সিরাজগঞ্জের কালজয়ী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে সিরাজগঞ্জ জেলা। এ জেলায় জন্ম নেয়া অসংখ্য রাজনীতিবিদ জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে অন্যতম ভূমিকা রেখে গেছেন। এদের মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন অনেকেই। বাণীকুঞ্জের সিংহ পুরুষ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী মহান সাধক ইসমাল হোসেন শিরাজী ১৮৭৯ সালের ১৫ই জুলাই সিরাজগঞ্জ শহরের দিয়ারধানগড়ার এক ঐতিহাসিক পাদপীঠ ‘বাণীকুঞ্জ’ এ জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুল করিম, মাতা বিদূষী, রত্নগর্ভা রমনী নুরজাহান খান। এই ইসমাল হোসেনই উপমহাদেশের নিসপ্রভ মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলতে কান্ডারীর ভূমিকায় অবর্তীণ হন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করেন। প্রতিভাবান এই মনিষী একাধারে কবি, সাহিত্যক, রাজনৈতিক, ধর্ম প্রচারক ছিলেন। তাঁর লিখনির দ্বারা পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলেছেন। ১৯১২ সালে বলকান যুদ্ধে তুরস্ককে সহযোগীতা করার জন্য ভারতবর্ষ থেকে যে মেডিক্যাল মিশন পাঠানো হয় সিরাজী ছিলেন তাঁর সদস্য। তুরস্কের সুলতান তাঁকে গাজী উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি একজন পূর্ণজাগরনবাদী লেখক হিসেবে খ্যাত। তাঁর লেখা অনল প্রবাহ, নুর উদ্দিন, তারা বাঈ তুর্কী নারীজীবন উল্লেখযোগ্য। ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই অনল প্রবাহের এই কবি ও মনিষী মৃত্যুবরণ করেন। মওলানা ভাসানী ১৮৮৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই সিরাজগঞ্জের পৌরসভার অন্তর্গত সয়াধানগড়া গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে পিতা হাজী শরাফত আলী খানের ঘরে জন্ম নেন সেদিনের সেই শিশু চেগা মিঞা। সেই বৃটিশ শাসনে আসামে কুখ্যাত লঅইন প্রথা ও বাঙ্গালখেদা বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে হয়ে ওঠেন গণমানুষের প্রাণের মানুষ হিসাবে। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করেছেন। চলনে পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন অতি সাধারণ। সামান্য লুঙ্গি, পাঞ্জাবী আর তালের টুপি তাকে করেছে মহিমান্বিত। ১৯৭৬ এর ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানী ইন্তেকাল করেছেন। গোলাম আম্বিয়া খান লোহানী গোলাম আম্বিয়া খান লোহানী ১৮৯২ সালের ২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ আমলাপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৪-১৯২০ পর্যন্ত লন্ডনে অবস্থান করেন। ১৯২১ এর মে মাসের শুরুতে ইউরোপে অবস্থানরত প্রবাসী বিপ্লবীদের বৈঠকে যোগদানের জন্য মস্কো গমন করেন। ১৯২১০এর প্যারিসে অবস্থানকালে প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘দি মাসেস অব ইন্ডিয়া’র সম্পাদনা ও তা বিশেষভাবে ভারতে পাঠানোর কাজে নিযুক্ত হন। ১৯১৯ এ লেনিনের উদ্যোগে গঠিত ‘কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক’ (কমিনর্টান)-এ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মস্কোস্থ প্রাচ্যদেশীয় ইন্সটিটিউট এ বাংলা ভাষার শিক্ষক ছিলেন। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের ওপরে ক্লাস নিয়েছেন। শ্রমিকদের জন্য ‘মস্কো ওয়ার্কার্স ইউনির্ভাসিটি’ এবং কমিউনিস্ট ইউনির্ভাসিটি অব দি ওয়ার্কিং পিপল অব ইস্ট’-এ শিক্ষকতা করেন। এই বিপ্লবী গোলাম আম্বিয়া খান লোহানী’র মৃত্যু হয় ১৯৩৮ সালে। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার তারুটিয়া গ্রামে ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলা ১১ অগ্রহায়ণ ১৩০৭ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ। পিতা সুপ্রসিদ্ধ আলেম ও পীর হযরত আবু ইসহাক (র.) ছিলেন উত্তর বাংলার একজন সুখ্যাতিসম্পন্ন আধ্যত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার একদশক পূর্তির আগেই যখন নিদারুণ সঙ্কটে পতিত হয় তখন মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ শক্ত হাতে এর হাল ধরেন। মাওলানা তর্কবাগীশ একটানা দশ বছর সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত থেকে দলটিকে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যান। ১৯১৯ সালের দিকে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে তিনি বিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে পুরোপুর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আব্দুল্ল¬াহ আল মাহমুদ সিরাজগঞ্জ জেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের কয়ালগাঁতি গ্রামে ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মরহুম দেরাজ উদ্দিন তালুকদার ছিলেন বিদ্যোত্সাহী ও সমাজসেবী। ১৯৩৭ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার বিধানসভায় সদস্য ও পার্লামেন্টের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। আব্দুল¬াহ আল মাহমুদ অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে বৃটিশ প্রদত্ত ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রত্যাখান করেন। তিনি লক্ষেীতে মুসলিম লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় বাংলা প্রদেশ থেকে নির্বাচিত একমাত্র সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে জয়েন্ট চিফ হুইপ নিযুক্ত হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে আরো দু’বার তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালে আব্দুল¬াহ আল মাহমুদ পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদে শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী । ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ১৯১৭ সালের ১৬ই জানুয়ারী সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানাধীন কুড়িপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জ বি.এল. স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আই.এ. কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ. (১৯৪১) এবং আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ. (১৯৪৫) ও ল’ পাস করেন। ১৯৭১-এ ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত স্বাদীন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত। ১৯৭৫ এর ২৫ জানুয়ারি দেশে সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে একদলীয় রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২৪ ফেব্রুয়ারী (১৯৭৫) কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সশস্ত্রবাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন ১৯২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী থানার শৈলজানা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আব্দুল জলিল । ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক নির্বাচিত হন। ৫২’র ৭ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দানের জন্য তিনি ‘ভাষা মতিন’ এবং ‘ছাত্র মতিন’ হিসেবে পরিচিত। তিনি পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আব্দুল মমিন তালুকদার আব্দুল মমিন তালুকদার ১৯৩০ সালের ১ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আব্দুল মমিন তালুকদার সাহেব ১৯৫২-৫৬ সাল পর্যন্ত এই সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন। ১৯৫৪ সালে আব্দুল মমিন তালুকদার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরি কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ৭১ পরবর্তী তিনি খাদ্য প্রদিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৯৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মোতাহার হোসেন তালুকদার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী মোতাহার হোসেন তালুকদার ১৯২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সিরাজগঞ্জের গজারিয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম নইমুদ্দীন তালুকদার। তিনি ১৯৪৫-৪৬ সালে পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ছিলেন।১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি জেলখানা থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং রৌমারী ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০১ সালের ২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মির্জা মোরাদুজ্জামান সিরাজগঞ্জ সদর জেলাধীন কাওয়াখোলা ইউনিয়নের অন্তর্গত কুড়িপাড়া গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১১ মার্চ এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে মির্জা মোরাদুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মওলানা ভাসানীর সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৫ সালের ১৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। পলাশডাঙ্গার মহানায়ক আব্দুল লতিফ মির্জা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে যে কজন মহান ব্যক্তিত্ব তাদের অক্লান্ত মেধা ও শ্রম দিয়ে লড়াই করেছেন তার মধ্যে মরহুম আব্দুল লতিফ মির্জার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সিরাজগঞ্জবাসীর মনে। মুক্তিযুদ্ধে বেসরকারী সাব সেক্টর পলাডাঙ্গা যুবশিবির প্রতিষ্ঠা করে শত শত মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করেন। নওগার যুদ্ধসহ অসংখ্য যুদ্ধ পরিচালনা করে পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের পরাস্ত করেন। তিনি দু’ দুবার উল্লাপাড়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে শ্রম, জনশক্তি ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও প্যানেল স্পীকারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৭ সালের ৫ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়াও অধ্যাপক ডাঃ এম এ মতিন, আমির হোসেন ভুলু, শহীদুল্লাহ খান , আবু কোরাইশী খান, এম এ মতিন (বেলকুচি), সাইফুদ্দিন এহিয়া খান মজলিস, ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলাম, সৈয়দ হায়দার আলী, আনসার আলী সিদ্দিকী প্রমূখ।