সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রস্তাব হয়, আলোচনা হয় না
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৩, ২২:৪৩
জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংসদের কার্যসূচি মুলতবি করে আলোচনার সুযোগ থাকলেও গত ২২ বছরে এ পর্যন্ত মাত্র ৪টি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অথচ এই সময়ে প্রায় ১০ হাজার প্রস্তাবের নোটিস দিয়েছিলেন সংসদ সদস্যরা। উল্টো সংসদে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রমণ করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। চলতি অধিবেশনেও প্রায় প্রতিদিন একাধিক সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন; কিন্তু আগামী নির্বাচনকালীন সরকারসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে আলোচনায় যাচ্ছেন না তেমন কেউ।
সরকারে থাকাকালে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কেহই এসব বিষয়ে উত্সাহ দেখায় না। বর্তমান নবম জাতীয় সংসদে বিডিআর বিদ্রোহ, সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়াসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব এলেও সেগুলো গৃহীত হয়নি।
একইভাবে অষ্টম জাতীয় সংসদেও ওই সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা, অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব করা হলেও আলোচনা হয়নি।
ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বর্তমান ডেপুটি স্পিকার ও একজন সাবেক স্পিকার মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা না হওয়ার জন্য কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিষয় বিচারাধীন থাকা, তুলনামূলকভাবে গুরুত্বহীন হওয়া ইত্যাদি। এর মধ্যে পরিবেশ-পরিস্থিতি, সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলের অনুপস্থিত থাকার কথাও তুলে ধরেছেন তারা।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, এ পর্যন্ত আলোচিত চারটি প্রস্তাবের সবকটিই ছিল পঞ্চম সংসদের। এরপর গঠিত বাকি তিনটি জাতীয় সংসদে (মাত্র ১২ দিন স্থায়ী ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ বাদে) একটি প্রস্তাবও আলোচিত হয়নি। চলতি নবম জাতীয় সংসদের গত সোয়া চার বছরে প্রায় ৮৩৫টি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এসবের একটি নিয়েও আলোচনা হয়নি।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৬২(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে সাম্প্রতিক জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য যে কোনো সদস্য সংসদ মুলতবির জন্য নোটিস দিতে পারেন। লিখিত এ নোটিস পাওয়ার পর স্পিকারের সম্মতিক্রমে সংসদের নির্ধারিত কাজ মুলতবি করে ওই বিষয়ের ওপর আলোচনা হতে পারে।
৫ম সংসদে (এপ্রিল ’৯১- নভেম্বর ’৯৫) ১ হাজার ৮০৩টি, ৭ম সংসদে ৪ হাজার ৪৩৭টি এবং অষ্টম সংসদে ২ হাজার ৫৯৩টি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস জমা পড়েছিল। ৫ম সংসদে ৫টি নোটিস স্পিকার গ্রহণ করেন, যার চারটি নিয়ে আলোচনা হয়। ৭ম সংসদে স্পিকার ৪১৯টি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস গ্রহণ করলেও আলোচনা হয়নি একটিরও। ৮ম সংসদে ২ হাজার ৫৯৩টি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস দেয়া হলেও কোনোটিই গৃহীত বা আলোচিত হয়নি। আর নবম জাতীয় সংসদের গত সোয়া চার বছরে প্রায় ৮৩৫টি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও একটি নিয়েও আলোচনা করা হয়নি। মোটের ওপর চারটি সংসদে প্রায় সব মুলতবি প্রস্তাবই স্পিকার নাকচ করে দেন আইন ও বিধির কথা উত্থাপন করে।
অষ্টম সংসদে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা এবং আহসানউল্লাহ মাস্টারের হত্যা নিয়ে আলোচনা করতে ৫২ জন সদস্যের মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস স্পিকার গ্রহণ করেননি। বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় একই সংসদে মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার দাবিতে সাড়া পায়নি।
সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, ‘বেশিরভাগ মুলতবি প্রস্তাবের নোটিসই ছিল মামলা আছে এমন বিষয় নিয়ে। কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে সেগুলো আলোচনা করার সুযোগ ছিল না। আবার অনেক সময় বিরোধী দলের সদস্যরা এমন গুরুত্বহীন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনেন যা নিয়ে সংসদ মুলতবি করে আলোচনার সুযোগ নেই।’
বর্তমান সংসদের শুরুতে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে সংসদে মুলতবি আলোচনার নোটিস দিয়েছিলেন বিএনপির ২১ জন সংসদ সদস্য; কিন্তু ‘অতি স্পর্শকাতরতার’ বিষয়টি বিবেচনা করে ওই সময় তাত্ক্ষণিকভাবে আলোচনার সুযোগ দেননি স্পিকার। তবে পরে বিডিআরের ঘটনা নিয়ে সংসদে সাধারণ আলোচনা হয়েছিল। কেন মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস তেমন একটা গ্রহণ করা হয় না জানতে চাইলে চলতি সংসদের ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী বলেন, ‘সময়, পরিবেশ, পরিস্থিতি অনেক বিষয় বিবেচনা করে স্পিকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে অনেক সময় তাত্ক্ষণিক না হলেও পরে আলোচনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, এবারতো বিরোধী দল নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও পরে তারা তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
চলতি সংসদে বিরোধী দল উপস্থিত না থেকেও অসংখ্য মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন স্পিকার চাইলেও ওই সব প্রস্তাব উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
যে চারটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে: ১৯৯১ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রথম সংসদের নির্ধারিত কাজ মুলতবি করে আলোচিত প্রস্তাবটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দল ছাত্রের বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে। ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য রাশেদ খান মেনন এটি উত্থাপন করেন।
এরপর একই বছরের ২৩ এপ্রিল সংসদে আলোচিত মুলতবি প্রস্তাবটি ছিল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ ৪ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে। প্রস্তাবটি এনেছিলেন তখন এনডিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এরপর ১৯৯২ সালের ১২ জানুয়ারি ময়মনসিংহ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সদস্য শামসুল হক ‘পাকিস্তানী নাগরিক গোলাম আজমকে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নির্বাচিত করা’ বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনেন। শেষ মুলতবি প্রস্তাবটি আলোচিত হয় ১৯৯৩ সালের ২০ এপ্রিল। যশোর থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জামায়াত-শিবিরের নারকীয় তাণ্ডবের’ বিষয়ে এ মুলতবি প্রস্তাব আনেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অনীহা: গত চারটি সংসদে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস এলেও কার্যপ্রণালী বিধির যুক্তি দেখিয়ে তা বাতিল করে দেয়া হয়। কিছু কিছু সময় তা গ্রহণ হলেও আলোচনা হয় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অনাগ্রহ দেখানো হয়েছে সব সরকারের আমলেই।
আওয়ামী লীগের প্রবীণ সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, ‘সংসদে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হতে পারে। হওয়া উচিত; কিন্তু রাজনীতি যখন দ্বন্দ্বমুখর হয়ে ওঠে আর পরস্পরের প্রতি যখন শ্রদ্ধাবোধ থাকে না তখন এসব আলোচনার প্রস্তাব অর্থহীন হয়ে ওঠে।’
সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘সংসদকে কার্যকর করতে হলে সরকারি দলকেই বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। বর্তমান সংসদেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে; কিন্তু তা আমলে নেয়া হচ্ছে না।
১০ মিনিটে ৩৬ প্রস্তাব নাকচের নজির: গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে টিপাইমুখ বাঁধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাঁদাবাজি, বিরোধী দলীয় নেত্রীকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে ‘উচ্ছেদ’, সংসদ সদস্যদের এলাকার বিভিন্ন সমস্যাসহ বিরোধী দল বিএনপির সংসদ সদস্যদের ৩৪টিসহ ৩৬টি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস স্পিকার ১০ মিনিটের মধ্যে নাকচ করেন। বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে উপস্থিত না থাকায় তাদের নোটিসগুলো বাতিল হয়ে যায়।
উপস্থিত সরকারি দল ও স্বতন্ত্র সদস্যের নোটিস দুইটিও এ সময় নাকচ হয়ে যায়। ওই সময়ের স্পিকার এক সঙ্গে সব কটি নোটিসের বিষয়বস্তু তুলে ধরে দুই বাক্যের সিদ্ধান্তে সব প্রস্তাব নাকচ করে দেন। স্পিকার বলেন, সংসদ মুলতবি করে আলোচনা করার মতো কোনো নোটিস পাওয়া যায়নি। দৃশ্যত নোটিসগুলোর অধিকাংশই সংসদ মুলতবি করার মতো বিষয় না হলেও টিপাইমুখ বাঁধ ও খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের মতো বিষয়ও বিধির যুক্তিতে নাকচ হয়ে যায়।
মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে সংসদ বিশেষজ্ঞ ড. এটিএম ওবায়দুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার নজির খুবই কম। প্রতিটি সংসদে অন্তত দশটি বিষয়ে এ ধরনের নোটিস গৃহীত হতে পারে।’ ড. ওবায়দুল্লাহ জানান, ভারতে গড়ে বছরে এ ধরনের ১০ থেকে ১৫টি নোটিসের ওপর আলোচনা হয়।
এছাড়া বিশ্বের অনেক পার্লামেন্টেরই মডেল হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রতি কার্যদিবসের শেষেই আধঘণ্টা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়ে থাকে। এমপিরা সেখানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বা নিজের নির্বাচনী এলাকার বিষয় তুলে থাকেন যার জবাব দেন একজন মন্ত্রী।