[ নি র্বা চ ন ]

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন :সংশয় ও শঙ্কা

আর মাত্র পাঁচ-ছয় মাস পর আগামী দশম সাধারণ নির্বাচন নিয়ে জনমনে শঙ্কার কারণ সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্পষ্টভাবে বার বার বলেছেন, অসাংবিধানিক ও অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দেয়া হবে না। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করার জন্য অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশে নির্বাচন হবে। তাতে সকল দলের অংশগ্রহণ থাকবে। ফলাফল যাই হোক মেনে নেয়া হবে এবং জনগণ যাকে নির্বাচিত করে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। বিরোধী দলের কিছু প্রস্তাব থাকলে, দাবি থাকলে তা সংসদে এসে পেশ করলে আলোচনা করা হবে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য দল টানা ৮৩ দিন সংসদের বাইরে থাকার পর জাতীয় সংসদে যোগ দিয়েছে। বিএনপি কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিস দিয়েও তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারি দলও এ ব্যাপারে আর আলোচনা করেনি। ফলে আলোচনার এ ইস্যুটি উপেক্ষিত হলো। চার সিটি কর্পোরেশনে বিরোধী দলের মেয়র প্রার্থীদের বিজয়ের পর তাদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রমাণিত হলো নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন হওয়া সম্ভবপর। কাজেই আগামী নির্বাচনের জন্য অসাংবিধানিক সরকার আর দাবি করা ঠিক হবে না। পুনরায় দেশে ১/১১-এর ন্যায় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে কারো রেহাই হবে না। এবার তত্ত্বাবধায়ক এলে কেয়ামত পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় থাকতে চাবে এবং নির্বাচন আর নাও অনুষ্ঠিত হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আরো শঙ্কা হলো, এবার তিনি ও বিরোধী দলীয় নেত্রী উভয়ই কারাগারে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা মঙ্গলজনক। সংসদ, সংবিধান ও গণতন্ত্র সুরক্ষার জন্য আগামী নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে হবে। প্রধান বিরোধী দলের মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে অগণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রদ্রোহী বলে অভিযোগ করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতে, সরকার মেয়র নির্বাচন ও স্থানীয় পর্যায়ে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে আগামী নির্বাচনে ভরাডুবির আশংকায় জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের হাতে দিতে ভয় পান। এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হলো: ‘মিথ্যাচার করবেন না। সংসদে আমার বক্তব্য ছিল, আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে দেশে আর নির্বাচন নাও হতে পারে।... অথচ আমার সেই বক্তব্য বিকৃত করে প্রকাশ করা হলো তত্ত্বাবধায়ক চাইলে নির্বাচনই হবে না। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থেকে শেখ হাসিনা সরবেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যর্থ উপদেষ্টাদের কথা তিনি শুনবেন না’। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে যাবেন না এবং দেশে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে আগামী নির্বাচনের সরকার নিয়ে অমীমাংসার ফলে তৃতীয় শক্তি অথবা অসাংবিধানিক শক্তি সুযোগের অপেক্ষায় আছে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। বিদেশি কূটনৈতিক ও প্রভাবশালী মহল সংলাপের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমাধান চাইলেও সময় অতি দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে অমীমাংসার অবস্থা নিয়েই। এতে সুস্থ রাজনীতির ধারা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সংবিধানসম্মত ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। তৃতীয় শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে দেশের তিনবাহিনী প্রধানগণ আবির্ভূত হবেন না। তারা সংবিধানের ধারাবাহিকতার পক্ষে অটল থাকার অঙ্গীকার করেছেন। বিরোধী দল অর্থাত্ ১৮ দলীয় জোট বিগত প্রায় ৪ বছর ধরে এ ইস্যু নিয়ে রাজপথে উত্তাল আন্দোলন করেও সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি। সরকারকে পঙ্গু করে টেনে-হিঁচড়ে নামানোর হুমকি দিয়েও সফল হয়নি। উপরন্তু হরতালের নামে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের কারণে গ্রেফতার হয়েছেন এবং জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন বার বার। সুশীল সমাজ তথা তত্ত্বাবধায়কপন্থীদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অনির্বাচিতদের হাতে এবং নির্দলীয়দের হাতে আর ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। নির্বাচনের আগে জোট ও মহাজোটের মধ্যে ভাঙা-গড়ার আশংকা রয়েছে। এরশাদ মহাজোট থেকে সরে যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন। বিকল্পধারা, এলডিপিসহ অন্যান্য দলও জোটবদ্ধ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। বাস্তবে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুদৃঢ় ঘোষণা থাকলেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর আলোচনা, নতুন প্রস্তাব, সংলাপ এবং সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এতে জনগণও শঙ্কিত এবং ভীত। কারণ সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা মূলত নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ না হলে তা দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না। আবার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন দানের ও বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপারটিও আলোচনার বিষয়। যদিও দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার স্থানীয় পর্যায়ের সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন ক্রমশ আরো গ্রহণযোগ্য হয়েছে দেশের চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দলের বিজয়ের পর। এতে বিরোধী দল জাতীয় নির্বাচনে উত্সাহিত হয়েছে। ভেতরে ভেতরে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। কারণ স্থানীয় নির্বাচনের জয়ের ধারা জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনায় তারা আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনকে কারচুপিমুক্ত ও নিরপেক্ষ করার জন্য অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বাস্তবে সমঝোতাহীন রাজনীতি, অমীমাংসিত নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সামগ্রিকভাবে শঙ্কা কাটেনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রাণনাশের আশঙ্কা ও হুমকির কথা তিনিসহ বিভিন্ন মন্ত্রী বার বার উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আগামী তত্ত্বাবধায়কের অধীনে সম্ভাব্য আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা অকপটে প্রকাশ করে জাতিকে সতর্ক করেছেন। বিরোধী দলকেও এ সতর্কবার্তা নিয়ে ভাবতে হবে। আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন, এ বিষয়টি জরুরি বিবেচনা করে। ইতোপূর্বে টাইমস অব ইন্ডিয়া আগামী নির্বাচনের বিষয়ে শঙ্কার কথা বলেছিল। সম্প্রতি দৈনিক আনন্দবাজারও নির্বাচনকালীন সম্ভাব্য শঙ্কা ও সংঘর্ষের কথা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানও আগামী নির্বাচনে শঙ্কা ও সন্ত্রাসের আশংকার কথা বলেছেন। আগামী নির্বাচন হবে না এমন কথা কেউ বলছেন না। তবে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে অমীমাংসার ফলে শঙ্কার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। সরকারি দলের এমপিরা মন্ত্রীদের আর মন্ত্রীরা এমপিদের দোষারোপ করেছেন সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির জন্য। বাস্তবে দুটি রাজনৈতিক জোটই দলকে সংগঠিত করছেন, কর্মী সমাবেশ করছেন এবং নির্বাচনমুখী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর শঙ্কাপূর্ণ উক্তি, বিরোধী নেতা-নেত্রীদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য সৃষ্টি করেছে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও সমঝোতাহীনতার। রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় চালিত করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মান্য করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা আবশ্যক। সংসদে অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগ আর পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে কালক্ষেপণ না করে আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে সাংগঠনিক ও গণতান্ত্রিক ধারা রক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রকাশিত হোক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে। তাহলে গণমনের আশঙ্কা দূর হবে এবং গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়া একটি অপরিহার্য উপাদান হলেও তা গণতন্ত্রের একমাত্র শর্ত নয়। জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়ে সুদীর্ঘ সময় সংসদ বর্জন, জনগণের পক্ষে সঠিক ভূমিকা পালন না করা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতি পালন না করা গণতন্ত্র অনুশীলনের পথে বড় ধরনের অন্তরায়। যারাই বিজয়ী হোন না কেন গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা ও আচরণ নিয়ে জনগণের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। হঠাত্ করে তা হবে না। অশুভ শক্তির অসাংবিধানিক তত্পরতার শঙ্কা দূর করে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক রীতির পক্ষে সরকারি ও বিরোধী দলের সঠিক ও শক্ত অবস্থানই গণতন্ত্রকে অগ্রসর করতে পারে। শুধু ক্ষমতামুখী রাজনীতি আর নির্বাচনে যেনতেনভাবে বিজয়ী হওয়ার সুকৌশল দূর করতে হবে। দেশ হতে সর্বাত্মকভাবে দুর্নীতি দূর করতে জাতীয়ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তাতে সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক তত্পরতা প্রয়োজন। দেশ জনগণের। জনগণের আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও কল্যাণের স্বার্থেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখা জরুরি। কাজেই আগামী সাধারণ নির্বাচন নিয়ে যে অনিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও শঙ্কার ধারণা গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তা দূর করার দায়িত্ব সরকার ও বিরোধী দলের। রাজনীতি হোক দেশোন্নয়ন ও জনকল্যাণের জন্য। ব্যক্তি বা দলের সংকীর্ণ স্বার্থ পেরিয়ে জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য পাক রাজনীতিতে জনগণ তা চায়। নিজেদের রেষারেষি থেকে সৃষ্ট শঙ্কা দূর করতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই অগ্রণী ও সৃজনশীল ভূমিকা রাখতে হবে। যত দ্রুত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ও সদিচ্ছার প্রসার ঘটিয়ে শুভবুদ্ধির উদয় হবে ততই মঙ্গল। লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক ই মেইল :ratantanukc@yahoo.com