থাকা না থাকায় সারিকা
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৩, ২০:০৪
এক সময়ের ব্যস্ততম মডেল ও অভিনেত্রী সারিকা নানা ঘটনা-রটনার জন্য আলোচনায় আছেন বরাবরই। তাই তার নামের সঙ্গে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই বিশেষণই যুক্ত হয়েছে। কাজের ক্ষেত্রগুলোতে হরিণীর ক্ষিপ্রতায় ছুঁয়েছেন একের পর এক সাফল্য। তবে এই সফলতা খুব বেশি আয়ু পায়নি। খামখেয়ালিপনার কারণেই তিনি সুন্দর ক্যারিয়ার থেকে ছিটকে পড়েছেন নিজের অজান্তে। তাকে নিয়ে নির্মাতাদের অনেক আশা থাকলেও বিবর্ণ স্বপ্নে মগ্ন এই তরুণী সবাইকে শুধু হতাশই করলেন। ক্রমেই নিভে আসা এই তারকার গল্পটি জানাচ্ছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন সাফাওয়াত খান সাফু
মৌ আর মোনালিসার পথ ধরে একটা সময় মডেলিংয়ে জোরালো পায়ে হেঁটেছেন সারিকা। মডেলিংয়ের মাধ্যমেই মিডিয়ায় এসেছিলেন তিনি। তিন বছর শুধু মডেলিং নিয়েই ছিলেন। এরপর অভিনয়ে নাম লেখান। অন্যদের তুলনায় খুব অল্প সময়ে টিভি নাটকে তৈরি করেন নিজের চাহিদা। প্রস্তুতি ছিল বড়পর্দায় নামার। সবমিলিয়ে ক্যারিয়ারের সোনালি সময়ে ছিল তার অবস্থান। কিন্তু হঠাত্ করেই তিনি যেন হারাতে থাকলেন নিজের স্বকীয়তা। কেননা ‘বাংলা সিনেমায় অভিনয় করব না’ টেলিভিশনের নতুন মডেল বা অভিনেত্রীদের এ ধরনের কথা বলাটা অনেক আগে থেকেই রেওয়াজ হয়ে আসছে। পরে এর সঙ্গে গত দশকে যুক্ত হয়েছে ‘টেলিভিশন চ্যানেলের ছবি অথবা আর্টফিল্ম ঘরানার ছবি হলে অভিনয় করতে পারি’ ধরনের মন্তব্য। একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাতা তাদের পছন্দ অনুযায়ী নতুন মডেল বা টেলিভিশন অভিনেত্রীদের তাদের গল্প অনুযায়ী ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেই এ ধরনের মন্তব্য শোনা যায়। অবশ্য তার মানে যে চলচ্চিত্র নির্মাতারা এক্ষেত্রে ব্যর্থ তা কিন্তু নয়। কারণ একটা সময় মন্তব্যকারী টিভি অভিনেত্রী বা মডেলরা ঠিকই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছা চূড়ান্ত করে যোগাযোগ করেন সেই নির্মাতাদের সঙ্গে। তবে বেশিরভাগই টিনেজ সময় বা তুঙ্গে থাকা ক্যারিয়ার শেষ করে বা হারিয়ে তারপর আসেন। সম্প্রতি এমনি দেখা গেছে সারিকার ক্ষেত্রে। ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল সময়ে অনেকেই তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সে সময় সব প্রস্তাবই না করে দিয়েছিলেন সারিকা। সোহানুর রহমান সোহান, এস এ হক অলিক, স্বপন আহমেদ, মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজসহ আরও কয়েকজন নামী পরিচালক সারিকাকে নিয়ে বেশ ক’বার ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ছবিতে সারিকার পছন্দ অনুযায়ী নায়ককেই নেওয়া হবে—এমন প্রস্তাবনা থাকা সত্ত্বেও একাধিক চলচ্চিত্র পরিচালককে ফিরে আসতে হয়েছিল। সারিকা তাদের বলেছিলেন, ‘বাংলা সিনেমায় আমার অভিনয়ের ইচ্ছা কম। কয়েকদিন মডেলিংয়ের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়ে, টুকটাক নাটকে অভিনয়ের পরই হঠাত্ সব ছেড়ে দেবো এবং বিয়ে করে সংসারী হবো। অতএব, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ভাবনা আমার নেই।’ কিন্তু সম্প্রতি সারিকার আওয়াজ পাল্টে যায়। কাছের ও মিডিয়ার বিভিন্নজনকে তিনি বলছেন তার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছার কথা। বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়া সারিকা এরই মধ্যে বাদ পড়েছেন সেখান থেকে। তার বদলে নেওয়া হয়েছে মেহজাবীনকে। এদিকে টিভি নাটকেও সারিকাকে নিয়ে নির্মাতাদের নির্মাণ কমে গেছে। এ বিষয়ে সারিকার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছেন, বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনে কাজের জন্য অন্য সবাই যেখানে উদগ্রীব হয়ে থাকেন, সারিকা সেখানে কাজ করার সময়ে তাদের ভুগিয়েছেন। পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকের নির্মাতাদের সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছেন এ অভিনেত্রী। সকালে বলে বিকাল-সন্ধ্যায় সেটে যেতেন তিনি। তবে বেশ রাত পর্যন্ত কাজ করতে তার কোনো আপত্তি থাকত না। টেলিভিশন চ্যানেলের কয়েকটি অনুষ্ঠানেও সারিকা ‘পেইন’ শব্দটি নিজের নামের সঙ্গে যোগ করেছেন। সব মিলিয়ে সারিকাকে নিয়ে ছোট পর্দায় এখন আর খুব একটা কাজ হয় না। যা গত কয়েক মাসে টেলিভিশনে প্রচারিত নাটকে তার অনুপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়।
প্রেম ও নিখোঁজ রহস্য
সারিকার সঙ্গে নিরবের প্রেমকাহিনী গত বছর মিডিয়াজুড়েই আলোচনায় ছিল। নিরবের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছেন সারিকা। তাদের দুজনের প্রেম নিয়ে কোনো রাখ-ঢাক ছিল না। গভীর রাতে দু’জনে মিলে লং ড্রাইভে যাওয়া। নিরালায় একসঙ্গে ভোজন পর্ব। দেশের বাইরে শুটিংয়ের নামে শপিং, এটা সেটা। আরও কত কি! সারিকার সেই বাধ্য প্রেমিক নিরব নেই সারিকার জীবনে। এটা ভাবা যায়! হ্যাঁ, এটাই সত্যি। নিরব এখন সারিকার জীবনে অতীত। সারিকার জীবনে প্রেমটা একটু বেশিই এসেছিল। একটু বেশিই প্রেমের সঙ্গে মাখামাখি তার। সারিকার প্রেমটা শুরু হয়েছিল স্কুল জীবন থেকেই। ধানমন্ডির টিউটোরিয়াল স্কুলে যখন পাঠ নিচ্ছিলেন, তখনই তার মন প্রেমের পাঠ নিতে উসখুস। ফলাফল, স্কুল থেকে আউট। এমনটাই জানা যায় সারিকার সহপাঠীদের কাছ থেকে। সেই সারিকা প্রেম না করে থাকতে পারে? না পারে না। শূন্য হূদয় পূর্ণ করতে নিরবের পরে সারিকা কিছুদিন অভিনেতা ইমনের সঙ্গে ডেটিং করেছেন। কিন্তু সারিকাকে প্রেমিকা হিসেবে প্রকাশ্যে মেনে নিতে নারাজ ইমন। শোনা যাচ্ছে ইমনও সারিকার জীবনে গত হয়েছেন। তাহলে এখন কে সেই সৌভাগ্যবান পুরুষ, যিনি সারিকার হূদয় বাগানে ফুল ফোটাচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাব জানতে সারিকার মুঠোফোনে চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি তার নাম্বারে মেসেজ করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই বাধ্য হয়ে সারিকার ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। ঘনিষ্ঠ সেই সূত্রটি জানিয়েছে, সারিকা নতুন করে প্রেমে মজেছেন। সারিকার নতুন প্রেমিকের নাম জানা না গেলেও তাদের কেচ্ছা-কাহিনীর খানিকটা আভাস পাওয়া গেছে। সারিকার নতুন প্রেমিক এক ব্যবসায়ী। সারিকার সঙ্গে তাকে অভিসারেও যেতে দেখা গেছে। অবশ্য সারিকা এই সব অভিসারে যেতে বরাবরই রোমাঞ্চিত বোধ করেন। কেননা, গত বছরের শেষের দিকে মাহফুজ নামে এক প্রেমিকের সঙ্গে কক্সবাজারে উধাও হয়ে যান। অতঃপর সেখানকার বিলাসবহুল হোটেল সিগ্যালে পরিচয় গোপন রেখে অবস্থান করেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। হোটেল কক্ষে অতিমাত্রায় নেশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। তবে সেই যাত্রায় রাশ টেনে ধরেন নিরব। কিন্তু এখন সারিকার রাশ টেনে ধরবে কে? সারিকার নতুন প্রেমিককে নিয়ে সম্প্রতি মিডিয়াজুড়ে গুজব ছড়িয়েছে। সারিকার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, সারিকা আগের চেয়ে এখন অনেক সাবধানী। সহসা তার প্রেমের কথা মিডিয়াতে চাউর করতে চান না। আবার অনেকে বলছেন, সারিকার নতুন প্রেম কয়দিন টেকে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
অপেশাদার আচরণ
মডেল ও অভিনয়শিল্পী সারিকার বিরুদ্ধে এবারে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ তুলেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এশিয়ান টিভি কর্তৃপক্ষ। অপেশাদার আচরণের জন্য চ্যানেলটির নির্মাণাধীন রিয়েলিটি শো ‘স্টার ড্যান্স’ থেকে বাদ দেওয়া হয় মডেল ও অভিনেত্রী সারিকাকে। তার পরিবর্তে নতুন করে শোতে অংশ নেন লাক্স তারকা মৌসুমী। এ প্রসঙ্গে এশিয়ান টিভি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ‘অপেশাদার আচরণের কারণে বাধ্য হয়েই সারিকাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দিতে হয়। সকাল নয়টায় শুটিং শিডিউল থাকলেও বিকেল, এমনকি সন্ধ্যায়ও অনুষ্ঠানস্থলে তার দেখা পাওয়া যায় না। সারিকার কারণে অন্য শিল্পীদেরও তখন অকারণে বসে থাকতে হয়। এতে করে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে অনুষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। তাই অনুষ্ঠানের স্বার্থে সারিকাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে, কিছুদিন আগে চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরে ‘ডাইন আউট উইথ আস’ অনুষ্ঠানে ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ শিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্পর্কে অবজ্ঞাসূচক এবং নাট্য পরিচালক ও প্রযোজকদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করায় প্রযোজকদের সংগঠন টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তিন মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল সারিকাসহ আরও দুই অভিনয়শিল্পীকে। পরবর্তীতে ঘটনার জন্য অনুতপ্ত হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।
হঠাত্ই বিস্মৃতির অতলে
গত ছয় মাসে সারিকাকে নতুন কোনো বিজ্ঞাপনে দেখা যায়নি। বেশ কয়েকবার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ঘোষণা দিয়েও কথা রাখতে পারেননি। অনেক দিন আগেই তিনি ধারাবাহিক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। নাটক-টেলিছবিতেও তার উপস্থিতি কমে গেছে। তা হলে সারিকা কী দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছেন? সারিকার ভক্ত-শুভকাঙ্ক্ষীদের মনে এ প্রশ্ন এখন হরহামেশা উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে। এ বিষয়ে সারিকার ভাষ্য ছিল, ‘আমি এখন বেছে বেছে নাটক-বিজ্ঞাপনে কাজ করছি। তাই মিডিয়ায় আজকাল আমাকে একটু কমই দেখা যাচ্ছে।’ তবে সারিকার এ বক্তব্য মানতে রাজি নন অনেকেই। তাদের মতে, নিরবের সঙ্গে সম্পর্কের পাট চুকিয়ে ফেলার পর সারিকার ব্যস্ততায় অনেকটা ভাটা পড়ে গেছে। অন্যদিকে মেহজাবীনসহ অন্য লাক্সতারকাদের জনপ্রিয়তার দাপটে সারিকা যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছেন। একজন পরিচালক জানান, সারিকার এ অবস্থার পেছনে তার কাজের প্রতি অমনোযোগিতা ও বারবার সিডিউল ফাঁসানোর বিষয়টি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সারিকা অসংখ্য বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছেন। তবে গত ছয় মাস ধরে তার ক্যারিয়ারে বেশ দুর্দিন চলছে। এ সময়ে মাত্র একটি বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ‘বোটানিক এ্যারোমা আল্পনা মেহেদী’র এ বিজ্ঞাপনটি বর্তমানে প্রচার হচ্ছে। এদিকে সারিকা সৈয়দ সাঈদ হোসেন বাবুলের পরিচালনায় ‘শেষ পর্ব’ শিরোনামের একটি টেলিছবির কাজ শেষ করেছেন বলে জানা গেছে। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন শাহেদ শরীফ খান।
বিজ্ঞাপনচিত্র
২০০৬ সালে গাজী শুভ্র নির্মিত ডিজুসের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে শোবিজে তার অভিষেক। এরপর অমিতাভ রেজার নির্দেশনায় অ্যারোমেটিক বিউটি সোপের মডেল হয়েছিলেন। এই বিজ্ঞাপনে গ্ল্যামারাস পারফর্মেন্স তাকে নিয়ে আসে আলোচনায়। তারপর একে একে সিঙ্গার, নকিয়া, সাগুফতা প্রপারটিজ, কেয়া সোপ, এলিট মেহেদি, আমিন জুয়েলার্স, প্রাণ এবং বাংলালিংক সিরিজের বিজ্ঞাপন সারিকাকে পুরোপুরি মডেল হিসেবে পৌঁছে দেয় লাইম লাইটে।
নাটক
টিভি নাটকে সারিকার হাতেখড়ি ২০০৯ সালে। ওই বছর আশুতোষ সুজনের পরিচালনায় রবীন্দ্র জয়ন্তীর বিশেষ নাটক ‘ক্যামেলিয়া’তে অভিনয় করেন তিনি। নাটকটি প্রচারের পর পরই একের পর এক নাটকের অফার তার পিছু নেয়। কিন্তু অভিনয়ে পদার্পণের শুরুতে দেখে শুনে বুঝে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। সারিকা অভিনীত জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে রয়েছে—‘রাধা তুমি কার’, ‘গেন্দুচোরা ও প্রেম কাহিনী’, ‘রুমালী’, ‘প্রেমের বেদনা’, ‘আহা বালিকা’, ‘বিকেলে সোনা রোদ’, ‘একটু বোকামি অনেকটা পাগলামী’ প্রভৃতি।