পাঠক্রমে বিজাতীয় আধিপত্য বন্ধ করতে হবে
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৩, ২১:৩৫
সামাজিকভাবে কলহপ্রবণ মনে হলেও আমরা আসলে একটি উদার জাতি। এই উদারতা আমাদের প্রকৃতি ও জীবন জাত। ভাটি বাংলার মানুষ নিজেদের ভেতর মারামারি-কাটাকাটি করলেও দিন শেষে সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতেই ভালোবাসে। রাজনীতি আমাদের জীবনকে অস্থির করে রেখেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ধম-অধর্ম আর সংস্কারের উপসর্গ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দেশ আর মানুষ দুই-ই উগ্র আর ভয়ংকর। আসলে কি তাই? এই যে উদারতার কথা বললাম তার একটি ছোট্ট অনুষঙ্গ নিয়েই কথা বলব আজ। আমাদের পাঠ্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি রাশেদ খান মেনন একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। তার আদর্শ আমাকে কোনদিনই টানেনি। তার জীবনবোধ বা রাজনীতিকে দূর থেকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও একমত হওয়া কঠিন। বিশেষত দোদুল্যমানতা সমাজতন্ত্রের নামে এক ধরনের সংকীর্ণতা সময় বুঝে আওয়ামী লীগের মত মিশ্র দলের সাথে জোট বাধা সুযোগমত বিএনপির পালে হাওয়া দেয়া সব মিলিয়ে তিনি আমার চোখে সবসময়ই এক বিতর্কিত চরিত্র। কঠিন সমাজতান্ত্রিক নেতার এমপি হবার জন্য নৌকা আরোহণ আমাকে কোনদিনই টানেনি। সেসব তর্ক-বিতর্ক লিখিত আকারে জানাতেও দ্বিধা করিনি কোনদিন।
এই প্রথম আমি কোন বিষয়ে তার সাথে সম্পূর্ণ সহমত হতে পেরেছি। যদিও আমি নিশ্চিত নই তিনি তার বক্তব্যের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক। রাশেদ খান মেনন আমাদের পাঠ্যসূচিতে ভারতীয় বাঙালি লেখকদের সংখ্যাধিক্য কমিয়ে পদ্মাপাড়ের লেখকদের সন্নিবেশিত করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা যৌথ পূর্বাধিকার বাদে বাকিদের ব্যাপারে তার এই মত নিয়ে মতদ্বৈধতার সুযোগ নেই। কিন্তু সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে বিষয়টি আমাদের বিবেকবান কর্মকর্তাদের নজর এড়ালো কিভাবে? বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির অভিন্ন প্রবাহ বা পূর্বাধিকার নিয়ে রাজাকারি মতান্তরের প্রশ্নই ওঠে না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ডি এল রায়, অতুল প্রসাদ বা জীবনানন্দ ও বিষ্ণু দে আমাদের জীবনবোধে সব সময় জেগে আছেন, থাকবেনও। কিন্তু পাঠ্যক্রমের বিষয়টি ভিন্ন। আমাদের সমাজ ভারতীয় বাঙালিদের তুলনায় অনেক সচল ও গতিময়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে চালকের আসনে। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির রাজধানী এখন ঢাকা। ঢাকার নেতৃত্বে বাংলা পৃথিবীর বুকে ডানা মেলছে নিজের পরিচয় বিস্তৃত করছে। অন্যদিকে বাংলা ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। তারা আগে ভারতীয় তারপর বাঙালি, বাংলা ভাষা সংস্কৃতির বিকাশে তাদের অতীত গৌরবমণ্ডিত হলেও ভবিষ্যত্ কুয়াশাচ্ছন্ন। এখন বাংলা বাঙালির দায়িত্ব আমাদের হাতে, ফলে আমাদের অগ্রাধিকার ও ভূমিকাকে সম্মান করাটাই নৈতিক দায়িত্ব। ওপার বাংলা তা করে না। করে না বলতে পারলেও খুশি হতাম। উল্টো এরা আমাদের প্রতি একধরনের অসৌজন্যমূলক মনোভাব প্রকাশে আগ্রহী। যার জন্য দায়ী আমাদের দুর্বল বুদ্ধিবৃত্তি ও বুদ্ধিজীবী বলয়। পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী বা লেখকদের পীর বা গুরুরূপে পূজা করতে অভ্যস্ত আমাদের মেরুদণ্ডের সমস্যা যাব যাব করেও যেতে চায় না। যে কারণে তারাও সমানে ‘দাদাগিরি’ চালিয়ে যেতে পারছেন। এই অসম বাস্তবতা সুস্থতার প্রমাণ বহন করে না। আর সুস্থতাহীন কোন সম্পর্ক চিরস্থায়ী তো নয়ই যত শিগগির সম্ভব পরিত্যাজ্যও বটে। পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যক্রম বা সিলেবাসে আমাদের কোন লেখক আছেন বলে শুনিনি। যত প্রতিভাবান বা অসামান্যই হোক না কেন তাদের পদ্মা পাড়ের মানুষ হিসেবে দূরে রাখাটাই ওদের রেওয়াজ। ওদের যুক্তি হচ্ছে এরা কি আমাদের দেশের লোক? তাদের যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি ভারতীয় বাঙালিরাও কি আমাদের দেশের লোক? কোন দায়িত্ববোধ বা নৈতিকতা থেকে আমরা তাদের ধারণ করি? শুধু ভালোবাসা বা গুণগত মানের প্রশ্ন উঠলেও ব্যাপারটা একতরফা হতে পারে না। অথচ সেটাই হয়ে আসছে। আমরা সমানে তাদের লেখকদের লেখা পাঠ্য বইয়ে রেখে নিজেদের উদারতা ও বোকামি দুটোই প্রকাশ করে আসছি। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও এই বাস্তবতা অগ্রহণযোগ্য। রাশেদ খান মেনন জরুরি এই বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। তাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি এ বিষয়ে সত্যিকারের কোন সমাধান বা উদ্যেগ নিতে এগিয়ে আসবে? আমাদের রাজনীতির বড় দুইদল যে ধারায় চলে বা যে দুটি ধারা লালন করে দুটোই পরনির্ভর। এক দল ভারতের তোষণ অন্যটি পাক তোষণের জন্য সব সময় এক পায়ে খাড়া। আওয়ামী লীগ ভারতের মনোরঞ্জন বা পশ্চিমবঙ্গের মনোতুষ্টি সাধনের পরিবর্তে এ ব্যাপারে যথার্থ ভূমিকা নেবে এমন মনে করা তাই যৌক্তিক ঠেকছে না।
তাই এ ব্যাপারে আমাদের কথিত ভাইব্রেন্ট সুশীল সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশ ও সমাজে উদারতার নামে পরনির্ভরতা আর ওপার বাংলার আধিপত্য কমাতে এর কোন বিকল্প নেই। যে তারুণ্য বা কিশোর-কিশোরীরা আমাদের ভবিষ্যত্ তাদের দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা চেতনায় উদ্বুদ্ব করতে হলে পাঠ্যক্রমে নিজেদের লেখকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অবিভক্ত বাংলার মনীষা ব্যতীত বাকিদের বেলায় আমাদের কঠোর হতেই হবে। মুক্তিযুদ্ধের সোল এজেন্সি নেয়া দলটি তা বুঝুক বা না বুঝুক আমরা তা স্পষ্ট টের পাই। বাংলাদেশও তার তারুণ্যকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিতেই পাঠ্যক্রমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এখন সময়ের চাহিদা। আমরা উদার বটে তবে কারো দাস নই, কারো মুখের দিকে তাকিয়ে বা কারো ভয়েও যেন না বাঁচি আমরা। তার নামই স্বাধীনতা। রাশেদ খান মেনন ভুলে গেলে বা ভোটের রাজনীতির জন্য তা মনে না রাখলেও আমরা যেন না ভুলি।
সিডনি থেকে