বর্ণাঢ্য আয়োজনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৩, ২২:৫৬
বর্ণাঢ্য আয়োজন, উত্সবমুখর পরিবেশে রাজধানীসহ সারাদেশে গতকাল রবিবার পালিত হয়েছে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সকাল ৭টা ১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, প্রতিমন্ত্রীগণ এবং দলীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এ সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে সূর্য উদয় ক্ষণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘শিখা চিরন্তন ’ থেকে বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মহানগর আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় যুবলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ দিবসটি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে।
এছাড়াও যুবলীগ মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগ, তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগ, ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, মত্স্যজীবী লীগ, যুব শ্রমিক লীগ, হকার্স লীগ, তাঁতী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, মোটর চালক লীগ, ওলামা লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও আশেপাশের এলাকা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক ও এর আশেপাশের এলাকা। এ সময় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে উপস্থিত হাজার হাজার নারী-পুরুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে ‘শুভ শুভ শুভ দিন, আওয়ামী লীগের জন্মদিন’ ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জামায়াত শিবির রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই, দিতে হবে’, ‘মুজিবের বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই’। এসব শ্লোগানে এলাকার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।
শোভাযাত্রায় জনজোয়ার : রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর দীর্ঘ প্রায় চার কিলোমিটার পথই যেন পরিণত হয়েছিল একটি মিছিলে। জন্মদিনে গতকাল মানুষের স্রোত নামিয়ে রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউন করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। চার সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর কিছুটা হতাশ হয়ে যাওয়া লাখো নেতাকর্মী দলটির জন্মদিনের গণশোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে আগামী নির্বাচনের আগেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। দীর্ঘ এ সড়ক জুড়েই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির বর্ণাঢ্য এ গণশোভাযাত্রা থেকে বিএনপি-জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
বাদ্য-বাজনার তালে তালে হাতি-ঘোড়া সহকারে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার বিশাল বিশাল ছবি আর জাতীয় পতাকা নিয়ে দৃষ্টিনন্দন এই গণশোভাযাত্রায় জাতীয় নেতাদের কণ্ঠে ছিল একই শপথ- ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় রাজাকারদের ঠাঁই নাই। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার হয়েছে, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কোন ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত তা রুখতে পারবে না। একাত্তরের ঘাতকদের কোন ক্ষমা নেই।’
রাজধানীর চতুর্দিক অসংখ্য মিছিলের স্রোত নামে। বিকাল পাঁচটায় গণশোভাযাত্রা শুরুর আগে একদিকে পল্টন, প্রেসক্লাব, মত্স্যভবন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট হয়ে শাহবাগ-কাঁটাবন পর্যন্ত লোকে-লোকারণ্য হয়ে পড়ে। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে শোভাযাত্রার সামনের অংশ যখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে পৌঁছায়, তখনও পশ্চাত্ভাগ শাহবাগ মোড়ও পার হতে পারেনি। বিকাল পাঁচটায় শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শেষ হতে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা বেজে যায়। বেলা আড়াইটার আগেই মত্স্যভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত পুরো রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হয়। বেলা একটা থেকেই ঢাকা মহানগরীর ৪৬টি থানা, ১০০টি ওয়ার্ড, ১৭টি ইউনিয়ন এবং ১৫টি নির্বাচনী এলাকা থেকে একযোগে গণমিছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাত্রা শুরু করলে কার্যত পুরো ঢাকা যেন কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়। বাদ্য-বাজনার তালে তালে নেচে-গেয়ে হাজার হাজার মিছিল এসে জড়ো হতে থাকে সোহরাওয়ার্দীর সামনে। গণমিছিলে ডামি রাইফেল, কামান, ট্যাঙ্কসহ মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের রণসজ্জা, পাকহানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদর-আল-শামসদের আত্মসমর্পণ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় উল্লাসসহ বিভিন্ন ড্যামি প্রদর্শনী সাধারণ মানুষের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করে। অসংখ্য ট্রাকে মঞ্চ বানিয়ে বাজানো হয় ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, পরিবেশন করা হয় দেশাত্মবোধক গান। সুবিশাল র্যালীর কারণে রাজধানীতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের।