এখনও খোলা আকাশের নিচে বিদ্যালয়

দেশে সমস্যার যে অন্ত নাই এই কথা কাহার না জানা! কিন্তু যখন দেখা যায় যে, এমন কিছু সমস্যা আছে যেগুলির প্রতি সামান্য একটু যত্ন এবং নজর দিলেই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, সেগুলিও কর্তৃপক্ষের অযত্ন ও অবহেলার শিকার হইয়া বত্সরের পর বত্সর ঝুলিয়া থাকে তখন স্বাভাবিকভাবেই হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার না হইয়া পারে কী! নওগাঁর মহাদেবপুর হইতে আমাদের সংবাদদাতা প্রেরিত একটি সচিত্র প্রতিবেদন দৃষ্টে যে কাহারও মনে হতাশা ও বেদনা অনুভূত হইবে। সংবাদদাতা জানাইতেছেন যে, মহাদেবপুরের শালবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির ঝুঁকিপূর্ণ ২টি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় বিদ্যার্থীদেরকে খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করিতে হইতেছে। খবরটির সহিত এ বিষয়ক একটি চিত্রও প্রকাশিত হইয়াছে গত বৃহস্পতিবারের দৈনিক ইত্তেফাকে। শুধু যে মহাদেবপুরের শালবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিরই এই করুণ দশা তাহা কিন্তু নহে। মাঝে-মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে এমন ধারার সচিত্র প্রতিবেদনও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়া থাকে। অর্থাত্ ইহা শুধু মহাদেবপুরের ঐ সংশ্লিষ্ট স্কুলটিরই চিত্র নহে দেশে আরও অনেক বিদ্যায়তনের ভবন পড়ো পড়ো অবস্থার মধ্যে রহিয়াছে। আশ্চর্যজনক বিষয় এই যে, শালবাড়ী বিদ্যালয়টির ভবন দুইটি পাঁচ বত্সর পূর্বে পরিত্যক্ত বলিয়া ঘোষিত হইলেও এই সুদীর্ঘ পাঁচটি বত্সরের মধ্যে কর্তৃপক্ষ ইহার ব্যাপারে কোন প্রকার ব্যবস্থাই গ্রহণ করিতে পারেন নাই বা করেন নাই। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার- ইত্যকার নানান গালভরা বুলি আমরা প্রায়শই দেশের পরিচালকদের মুখ হইতে শুনিতে পাই, কিন্তু কাজের বেলায় দেখিতে পাই কেবলই অবহেলা ও অযত্ন। দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৪২ বত্সর হইল, অথচ, এই সুদীর্ঘ সময়েও কোন ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়িয়াছে বা সময়মতো নড়ে এমন উদাহরণ নাই বলিলেই চলে। ঔপনিবেশিক আমলে বা সেই পাকিস্তান আমলে শোষণ-বঞ্চনার ও বৈষম্যের যখন পরাকাষ্ঠা চলিতেছিল তখন এই ধরনের দৃশ্য মানাইতো, কিন্তু স্বাধীন দেশেতো এই সকল চিত্র বড্ড বেমানান। ইহার মধ্য দিয়া প্রকারান্তরে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের এক ধরনের নির্দয়তা, কর্তব্য কর্মের প্রতি অবহেলা-অযত্ন এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের ব্যাপারে উপেক্ষা ও অনীহার প্রকাশ ঘটে। স্বাধীন দেশের সরকারি কর্মকর্তারা জনকল্যাণের বিষয়টিকে যত্ন, মমত্ব ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে দেখিবেন, মূল্যায়ন করিবেন এবং বিহিত-ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন ইহাইতো কাম্য। কিন্তু তত্পরিবর্তে যখন অবহেলা ও উপেক্ষাই তাহাদের তরফ হইতে দৃশ্যমান হয় তখন জনমনে ক্ষোভ দানা বাঁধিতে বাধ্য। আর সেই ক্ষোভ এক সময় যদি বিস্ফোরণ আকারে ফাটিয়া পড়ে তাহা হইলে নিশ্চয়ই দেশ পরিচালকেরা আর জনগণকে দোষী বা দায়ী হিসাবে গণ্য করিবেন না। মহাদেবপুরের যে বিদ্যায়তনে শিশুরা খোলা আকাশের নিচে পাঠ গ্রহণ করিতেছে তাহাদের শিক্ষানুরাগের প্রতি এই চরম ঔদাসীন্য যে ক্ষমারও অযোগ্য উহা কি কর্তৃপক্ষ কখনও ভাবিয়া দেখিয়াছেন? দেখিলে সমস্যাটির সমাধানের ব্যাপারে তাহারা এতদিনে যত্নবান হইতেন নিশ্চয়ই। দেশে সম্পদ সীমিত সুতরাং ইহা করিলেই সব সমস্যার সমাধান যে সম্ভব নহে উহা অর্বাচীনেও বোঝে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে সম্পদের সীমাবদ্ধতাই যদি এই শিশুদের করুণ হাল দূর না করিতে পারার কারণ হইয়া থাকে তাহা হইলে বেসরকারি পর্যায়ের স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের বিত্তবানদের দ্বারস্থ হইয়া এমন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ লইলেই হয়। শিক্ষা-চিকিত্সা-বাসস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের একার পক্ষে সব সমাধান প্রদান করা সম্ভব নহে এ কথা সত্য এবং এ কারণেই সমাজের বিত্তবানেরা জাতি গঠনের নিমিত্তে এই সব কর্মকাণ্ডে মুক্তহস্ত হইয়া আগাইয়া আসিতে পারেন। কিন্তু মুশকিল এই যে, এই দেশে বিত্তবানের অভাব নাই, অভাব আছে দানবীর এন্ড্রু কার্নেগী বা হাজী মোহাম্মদ মহসীনদের মতো হূদয়বান মানবদরদী মহত্প্রাণ ব্যক্তিত্বের!