞানধারা পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে আলোকিত অধ্যায়-এর সূচনা করেছিল তা এক সময়ে প্রাচ্যকেও আলোকিত করেছিল। প্রাচ্যবাদ এর প্রকাশ বিকাশও প্রতিষ্ঠা এর সাক্ষ্য বহন করে। আমাদের এই দেশ ও সমাজের রেঁনেসা সূচিত হয় সে নবযাত্রায় ‘টাওয়ার বাংলার’ মানুষেরা সমৃদ্ধি অর্জন করলেও ‘খামার বাংলার’ মানুষেরা সেই সমৃদ্ধি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এই সব ‘মূঢ় ম্লান মুখে যারা দিয়েছেন ভাষা ধ্বনিয়ে তুলেছেন আশা’ আখতার-উল-আলম সম্ভবত সে ধারার এক সমন্বিত পুরুষ। চিরায়ত লালিত বিশ্বাস জীবনবোধ প্লাবিত এক আলেকিত মানুষ তিনি। তাঁর রচনা ও কর্মধারায় জ্ঞান ও বিশ্বাসের সমন্বিত রূপ প্রতিফলিত।
জ্ঞানের প্রতি আকাঙ্ক্ষা সতত মানুষের সহজাত। সেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকেই জ্ঞানদিপ্ত পুরুষ মরহুম আখতার-উল-আলমের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। যারা জ্ঞানচারক তারা জানেন আমাদের জ্ঞান ও চেতনার জগতে দৈনিক ইত্তেফাক একটি বিশিষ্ট নাম। ইত্তেফাক তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সমৃদ্ধ ও প্রসিদ্ধ সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার জন্য। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাতে গড়া ‘ভিমরুল’ আহমেদুর রহমানের যেমন অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে তেমনি সিরাজউদ্দিন হোসেন, খোন্দকার আব্দুল হামিদ এবং আখতার-উল-আলমের লেখাও অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। ‘লুব্ধক’ নামে উপসম্পাদকীয় পড়ার জন্য বিজ্ঞজনের বিশেষ আগ্রহ ছিল। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে আমাদের কাছেও লুব্ধকের লেখাও বেশ জ্ঞানগর্ভ ছিল। এ লেখায় তত্ত্ব তথ্য উদাহরণ উেপ্রক্ষা ছিল। আমি নিয়মিত একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হই আখতার-উল-আলমের। বন্ধুদের কাছে তাঁর প্রশংসা শুনি। আমি দিন গুনে গুনে রাখতাম ‘কবে লুব্ধকে লিখছেন’ আমি তাঁর লেখাগুলো কেটে কেটে রাখতাম। আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং বিসিএস-এর মত অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাঁর লেখনি বেশ কাজে আসতো। আমি তাঁর এতই ভক্তে পরিণত হই যে তাঁর সাথে পরিচিত হওয়ার উদগ্র বাসনায় একদিন ইত্তেফাকে গিয়ে হাজির হই।
পাশ্চাত্যের রেনেসাঁর ধারা প্রাচ্যকেও আলোকিত করে আলোড়িত করে। ঔপনিবেশিক যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট জনগণের জাতীয় মুক্তির জন্য তিনি শিক্ষা জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি তাঁর সাধনা দ্বারা প্রমাণ করতে চেয়েছেন আমাদের জ্ঞানের অনুসৃত আচার আচরণ, শিক্ষা সংস্কৃতি বিশেষত লালিত জ্ঞান বিশ্বাস অগ্রবর্তীর জ্ঞান অগ্রজাতির প্রতিবন্ধক নয় বরং পরিপূরক। জ্ঞান দিয়ে যুক্তি, মেধা দিয়ে উদারনৈতিক মনোভব ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তিনি তাঁর বিশ্বাসের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছেন। মরিস বুকাইলির ‘বাইবেল কুরআন বিজ্ঞান’ গ্রন্থ অনুবাদে তাই প্রতিভাত হয়েছে। ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি যখন আমাদের জাতিসত্তার উত্স ভূমিতে আঘাতহানে অথবা কোন কৃত্রিম দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আচ্ছন্ন করে তখন তিনি বাংলাদেশ জাতিসত্তার সন্ধানে নিজেকে ব্যাপৃত করেন। আমাদের অর্জিত অথবা আরোপিত জ্ঞান যেন আমাদের বিশ্বাসকে ভঙ্গুর না করে দেয় সে জন্য চেষ্টিত ছিলেন। তিনি অবশ্যই গোড়া গতানুগতিক অথবা মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী ছিলেন। তিনি আধ্যাত্মিক মনোজগতকে ব্যাখ্যা করেছেন অনেকটা সুফিবাদের আলোকে আর জাগতিক বিচার্য বিষয়কে ধারণ করেছেন বাস্তব উদার এবং প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাঁর জীবনধারা তাঁর রচনাবলী রপ্ত করলে দেখতে পাওয়া যায় তিনি চরম ডান এবং চরম বাম এর মধ্যবর্তী পথ অনুসরণ এবং অনুশীলন করেছেন। জ্ঞান ও বিশ্বাস এক এবং অভিন্ন উদ্দেশ্য অভিসারী। বিশ্বাস বা জীবনবোধ ক্রমাগত অনুসৃত আদর্শের নির্যাস। জ্ঞান ও বিশ্বাসের প্রতিভূ মরহুম আখতার-উল-আলম গোটা জীবন দিয়ে তাঁর লেখা আর কাজকর্মের মাধ্যমে জ্ঞান ও বিশ্বাসের সমন্বয় সাধন করেছেন। তিনি মনে করতেন জ্ঞানার্জন বিশ্বাসেরই বিকল্প রূপ। জ্ঞান কেবলমাত্র সত্যকেই প্রকাশ করে। সময় ও সমাজের প্রেক্ষিতে যুক্তি আর বুদ্ধির মানদণ্ডে ন্যায়সঙ্গত ভাবে সত্যকে প্রকাশ করাই তার দায়িত্ব। নির্ভয়ে নীরবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। নিভৃতচারী এই মানুষটি জ্ঞান ও মনীষার যে আকর আমাদের কাছে উপস্থাপিত করেছেন তার লালন সংগঠন এবং সংরক্ষণ আমাদেরই দায়িত্ব। আখতার-উল-আলমের রচনাবলী সংগ্রহ সম্পাদনা এবং প্রকাশনা আমাদেরই দায়িত্ব— যারা তাঁর জ্ঞান ও বিশ্বাসকে ধারণ করি। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাভ-লোকসান বা রাজনৈতিক সমীকরণের সাথে তাঁকে ছোট বা বড় করতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের কোটি কোটি বিশ্বাসী মানুষের হূদয় তাঁর জ্ঞানালোক উজ্জ্বল ধ্রুবতারার মত দেদীপ্যমান।
লেখক: প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল-abdullatifmasumju@gmail.com