নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হইয়া গেল দশম কমনওয়েলথ নারী বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি দেশের মধ্যে ২৭টি দেশ তিনদিনের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উইমেন্স লিডারশিপ ফর এন্টারপ্রাইজ’। নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের বিকাশ, ক্ষমতায়ন, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি ছিল আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। এতদসংক্রান্ত ঢাকা ঘোষণায় নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারজাতকরণে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলির মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক গড়িয়া তোলার কথাও বলা হইয়াছে। বর্তমান সরকার ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী (২০১১-২০১৫) পরিকল্পনায় দেশকে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করিতে অর্থনীতিতে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করে। তাহারই ফলে ২০১৫ সালের আগেই জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করিয়াছি। বিশেষত এখন নারী শিক্ষায় যে সাফল্য পাওয়া যাইতেছে তাহা ধরিয়া রাখিতে হইলে তাহাদের জন্য দরকার ব্যাপক কর্মসংস্থান। আর এ ব্যাপারে একজন নারী শিল্প উদ্যোক্তাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারেন। শিক্ষায় সাফল্যের পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান ব্যাপক বাড়িয়া গিয়াছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসে তাহাদের পদচারণা বৃদ্ধি পাইয়াছে। তাহাছাড়া যে পোশাক শিল্প আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা বর্তমানে তাহার ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী। আবার মাইক্রো ইকোনমির সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বনন্দিত ও নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত। সেই গৌরবেরও বড় অংশীদার আমাদের নারী সমাজ। কৃষি ব্যবস্থায় উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রস্তুতি ও সংরক্ষণ এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক নানা প্রকল্পের উদ্যোগেও তাহাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ে নাই। এখন যে সমস্ত সাহসী নারী শিল্প উদ্যোগের সহিত সম্পৃক্ত আছেন তাহাদের অধিকাংশের খাত হইল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই)-এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রধান খাতগুলি হইল গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ১৬.১ ভাগ, হস্তশিল্প ৬৯.৪ ভাগ, কৃষিশিল্প ৩.২ ভাগ ও খাদ্য ৩.২ ভাগ। নারী শিল্প উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যেই তাহাদের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখিতে শুরু করিয়াছেন। কিন্তু তাহাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। বিশেষ করিয়া এখন ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি কিছুটা সহজ হইলেও উচ্চ সুদের হার, বাজার সংক্রান্ত অপর্যাপ্ত তথ্য, প্রচলিত ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি ও সর্বোপরি পারিবারিক দায়-দায়িত্বের কারণে অনেক সময় তাহাদের শিল্প উদ্যোগে ভাটা পড়িতেছে। তাই শ্রমঘন ও এসএমই খাতে তাহাদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান আরো বাড়াইতে হইবে। তাহাদের এসব উদ্যোগ-আয়োজনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফিরিয়া আসিবে কর্মচাঞ্চল্য। এজন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার যতটা সম্ভব হ্রাস করা, ঋণ প্রদান দ্রুততর করা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, জেন্ডার সংবেদনশীল শর্তাবলী প্রণয়ন ও তহবিল গঠন এবং এসএমই বান্ধব কর, শুল্ক ও ভ্যাট কাঠামো নির্ধারণ ইত্যাদির ব্যাপারে এখন মনোনিবেশ প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে উন্নয়নশীল দেশগুলির দারিদ্র্য বিমোচন কীভাবে সম্ভব সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হইয়াছিল। তাহার জওয়াবে তিনি নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উপর জোর দেন। ইহা জোরদার করিতে হইলে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প স্থাপন ও পরিচালনায় নারীদের অধিক হারে আগাইয়া আসিতে হইবে। এক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন, পুরুষের সহিত নয় বরং পুরুষতান্ত্রিকতার সহিত নারীদের যুদ্ধ করিতে হইবে। আসলে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হইয়াই নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের সামনের দিকে অগ্রসর হইতে হইবে।