বিলুপ্ত ডাইনোসরের গল্প

ডাইনোসর শব্দটির সাথে তোমরা সকলেই পরিচিত। শব্দটি মনে হতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি বিশালদেহী জন্তুর অবয়ব। এ নিয়ে জানার আগ্রহের কারো কোন কমতি নেই। এক সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল ও বিরাট আর শক্তিশালী এ জন্তুটি পৃথিবীতে বিচরণ করেছিল প্রায় ১৬০ মিলিয়ন বা ১৬,০০,০০,০০০ বছর যাবত। পৃথিবীতে ডাইনোসরের উদ্ভব হয় ২৩০ মিলিয়ন বছর পূর্বে আর ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে এর বেশীরভাগ প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ডাইনোসর ছিলো মন্থর গতিসম্পন্ন, স্বল্পবুদ্ধি ও ঠাণ্ডা মেজাজের প্রাণী। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের ধারণার পরিবর্তন ঘটে। এদের কিছু প্রজাতি ছিল মাংশাসী, কিছু ছিল তৃণভোজী, কিছু প্রজাতী দু পায়ে হাটতে পারত আবার কিছু প্রজাতি চার পায়ে হাটত। কোনোটি উচ্চতায় ছিল প্রায় ১০০ ফুট আবার কোনোটি ছিল মুরগীর সমান। এ পর্যন্ত ডাইনোসরের আবিষ্কৃত প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫০০, আরও নতুন ১৫০০ প্রকারের ফসিল পাওয়া গেছে। তার মানে এখনো প্রায় ৭৫% প্রজাতি আবিষ্কারের অপেক্ষায়। প্রজাতিভেদে ডাইনোসরের আকার ও আকৃতিগত অনেক বিভিন্নতা ছিল। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মাংসাশী যত প্রাণী আছে তার মধ্যে টি রেক্স (এক প্রকারের ডাইনোসর) সবচেয়ে বড়। ১৯০২ সালে সর্বপ্রথম এ প্রাণিটির ফসিল বা জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত এটি পৃথিবীতে একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তার করে, এর জীবাশ্ম পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকা এবং মঙ্গোলিয়ায়। ২০০টি (প্রায়) হাড় সংবলিত ভয়ংকর এই প্রাণিটির ওজন ছিল ৬-৭.৫ টন এবং দৈর্ঘ্য ছিল ৪০ফুট (১২মিটার) এবং উচ্চতা ১৫ থেকে ২০ ফুট (৪.৬ থেকে ৬ মিটার)। এদের মাথার খুলির দৈর্ঘ্য ছিল ৫ ফুট (১.৫ মিটার) যার মধ্যে চোয়ালের দৈর্ঘ্যই ছিল ৪ফুট (১.২ মিটার)। এদের উরু শক্ত এবং লেজ লম্বা ছিল যা তাদের নড়াচড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখত। এর দাঁতগুলো ছিল কোণাকৃতির এবং দৈর্ঘ্য ছিল ৯ ইঞ্চি যা তাদের শিকারকে সহজে চিবোতে সাহায্য করত। এদের সামনের পাগুলো পেছনের পায়ের তুলনায় যথেষ্ট ছোট ছিল, ফলে সামনের পাগুলো এর মুখ পর্যন্তও পৌঁছাতো না, এই পা দুটি শুধুমাত্র শিকার ধরার কাজেই ব্যবহূত হত। টি রেক্স একটি হিংস্র মাংসাশী ডাইনোসর। হয়ত এটি শুনেও অবাক হবে, এটি এর দেহের চেয়েও বড় তৃণভোজী ডাইনোসরদেরকেও খাবার হিসেবে শিকার করত। ট্রাইসেরাটোপস (Triceratops) ডাইনোসর এদের প্রিয় শিকার ছিল। শুধু তাই নয়, এরা এদের নিজেদের প্রজাতি অর্থাত্ অন্য টি রেক্সকেও ভক্ষণ করতে দ্বিধা করত না। আমেরিকা এবং কানাডার বিজ্ঞানীরা টি—রেক্সের কঙ্কালের গায়ে কামড়ের চিহ্ন পেয়েছেন যা ছিল অন্য একটি টি রেক্সের। বিশেষজ্ঞদের মতে, টি রেক্স একটি কামড়ে প্রায় ৫০০ পাউন্ড মাংস মুখে নিতে পারত। টি রেক্স এর পায়ের ছাপের দৈর্ঘ্য ১.৫৫-৩.৩ ফুট। অনেকে মনে করেন, টি রেক্স সকল ডাইনোসরের মধ্যে বৃহত্তম ডাইনোসর, এটি আসলে ভুল ধারণা, কারণ টি রেক্স শুধুমাত্র মাংসাশী ডাইনোসরের মধ্যে বৃহত্তম প্রজাতীর ডাইনোসর। ডাইনোসরের বিলুপ্তির সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরিভাবে জানতে পারা যায়নি। তবে অনেক বিজ্ঞানীই মনে করছেন কোনো বড় আকারের উল্কাপিন্ড পৃথিবীর উপর প্রবলভাবে আঘাত হানার ফলে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়। তাদের মতে, উল্কাটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং এর আঘাত পারমাণবিক বোমার চেয়ে এক বিলিয়ন গুণ বেশী শক্তিশালী ছিল। তবে কেউ কেউ মনে করেন, উল্কার আঘাতে নয় বরং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্তপাতের ফলে ডাইনোসরের বিলুপ্তি ঘটে। তাছাড়া খাদ্যাভাবকেও অনেকে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ মনে করেন। সেসময় মাংশাসী ডাইনোসর তৃণভোজী ডাইনোসরদের খেয়ে ফেলত বিধায় এক সময় খাদ্যাভাব সংঘটিত হয় বলে অনেকের ধারণা। তাপমাত্রার পরিবর্তনকেও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। অনেকের মতে সেসময় পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রার এক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যার সাথে অভিযোজিত হতে না পেরে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়। বিশালাকার ডাইনোসরেরা চলাফেরায় ধীর ও স্থবিরতার ফলে এবং নোংরা পরিবেশের কারণে তারা বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত রোগের শিকার হয় এবং এভাবে এক সময় বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হয় বলে অনেকে মনে করেন। তবে ডাইনোসরের বিলুপ্তিতে আরেকটি কারণকে প্রাধান্য দেয়া হয় তা হলো, তাদের ডিমের খোসার পুরুত্ব। পরীক্ষায় দেখা যায়, সাড়ে ছয় কোটি বছর আগের ডিমের খোসা ১২ থেকে ১৪ কোটি বছর আগের ডিমের খোসার চেয়ে যথেষ্ট পুরু ছিল। ফলে ডিমের খোসা ভেঙে বেরিয়ে আসা বাচ্চা ডাইনোসরের পক্ষে কষ্টকর ব্যাপার ছিল। এর ফলে পরবর্তীতে ডাইনোসরের বিকলাঙ্গতা দেখা দিত এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেত। এভাবে এক সময় তারা বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হয়। এমন একটা প্রাণী বর্তমানে পৃথিবীতে টিকে থাকলে সেটা আমাদের জন্য ভয়ংকর ঘটনা হতো। তবে তোমাদের হয়তো কিঞ্চত্ আফসোস জাগতে পারে—আজব এ প্রাণিটিকে কখনো চিড়িয়াখানায় জ্যান্ত দেখতে দেখার সৌভাগ্য হবে না।