ভিন্ন চিত্র সংসদে :অশালীন বক্তব্যের সমালোচনা
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৩, ২২:৪২
জাতীয় সংসদের সোমবারের অধিবেশনের চিত্র ছিল আগের দিনের তুলনায় একেবারে উল্টো। এদিন অশালীন বক্তব্য, চরিত্রহনন বা ব্যক্তিগত আক্রমণের কোনো ঘটনা ছিল না। উল্টো এদিন সরকারি ও বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য আগের দিনের ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। পার্লামেন্টে অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহারের নিন্দা জানিয়েছেন তারা। আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য ও সাবেক আইন মন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু সংসদীয় ভাষা শেখানোর একটি স্কুল খোলার জন্য স্পিকারের প্রতি আহবান জানান। সরকারি দলের আরেক সদস্য জুনাইদ আহমেদ পলক প্রতিটি অশালীন শব্দের জন্য সংশ্লিষ্ট এমপির বেতন থেকে ৩০ হাজার টাকা করে কেটে রাখার প্রস্তাব করেন। আর বিরোধী দলের সদস্য বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ সংসদে অশ্লীল কথা ও ব্যক্তিগত চরিত্রহনন বন্ধে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন।
স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় অধিবেশন শুরুর পর তা বেলা ২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলে। গতকাল অধিবেশনের শুরুতেই ২৭৪ বিধিতে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন জুনাইদ আহমেদ পলক ও আন্দালিব রহমান পার্থ। এ সময় তারা দু’জনই সংসদে অশালীন বক্তব্য ও ব্যক্তিগত চরিত্রহননের সমালোচনা করেন। পরে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আব্দুল মতিন খসরু একই ধরনের সমালোচনা করেন। সংসদের অধিবেশন আজ বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। সোমবার বাজেট আলোচনায় অংশ নেন সাবেক আইন মন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা: দীপু মনি, জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল, বিএনপির আবুল খায়ের ভুঁইয়া প্রমুখ।
আব্দুল মতিন খসরু বলেন, রবিবার আমি সংসদে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু কাগজপত্র সব ফেলে দিয়েছি। কাল কি শুনলাম সংসদে! বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুত্ফর রহমানকে নিয়ে গালাগালি করলো। পার্লামেন্টে এসব বলার অধিকার আমাদের নেই। স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু এক্সপাঞ্জ করবেন তা হবে না। কারণ ২০ বছর পর আমার সন্তান যখন এসব পড়বে, দেখবে কি বিশ্রি ভাষা, কি বিশ্রি চেহারা। এসব দেখার ও শোনার পর আমার আর কিছুই বলতে ইচ্ছা করে না। আমি শুধু বলতে চাই অর্থমন্ত্রী বাজেট দেবেন। সেই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রথম শর্ত হল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রথম বাধা হলো রাজনৈতিক সহিংসতা।
সাবেক আইনমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে রেকর্ড আছে, ২০০৪ সালে শেরাটন হোটেলের কাছে একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দশজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বললেন, এটা আওয়ামী লীগের কাজ। একজন আসামিকে গ্রেফতার করলো। একজন বাচ্চাকে টাকা দিয়ে মিথ্যা বলানো হলো যে, কাজটি আওয়ামী লীগ করিয়েছে। কিন্তু এটা আমাদের কালচারেই নেই। এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। চট্টগ্রামের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে একজন মা তার ক্লাস নাইনে পড়া মেয়েকে নিয়ে বাসে চড়ে যাচ্ছেন স্কুলে। আমরা দেখলাম যে, বাস বোঝাই লোকের উদ্দেশে একজন এসিড নিক্ষেপ করলো। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সেই দৃশ্য দেখানো হয়েছে। তাই আমি পরামর্শ দিতে চাই- হরতাল যারা ডাকবে তাদের সব ফৌজদারি অপরাধসহ সব ধরনের দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। যে দল হরতাল ডাকবে, খুনের দায়ে তাদের এক নম্বর আসামি করতে হবে। রহিম ড্রাইভারকে মারার দায়-দায়িত্ব নিতে হবে খালেদা জিয়াকে। তিনি খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত। সোমবার হরতাল ডাকবেন আর রবিবার সহিংসতা ঘটাবেন, এটা বন্ধ করতে হবে। সহিংসতা বন্ধ করে জাতীয় ইস্যুতে একাট্টা থাকার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আওয়ামী লীগ কখনো ধর্মের বিরোধিতা করে না। আমার নেত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। বিরোধীদল অপপ্রচার চালাচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, হেফাজতের সমাবেশে দুই হাজার, তিন হাজার লোক মারা গেছে বলে বলা হয়। কোন গ্রামের, কোন এলাকার একটা লোক মারা গেছে তা কেউ বলতে পারে না। এসব বানোয়াট অভিযোগ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা: দীপু মনি বলেন, বর্তমান সরকারের সাড়ে ৪ বছরের শাসনামলে দেশের ভিতরে যেমন অনেক উন্নয়ন হয়েছে. তেমনি বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তি অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, এটি এখন বিশ্ববাসীর নজরে পড়ার মতো একটি দেশ। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছি। জঙ্গিবাদমুক্ত ও আধুনিক একটি দেশ গড়তে সক্ষম হয়েছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক অগ্রগতির আরেকটি ধাপ মাত্র। বিরোধী দল জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড না করলে এই বাজেট খুব সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
জাসদের সংসদ সদস্য মইনুদ্দিন খান বাদল বলেন, হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। তখন রায়ে বলা হয়েছিল যদি সংসদ চায় তাহলে আরো দুই বার তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হতে পারে। আমরা সংসদ সদস্যরা তা চাইনি। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সংসদে আসবেন। ওয়াক আউট করবেন। দেশের জনগণ আপনাদের দেখছে। আপনারা পত্র-পত্রিকায় টেলিভিশনে কভারেজ পাচ্ছেন। কিন্তু এটা না করে আপনারা কেন রক্তের পথ বেছে নেন?
আন্দালিব রহমান পার্থ ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে ব্যক্তিগত আক্রমণ হচ্ছে তার পাল্টা জবাব দেয়া আমার সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য অনুমোদন করে না। আমি বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য ও তথ্য দিয়ে কথা বলেছি। এতে কয়েকজন সদস্যের নাম চলে আসতে পারে। আমার জন্মের ওপরে তো আমার হাত নেই। আমার মৃত বাবার সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তাতে মনে হয়েছে তার সন্তান হয়ে আমি অপরাধ করেছি। পার্থ বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা এবং তাদের পরিবারের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য যেসব সংসদ সদস্য দেন তারা সংসদের রীতিনীতি ভুলে যান বলে মন্তব্য করেন পার্থ।