রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
‘জাতির রক্তে ফের অনাবিল মমতা আসুক’
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৩, ১৮:৪২
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) মাটির সোঁদা গন্ধ, রমণীর শরীর এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে কবিতা বিনির্মাণে প্রয়াসী হয়েছেন। পরাধীন জীবনের করুণতর পরিণতিতে রক্তপ্লাবনে ভাসতে ভাসতে মৃত্যুর মুহুর্মুহু ধ্বনিতে বাংলাদেশ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল। বাংলাদেশের সূর্যসন্তানেরা অবশেষে উত্তাল রণাঙ্গণে বিজয়কেতন ওড়াতে সক্ষম হয়। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এসব কিছু প্রত্যক্ষ করেছেন। জনজীবনের হতাশা-ক্ষোভ-বঞ্চনা-অপ্রাপ্তি-শোষণ-পীড়ন যূথবদ্ধ হয়েছিল জনচিত্তে। জাতি জয়োল্লাসের ধ্বনিতে সেসব ভুলে স্থিত সময়ের স্বপ্ন দেখেছিল। জাতি ভেবেছিল, রক্তের মধ্যে ঠাসবুননে যে হাজার বছরের অবিশ্বাস ছিল তার সমাপ্তিরেখা হবে স্বাধীনতা সমর। স্বাধীনতা সমরোত্তর বাংলাদেশের মানুষ যখন নবতর স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করে তখন আবারও হতাশার কালো মেঘ গ্রাস করে স্বস্তি, সম্ভাবনাময় সময়কে। কবির বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ করা ক্লেদপূর্ণ ঘটনাপরম্পরা তাঁকে অতিমাত্রায় আহত করে। সংক্ষুব্ধ সময়ের ছবি-প্রতিচ্ছবি তাই তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ হয়েছে। সময়ের অস্থিরতা শব্দ-চরণ-পঙিক্তময় হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর নেতৃত্বের সংকটে পড়েছিল বাংলাদেশ। তখন কবি কবিতায় স্বাধীনতাসময়পূর্ব ও রণাঙ্গণের শত্রুদের নবজন্ম ধরে নিয়ে লিখেছেন, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন।’ (বাতাসে লাশের গন্ধ পাই)
রাজনীতিকে অতিমাত্রায় স্থান দিতে গিয়ে অনেক সময়ে কবিতার শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয়। কাজী নজরুল ইসলামকেও কবিতায় রাজনীতি অতিমাত্রায় প্রয়োগের খেসারত দিতে হয়েছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সত্যতা লক্ষণীয়। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার মধ্যেও তার ছায়া লক্ষ করা যায়।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নিজের কবিতার দর্শন এবং কবিত্ব সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি কবি নই—শব্দ-শ্রমিক/ শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়,/ হূদয়ের কালো বেদনায়। ...ভাষার কিষাণ চোখ মেলে চেয়ে দেখি,/ চারপাশে ঘোর অসম জীবন,/ সভ্য পোশাকে পাশবিক বন।/ সমতার নামে ক্ষমতাকে কোরে রপ্ত,/ আমি জানি/ কারা জীবনে ছড়ায় পুঁজ, পোকা, বিষ তপ্ত—/ জানি আমাদের কারা ধুতুরার ফুলে অন্ধ করেছে অবেলায়,/ ছুঁড়ে দিয়ে গেছে নষ্ট নগ্ন বেদনায়।’ (শব্দ-শ্রমিক)
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সামরিক জান্তার সশস্ত্র শাসনকালে সৃষ্ট সময়যন্ত্রণা পঙিক্তবদ্ধ করেছেন। তাঁর কবিপর্বের বিকাশ-সমাপ্তি অবরুদ্ধ সময়ের প্রতিকূল ক্যানভাসে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকিত কবিকণ্ঠ। কবিতায় তিনি সততা আর সমতাভিত্তিক সমাজের বন্দনা করেছেন, প্রার্থনা করেছেন সুস্থ-সুন্দর জীবনের। কিন্তু, সেই জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করেছে অস্ত্রের শাসন, বিপর্যস্ত মুক্তভাবনার সরল পথ। মৃত্যুর উত্সবে শাসকগোষ্ঠী নিরাপত্তা খুঁজেছে। শাসকবিরোধী কোনো যুক্তিনিষ্ঠ আলাপনও ছিল কণ্টকাকীর্ণ। এসব থেকে মুক্ত জীবনের অন্বেষণে কবির প্রার্থনা, ‘জাতির রক্তে ফের অনাবিল মমতা আসুক/ জাতির রক্তে ফের সুকঠোর সততা আসুক/ আসুক জাতির প্রাণে সমতার সঠিক বাসনা। (হাড়েরও ঘরখানি) অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘আজ আমরা আবার সেই/ বিশ্বাস আর আনন্দকে ফিরে পেতে চাই।/ আজ আমরা আবার সেই/ সাহস আর সরলতাকে ফিরে পেতে চাই।’ (ইশতেহার) কবির প্রার্থিত দেশভাবনার পথে যে অমোঘ শক্তি বাধার পাঁচিল তুলে রেখেছে, সেই শক্তিকেও তিনি চিহ্নিত করেছেন। সকল শোষণ-নির্যাতন-বঞ্চনা-পীড়ন থেকে মুক্ত হওয়ার পথে তিনি সামরকি শাসনকে দেখেছেন অন্তরায় হিসেবে, ‘কিন্তু—/ এই স্বপ্নের জীবনে যাবার পথ আটকে আছে/ সামান্য কিছু মানুষ।/ অস্ত্র আর সেনা ছাউনিগুলো তাদের দখলে।/ সমাজ পরিচালনার নামে তারা এক ভয়ংকর কারাগার/ তৈরি করেছে আমাদের চারপাশে।’ (ইশতেহার)
পতিত পরিণতি থেকে উত্তরণের পথ সন্ধানী কবি আস্থাভাজন কাউকেই দেখতে পান না। সমাজ যেন তল্পিবাহক এবং দাসত্বপ্রবণতায় দূষিত। রাজনীতিবিদরাও যেন ব্যক্তিস্বার্থের কাছে পরাভূত। সংকটকালে বুদ্ধিজীবীরাও যেন দায়িত্ববোধের মধ্যে অনুপস্থিত। ‘হাড়েরও ঘরখানি’ কাবতায় তাই দেখা যায়, ‘বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে/ রাজনীতিকের ধমনি শিরায় সুবিধাবাদের পাপ/ বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে/ বুদ্ধিজীবীর রক্ত স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ/ বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে/ জাতির তরুণ রক্তে পুষেছে নির্বীর্যের সাপ—উদোম জীবন উল্টে রয়েছে মাঠে কাছিমের মতো।’
একাত্তর পূর্ববর্তী পাকিস্তান কালখণ্ডে শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ বিরোধিতা আশার আলোকবার্তা নিয়ে এসেছিল। স্বপ্নের বাংলাদেশে স্বস্তির বীজ রোপণ করার কথা ছিল। জনগণ সামষ্টিক সেই চেষ্টার ঐক্য বিনষ্ট হওয়ায় আশাহত হয়। ক্রমে মানুষ একা হতে থাকে এবং তারা নৈঃসঙ্গ্যদগ্ধ হয়। জাতির এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে সামরিক শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কবি মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সম্পর্কের পরিবর্তে দৈশিক বিষয় নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, ‘পরস্পর দ্যাখা হলে আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি :/ কেমন আছেন ?/ আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না : লাশটা কোথায় গেল ?/ রাজপথে গুলি হচ্ছে কেন?/ পরস্পর দেখা হলে আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি:/ কেমন আছেন?/ আমরা কেন জিজ্ঞাসা করছি না :আন্দোলন কতদূর? হরতালে নিখিল ফাটবে?/ আমরা কেন জিজ্ঞসা করছি না সামরিক না জনতা?/ কোন পক্ষ? ধনি না মানুষ?’ (কুশল সংবাদ)
সামরিক বাহিনীর অবিরত নির্বিচার নির্যাতনে ক্রোধান্বিত হয়েছেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। কবিতায় নগ্নভাবে সেই ক্রোধের বিষ্ফোরণ লক্ষ করা যায়। সামরিক শাসকদের তিনি স্বৈর-সরকারি প্রেসনোট, মধ্যবিত্ত রাজনীতিবিদ, লোভাতুর কুকুর, সামপ্রদায়িক শকুন বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যায়ের ধারাবাহিকতা তাকে এতটাই প্রতিবাদী করে তুলেছিল যে, কোনো কোনো কবিতার প্রতিটি শব্দ হয়েছে আক্ষেপপূর্ণ। সঙ্গীন তাক করা অস্ত্রধারীদের তিনি ভয় পাননি। নির্ভিক কবি যুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করেছেন। কবি শুধু সামরিক বাহিনীকে শকুন বলে গালিই দেননি। এখনো তাদের সুদিন চলছে বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের প্রতিহত করার উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কবিতায়।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সশস্ত্র বাহিনিকে কখনো গালি দিয়েছেন, কখনো বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। ‘সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি’ কবিতায় তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। সেনাবাহিনী যাদের প্রতি রাইফেল তাক করে আছে, যাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে, যাদের দমন করে নিজেদের শোষণযন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে চায় তারা দুটি পক্ষ। শোষক-শোষিত দুটি পক্ষ, পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতাপন্থী দুটি পক্ষ। সেনাবাহিনী যদি একটি পক্ষ হয় তাহলে অন্য পক্ষ হচ্ছে দেশের সাধারণ জনতা। এই সাধারণ জনতার মধ্যে সেনার বাবা-ভাই-স্বজন রয়েছে। তাহলে তারা প্রতিপক্ষ ভেবে যাদের উদ্দেশ্যে গুলি ছুড়ছে, তারা তো অন্য কেউ নয়। নিজেদের স্বজনের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানান। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী দেশ শাসনের জন্য নয়। তারা দেশপ্রহরী। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ‘মানুষের মানচিত্র’ কাব্যগ্রন্থের ২২ নম্বর কবিতার শেষে একটি চরণে বাংলাদেশের সমকালীন বৈরীচিত্র তুলে ধরেছেন, ‘ত্রিশ লক্ষ লাশের উপরে ওই ছিন্নভিন্ন জাতির পতাকা \’ স্বদেশের এই চিত্র পর্যবেক্ষণ করে যে কবিরা শুধু কবিতার নিগড়ে বন্দী রয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি কটাক্ষবাণ নিক্ষেপ করেছেন, ‘মিছিল এগিয়ে যায় মানুষের স্বপ্নের মিছিল,/ তোমরা পেছনে বোসে খুঁড়ে চলো নিজের কবর।/ অক্ষমতাগ্রস্ত কবি, বলো অবশেষে তোমাদের/ “পুরুষরক্ষা সমিতি” ছাড়া কি আর করার আছে??’ (নপুংশক কবিদের প্রতি)
যারাই সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে, সেনানিবাসে গড়ে ওঠা দলের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়েছে, তাদের ওপর নেমে এসেছে সুসজ্জিত মারণাস্ত্র। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সেই খসখসে বাস্তবতার রূপায়ণ করেছেন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ কবিতায়, ‘তার দুটো হাত—/ মুষ্টিবদ্ধ যে হাত মিছিলে পতকার মতো উড়েছে সক্রোধে,/ যে-হাতে সে পোস্টার সেঁটেছে, বিলিয়েছে লিফলেট,/ লোহার হাতুড়ি দিয়ে সেই হাত ভাঙা হলো।/ সেই জীবন্ত হাত, জীবন্ত মানুষের হাত।’ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সমাজের দুটি দিকের প্রতি অত্যন্ত সতর্কদৃষ্টি রেখেছিলেন। এক হচ্ছে সমাজের বৃহত্ যে জনগোষ্ঠী তিন বেলা অন্নের নিশ্চয়তা পায়নি, আর অন্যটি হচ্ছে যারা অন্নের নিশ্চয়তার পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই দুটি দিকের ওপর নিরবচ্ছিন্ন সজাগদৃষ্টি ছিল বলে তিনি সমাজ-রাজনীতি প্রসঙ্গে সচেতন ছিলেন, সরব ছিলেন প্রতিরোধে, প্রতিবাদে। তিনি বলেছেন, ‘শান্তি বাহিনীর বিশেষ প্রযত্নে/ বেঁচে আছে আমাদের আবহমান অন্ধকার।’ (ঘোষণা :১৯৮৪)
কালক্ষেপণ করার মতো যথেষ্ট সময় নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আর ন্যায়ের পক্ষে যাওয়ার আহ্বান করা পথে যারা হাঁটতে চান না, তাদের জন্য অপেক্ষা নিরর্থক। কবি বিবিধভাবে বলার চেষ্টা করেছেন আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী সকলেই কেমন লোভাতুর। অন্যের যন্ত্রণায় তাঁরা কাতর নন। ব্যক্তিপরিমণ্ডলের বাইরে তাঁদের পৃথিবী নেই। তাঁদের দৃষ্টিসীমা নিজের চার দেয়ালবন্দী। সে কারণে ‘মিছিল’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘যে যাবে না সে থাকুক, চলো আমরা এগিয়ে যাই।/ যে-সত্য জেনেছি পুড়ে, রক্ত দিয়ে যে-মন্ত্র শিখেছি,/ আজ সেই মন্ত্রের সপক্ষে নেব দীপ্র হাতিয়ার।/ স্লোগানে কাঁপুক বিশ্ব, চলো, আমরা এগিয়ে যাই।’ মুক্তিযুদ্ধের শক্তি আর সাহসকে সাথে নিয়ে শ্রমের হাত, শিল্পের হাত, সেবার হাত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করতে সশস্ত্র করার আহ্বান জানান তিনি। সমাজব্যবস্থা মানবতা-অনুগামী ছিল না। কবি সেই বিরূপ প্রতিবেশের প্রতিচিত্র সুষম হূদমে তাঁর কবিতায় বিন্যস্ত করেছেন। সদাসচেষ্ট ছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্রের গণমানুষভাবনার বিমুখ প্রচেষ্টার বিপ্রতীপে। এই প্রচেষ্টাকে প্রতিষ্ঠা দিতে রাজনৈতিক অনুষঙ্গ তাঁর কবিতার প্রধানতম অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।