ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নাড়িচ্ছেদ

আধিপত্যের ক্ষেত্রে সবসময় একটা সক্রিয় উপাদান থাকে। আধিপত্য বজায় রাখার জন্য কোনো না কোনো উপায় অবলম্বন করতে হয়। সেটা বৈধ হলে তো কথাই নেই আর অবৈধ হলে তাকে বৈধ করার জন্য আধিপত্যবাদ সবসময় কোনো না কোনো নিয়ম বা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জায়গাটিতে সেই আধিপত্য বজায় রাখার ত্বত্তটি হলো (Modest Encroachment) শালীন প্রবেশাধিকার। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যাপ্যারগুলোতে কোনো ক্ষতের সৃষ্টি হলে তা নিবারণ করা বা মেনে নেওয়ার প্রবণতাটা মানব সমাজে তুলনামূলকভাবে কম হলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতের সৃষ্টি হলে তা মেনে নেওয়ার প্রবণতা মানব সমাজে প্রায় শূন্যের কোটায়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে যে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে তা অনেক আগের কথা। বিভিন্ন দেশে এর ঢেউ লেগেছে বিভিন্ন সময়ে। কিছুদিন আগেও ভারতে এরকম ফোন কেলেঙ্কারি নিয়ে আগুনে ঘি ঢেলেছে সে দেশের বিরোধীদল— এ নিয়ে সে দেশে তুলকালাম কম হয়নি। কম যায়নি বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও আন্তজার্তিক যুদ্ধাপরাধ বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে স্কাইপির মাধ্যমে আলাপচারিতা হ্যাক করে তা গণমাধ্যমে প্রকাশের উদাহরণ টানা যায়। যে সংস্কতি একবার শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায় হবে তা জানা নেই কারো। তৃতীয় বিশ্ব, উন্নয়নশীল বিশ্বের কাহিনি পিছনে ফেলে এবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার ধ্বজাধারী দেশ তার নিজের জনগণের এবং সারা বিশ্বের নাগরিকদের ব্যক্তিগত আন্তঃসম্পর্কের নাড়িভুড়ির ব্যবচ্ছেদ করেছে। ইন্টারনেট জায়ান্ট ফেসবুক, গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফটের মতো ব্যক্তিগত তথ্য গুদামে নল ঢুকিয়ে তার অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিতথ্য রস আহরণ করছে ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষাকারী দেশটি। শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয় তার বাইরের অনেক নাগরিকের তথ্য আহরণ করেছে দেশটি। অবশ্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বলে এর বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। এ নিয়ে দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান বারাক ওবামা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান বিবৃতিও দিয়েছেন। তাঁরা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের এ প্রক্রিয়াকে শালীন প্রবেশাধিকার বলে অ্যাখা দিয়েছেন। ২০০৭ সাল থেকেই Prism Surveillance Programe নামের একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও এএফবিআই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চালায়। দেশি-বিদেশি লাখো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য হাত করে দেশটি। বিষয়টি প্রথম জনসমক্ষে আসে সে দেশের একটি আদালত একটি মোবাইল কোম্পানিকে অত্যন্ত গোপনে এই মর্মে নির্দেশ দেয় যে, যেন তারা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করে। আর এই তথ্যটি সামনে নিয়ে আসে ওয়াশিংটন পোস্ট ও ব্রিটেনের দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকা দুটি। প্রিজম প্রোগ্রাম সম্বন্ধে ফুটোর সৃষ্টি করে ২৯ বছর বয়সী সিআইএ-এর সাবেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এডোয়ার্ড স্নডোন। এই মুহূর্তে যিনি আছেন অজানা এক জায়গায়। এডোয়ার্ড স্নডোনের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে পত্রিকা দুটি তার নাম উল্লেখ করে। পত্রিকা দুটি স্নডোনের বরাত দিয়ে আরো বলে যে নয়টি ইন্টারনেট জায়ান্ট থেকে মার্কিন প্রশাসন এই তথ্য সংগ্রহ করেছে— তারা প্রত্যেকেই মার্কিন প্রশাসনকে তাদের নিজস্ব সার্ভারে প্রবেশধিকার দিয়েছে। নয়টি কোম্পানি থেকে মার্কিন প্রশাসন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, অবস্থান, ফোন রেকর্ড, লিখিত বার্তা, ভিডিও বার্তা, ব্যক্তিগত ইমেইল সংগ্রহ করেছে যা ব্যবহারকারী গোপন রাখতো অথবা তার একান্ত প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করতো। যদিও জায়ান্ট কোম্পানিগুলো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে প্রিজম প্রোগ্রাম সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা নেই। কিন্তু ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলছেন কোম্পানিগুলো যদি তাদের সার্ভারে প্রবেশাধিকার না দেয় তবে ক্ষমতাধর এই কোম্পানিগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ মোটেই সহজ নয়। প্রফেসর পিটার সোমার পেশায় একজন ডিজিটাল ফরেনসিক— তিনি বলেন প্রিজম প্রোগ্রাম শুধুমাত্র পিছনের দরজার কোনো কাজ না বরং এটা এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে কোম্পানিগুলোর উদ্দেশ্যই হলো আধিপত্যবাদের প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকেও অন্তর্ভুক্ত করা। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা বা নৈতিকতায় যে ফাটল তা নতুন কিছু নয়। এর আগেও ১৯৭১ সালে পেন্টাগন পেপার, ৭২ সালে ওয়াটারগেট এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে উইকিলিকসের মাধ্যমে অনেক গোপন নথি প্রকাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান প্রিজম কেলেঙ্কারির মতো সারা বিশ্বের জনগণের স্বার্থে আঘাত করার মতো কোনোটাই ছিল না। মার্কিন প্রশাসন নিজেও হ্যাকিং-এর কবলে পড়ে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। নিত্য নতুনভাবে নিত্য নতুন পদ্ধতিতে চীনের হ্যাকারদের দ্বারা মার্কিন বিভিন্ন গোপনীয় তথ্য ভাণ্ডার হ্যাক হচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে চীনা রাষ্ট্রপতিকে এমনই বাণী পৌঁছে দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পথে প্রধান বাধা হলো হ্যাকিং সমস্যা। ঠিক তার কয়েকদিন পর মার্কিন প্রশাসনের এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়ায় যেমন নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন ওবামা, তেমনি সারা বিশ্বে সন্দেহের চর জেগে উঠেছে মানুষের প্রতিমুহূর্তের সঙ্গী গুগল, ফেসবুকের মতো কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। এ চর কবে ডুববে তা কারো জানা নেই। অধিকাংশ মার্কিন মালিকাধীন এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে বিশ্বাসের জায়গায় কোনো ঘাটতি হলে তার বিপরীতে চীন কোনো শক্তি দাঁড় করাতে পারে কিনা তা ভাবার অবকাশ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শুধুমাত্র ব্যক্তিগতই নয়— সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক অনেক নথিপত্রের সিন্ধুক হিসেবে ইন্টারনেটের তরঙ্গ জাল ব্যবহার করা হয়। তার জন্য অপরিহার্য গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তার দাবি এখন সর্বজনীন। আর এই আওয়াজেই প্রকম্পিত হচ্ছে সমগ্র বিশ্ব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়