রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির
প্রধান অন্তরায়
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৩, ২১:২৭
অর্থমন্ত্রী বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে একমাত্র ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে এ ঝুঁকি অবসানের প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরেছেন। তিনি এ-সংক্রান্ত মূল্যায়নকে সমর্থন করে বলেন, তার প্রণীত পাঁচটি বাজেটই ছিল উচ্চাভিলাষী ও জনতুষ্টিমূলক। বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে তিনি একমাত্র ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
২০১৩-১৪ সালের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে সমালোচকদের পক্ষ থেকে যে উচ্চাভিলাষী ও জনতুষ্টিমূলক অভিধা প্রয়োগ করা হচ্ছে তা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে একটি প্রত্যাশিত বিষয়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিশাল ব্যবধানের এই দেশে এগিয়ে যেতে হলে জোর কদমেই যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষীও হতে হবে। বাজেট প্রণয়নে জনতুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া যে কোনো নির্বাচিত সরকারের কর্তব্যেরই অন্তর্গত। তবে এই উচ্চাভিলাষী ও জনতুষ্টিমূলক বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের পরিবেশ সৃষ্টি করাও সরকারের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থমন্ত্রী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার যে তাগিদ সৃষ্টি করেছেন, তা পূরণ সরকারের অবশ্য করণীয় বলে বিবেচিত হবে, তেমনটিই কাম্য।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা এই উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায়। এ অবস্থা সরকারের বড়ো চ্যালেঞ্জ পদ্মা সেতু নির্মাণকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বলা বাহুল্য, একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত হচ্ছে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিরোধী দলগুলোর একের পর এক হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দেশকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে। সরকার অর্থাত্ ক্ষমতাসীন মহল দেশে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখার পরিবর্তে গোড়া থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার উপর্যুপরি কারণ সৃষ্টি করে চলেছে এমন অভিযোগ অনেকের। তাদের মতে, এ ব্যাপারে দায়দায়িত্ব সরকারের সবচেয়ে বেশি। এদেশের জনগণ যুগপত্ হতাশা ও বিস্ময় নিয়ে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর উন্নতি প্রত্যক্ষ করছেন। এসব দেশ যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করছে তখন বাংলাদেশ প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার কারণে।
সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা একটি সেমিনারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান শত্রু বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান অবকাঠামো, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সঙ্কট এ দেশের উন্নয়নের মূল চ্যালেঞ্জ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গতিশীল ও কর্মোদ্যমী নেতৃত্বের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যাণ্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি উন্নয়নশীল দেশ গত ক’বছরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। পাশ্চাত্যের বৈরী শক্তির প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও ইরান এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির দিকে। শুধুমাত্র দেশে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকায়, বাহ্যিক প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও তারা সমৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হচ্ছে। চমত্কার স্থিতিশীল পরিবেশ সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোকে তেলের উপর নির্ভরতা কাটিয়ে ইতোমধ্যে ব্যবসায় বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে বিপুল সাফল্য অর্জনে সহায়তা করছে। এভাবে কিছু ব্যতিক্রম বাদে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে।
অনেকে এগোনোর চেষ্টা করছে ইতিবাচক পন্থায়। কিন্তু অপরিমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভুল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। আগামী দিনগুলো উজ্জ্বলতর হবে এমন প্রত্যাশা ও স্বপ্নের পরিবর্তে অতীতের সুসময়ের জন্য আফসোস করতে হচ্ছে এ দেশের সাধারণ মানুষকে। হতাশা কুরে কুরে খাচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় এ দেশের অর্থমন্ত্রীকে উচ্চাভিলাষী বাজেট করেও এটা আদৌ বাস্তবায়িত করতে পারবেন কিনা, এ ভাবনায় গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এর দায় মূলত রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের। তাদের ব্যর্থতাই দেশের এ শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী। জনগণ এ পরিস্থিতির অবসান চায়।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্রমহ্রাসমান গতিশীলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়া সম্ভব নয়। কেননা রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বিনিয়োগ, আমদানি ও উত্পাদন কমছে। এসব কারণে বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।
তাই দুই দলের প্রতি আহবান করছি— রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে সংলাপে বসুন।
ঢাকা