রিমান্ড
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৩, ১৮:৪২
কালো কঠিন মাটির দিকে নুয়ে থাকা ধূসর-নীল আকাশ কালিদাসের গুরুগম্ভীর মেঘের ফাঁক দিয়ে গভীরভাবে দেখতে চেষ্টা করে স্থবির পৃথিবীর কোথাও কিছু ঘটছে কি না। শ্রাবণরাতের এই বেজন্মা অন্ধকারে বিদ্যুত্ না থাকায় সড়কবাতির নিঃসঙ্গ খুঁটিগুলো যখন মনের কষ্ট গোপন রেখে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ, অলক্ষুনে এই সময়ে সাদা মানুষের কালো দাস ধরার নির্মম জালের মতো এক কঠিন ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে অনন্ত। এখন বিদ্যুতের ওই দুঃসহ খুঁটির মতোই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নির্দেশ পালন করে, একটুও নড়াচড়া নেই অযথা, অদ্ভুত এক সিনক্রোনাইজেশান! ঝড়ের বেগে খুব কঠিন একটা থাপ্পড় ডান গাল ঘুরিয়ে দেয় বাঁ দিকে আর ঘরের বাতিটা জ্বলে ওঠে সেই সঙ্গে, যেন বাতির সুইচটা বসানো ছিল ওর গালের ভেতর। নিঃশব্দে কখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে উত্পীড়ক, বুঝতে পারেনি বেচারা, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ঘুরে তাকায় সামনে, মাথা ঝিমঝিম করে। কঠিন ওই কণ্ঠ জিজ্ঞেস করে, কেমন আছেন? কী জবাব হতে পারে! চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে অনন্ত। বসুন। পেছন ফিরে দেখে সত্যিই একটা চেয়ার রয়েছে পেছনে। ভোজবাজির মতো মনে হয় এসব। বসার সঙ্গে সঙ্গে ডান গালের থাপ্পড়টা আর সামলাতে পারে না, চেয়ারশুদ্ধ উল্টে পড়ে। দুঃখিত। চেয়ারটা সোজা করে বসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনন্ত, আরেকটা থাপ্পড় নেওয়ার সাহস হয় না। বসুন, কিছু মনে করবেন না, অতিথি আপ্যায়নের ধরনটা একটু ভিন্ন আমাদের। বসে পড়ে অনন্ত।
লিওনার্দোর নাম শুনেছেন মি. অনন্ত, আই মিন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি?
শুনেছি।
কী করতেন তিনি?
ছবি আঁকতেন।
ওটা তো প্রাইমারি স্কুলের একটা ছাত্রও জানে। আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয় অতিক্রম করেছেন।
আর কী করতেন ভিঞ্চি, ভেবে মনে করতে পারে না অনন্ত।
উঠে দাঁড়ান সোজা হয়ে।
উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ডান গালে আবার থাপ্পড়, ওই একই রকম, প্রচণ্ড বেগে। একটু অবাক হয় অনন্ত, থাপ্পড়টা মারছে কে! সামনের মানুষটাকে মনে হয় একটা রোবট, একেবারে নড়াচড়া নেই।
বসুন।
বসার সঙ্গে সঙ্গে বাঁ গালে, আবার চেয়ারসহ উল্টে পড়া। এবার নিজে নিজেই উঠে বসে অনন্ত, চেয়ার ঠিক করে।
এই তো, ইউজড টু হয়ে উঠছেন, ধন্যবাদ। লিওনার্দো ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, ভাস্কর্যনির্মাতা, সুরকার ও সংগীতস্রষ্টা, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, স্থপতি, আবিষ্কারক, উদ্ভাবক, ভূ-মানচিত্রবিদ্যাবিশারদ, ভূ-তাত্ত্বিক, অঙ্কশাস্ত্রজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যাবিশারদ, শরীরবিদ্যাবিশারদ এবং একজন লেখক এবং আরও কত কী, আমি জানি না। আপনি জানেন?
না।
আপনি তো একজন লেখক, বলুন দেখি, কী লিখেছিলেন তিনি?
মাথা ঘুরছে বোঁ বোঁ করে, এ মুহূর্তে এসব জিজ্ঞেস করার অর্থ কী, বাবার নাম মনে আছে কি না, ভাবতে চেষ্টা করে অনন্ত। কিছুটা কোমল হয় রোবটের কণ্ঠ।
লিওনার্দোর ছিল পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানভাবনা, পাখির মতো আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি, বিমানের মডেল গড়েছিলেন, গতি চেয়েছিলেন, সাইকেলের মডেল বানিয়েছিলেন—এ রকম অসংখ্য যন্ত্রের প্রাথমিক ধারণা মানবসমাজকে দিয়েছিলেন তিনি। যাহোক, ভিঞ্চির দু-একটা ছবির নাম মনে করতে পারেন?
মস্তিষ্ক এখন পুরোপুরি অচল, এত বিখ্যাত ‘মোনালিসা’ও মনে আসে না, এমনকি ‘দ্য লাস্ট সাপার’ও না! চুপ করে থাকাও বিপজ্জনক মনে হয়।
ঠিক আছে, ক্ল্যু দিই। আপনার জীবনে কোনো রহস্যময়ীর দেখা দেয়নি কখনো?
চোখ তুলে তাকায় অনন্ত, কী জবাব দেবে এর!
হাসি মনে করতে পারেন ওর?
আস্তে আস্তে বলে সে—
মোনালিসা।
এই তো, মস্তিষ্কটা চালাতে শুরু করেছেন, দয়া করে থামাবেন না এটা। ঠিক আছে, লিওনার্দো হয়তো অনেক দূরের শিল্পী, খুব শীঘ্র ওখানে পৌঁছাতে পারছেন না, বাই দ্য বাই, লিওনার্দোর দেশটা যেন কোথায়?
ইতালি।
হ্যাঁ, ওটা আমাদের জন্য এ মুহূর্তে অনেক দূরে। ওই গতি এখনো অর্জন করতে পারিনি আমরা। ঘরে থাকা যাক বরং। সুলতানের বিষয়ে দু-একটা কথা বলা যেতে পারে মনে হয়, কী বলেন?
এসএম সুলতান।
হ্যাঁ, এসএম সুলতান, দুঃখিত, পুরো নামটা না বলায়, তিনি আমারও প্রিয় শিল্পী।
একটু অবাক হয় অনন্ত, সামনের ওই রোবটটাকে মনে হয় একটা পিশাচ, কোনো শিল্পকর্ম কীভাবে প্রিয় হতে পারে ওর!
এসএম সুলতানের দু-একটা ছবির নাম বলবেন?
কপালে ভাঁজ ধরে অনন্তর। এসএম সুলতানের অনেক ছবি দেখেছে, ওগুলোর অনেক কপি ওর সংগ্রহে আছে, কিন্তু কোনোটার নামই এখন মনে করতে পারে না!
বিষয়টা হয়তো বুঝতে পারে রোবট।
ঠিক আছে, বাদ দিন, একটা নাম বলতে পারব না আমিও। ওর ছবির বিশেষত্ব কী?
পরিপুষ্ট একটা শ্রমজীবী শ্রেণী।
বিয়ে করেননি কেন তিনি?
এটার কোনো জবাব হতে পারে! বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে হয় না, দড়াম করে পেছনে উল্টে পড়ে চেয়ারটা, পিঠে ও ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা, পতন রোধ করার জন্য কখন হাত বাড়িয়েছিল বুঝতে পারেনি, হাতের তালুর একটা পাশ ও বুড়ো আঙুল থেতলে গেছে ভীষণভাবে, ব্যথায় দম বন্ধ হয়ে আসে, ওঠার চেষ্টা করে চেয়ারটা থেকে একটু সরে আসে, প্রচণ্ড একটা লাথি পেছনটা নিঃসাড় করে দেয়, উঠে দাঁড়ায়, চেয়ারটাকেও সোজা করে বসায়, লোকটা তখনো সামনের চেয়ারে নির্বিকার বসে আছে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করে আর কেউ আছে কি না, সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ঘুসি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে। বুঝতে পারে, বরং যত নির্বিকার থাকা যায়, আঘাত হয়তো কম আসবে তত, কোনো কিছু বোঝার চেষ্টা করলেই বিপদ, উঠে দাঁড়ায় সোজা হয়ে।
বসুন।
মাথা নিচু করে বসে অনন্ত, নাক দিয়ে রক্ত ঝরে শার্টটা ভিজে গেছে, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
বলুন এবার গত হপ্তায় ঝিনাইদহ ছেড়ে গেছিলেন কেন?
ঝিনাইদহই ছিলাম।
আমাকে নিষ্ঠুর হতে বলেন?
নিষ্ঠুরতার বাকি আছে কী, বুঝতে পারে না অনন্ত।
যা জানতে চাই, আশা করি সেসব বলবেন আমার কাছে। কথা দিচ্ছি, একজন ভালো বন্ধুর মতো আচরণ করব আপনার সঙ্গে। আমার মনে হয় আমি ব্যর্থ হলে পরে যে আসবে তাকে পছন্দ না-ও হতে পারে আপনার।
মনে মনে ভয় পায় অনন্ত, বন্ধুর আচরণেরই যদি এই অবস্থা, বন্ধুর চেয়ে বেশি কেমন হতে পারে তাহলে! কিন্তু সে যা জানে না, তার জবাব দিবে কী করে?
বলুন অনন্ত সাহেব... একটু থেমে বলে, অনন্তর সঙ্গে বাবু শব্দটা যায় ভালো, আপনি তো আবার... যাহোক, নামটা আপনার ভালোই, তা অনন্ত সারোয়ার না হয়ে সরোবর হলে বোধহয় আরেকটু ভালো হতো। আপনার বাবা একজন বিচক্ষণ মানুষ, নামটা কি তিনিই রেখেছিলেন, না পরে আরও সংশোধন করেছেন আপনি?
মুখ তোলে অনন্ত, ওর দিকে তাকাতে সাহস পায় না।
যাকগে ওসব, বলুন ওই সপ্তাহটা ছিলেন কোথায়?
ঝিনাইদহে, আমাদের বাসায়। অসুখ করেছিল আমার, জ্বর।
বাহ, খুবই সত্যি। জ্বর সারানোর জন্য সুলতানের, দুঃখিত, এসএম সুলতানের নৌকোয় গেছিলেন?
ওখানে যাইনি আমি।
আচ্ছা যাননি। গত পরশু যে আপনাদের বিপক্ষ দলের এগারো জন খুন হলো, ওটার পরিকল্পনা কোথায় হয়েছিল?
আমি তো কোনো পক্ষেই নেই।
তাহলে ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে এসে বসে আছেন এমনি এমনি!
ঝিনাইদহে আমার বাড়ি, বছরে দু-একবার আসি।
তাহলে এবার এসেছিলেন জ্বর উপভোগ করতে।
চুপ করে থাকে অনন্ত।
কিছু বলবেন না আমার কাছে, আপনার সিদ্ধান্তটা কি এ রকমই?
এরপর আর কোনো কথা শুনতে পায় না অনন্ত। শুধু অদৃশ্য হাতের মার খেতে থাকে, যে পর্যন্ত না অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এভাবে তিন দিন চলার পর শুরু হয় লাইট ট্রিটমেন্ট। এটা নাকি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা। হাত-পা বেঁধে চিত্ করে শুইয়ে চোখের ওপর তীব্র আলোর ফলা বিদ্ধ করতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন। প্রকৃতির ডাকে যে বিরতিটুকু পাওয়া যায়, তা-ও মনে থাকে না এমনকি। মস্তিষ্ক থাকে একটা দূরন্ত ঘূর্ণির ভেতর, শুধু স্নায়ুগুলো ঝলসাতে থাকে গনগনে আগুনে, শরীরে কোনো সাড়া থাকে না, অবসাদে শরীর চায় ঘুমোতে, কিন্তু জাগিয়ে রাখে স্নায়ু, শরীরের ভেতর রক্ত জ্বলতে থাকে এসিডের মতো। এটা থেকে পরিত্রাণ চায় অনন্ত। সবকিছুই স্বীকার করতে চায়, সবকিছুতেই হ্যাঁ বলতে চায়, কিন্তু সে যা জানে না, তা বলবে কী করে? আশ্চর্য এই গোলকধাঁধার ভেতর নেই তো সে!
মনে হয় অনেক দূর থেকে ভেসে আসে প্রশ্নগুলো... লিওনার্দো... এসএম সুলতান... খুনখারাবি... ঠিক ঠিক জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে অনন্ত—
লিওনার্দো ছিলেন রেনেসাঁ-মানব... একজন বহুবর্ণিল শিল্পী, বহুস্তরবিশিষ্ট দশদিগন্তপ্রসারী এক অতিমানব... অদ্বিতীয় চিত্রশিল্পী, তাঁর ‘দ্য লাস্ট সাপার’ হচ্ছে ধর্মীয় মিথ পুনর্নির্মাণে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্প... মোনালিসা হচ্ছে সর্বযুগের রহস্যময়ী এক নারী... অসাধারণ এক বিজ্ঞানী ছিলেন লিওনার্দো... সৌরশক্তি, ক্যালকুলেটর, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লেইট
টেকটোনিকস... অনেক কিছুই লিখিতভাবে প্রকাশ করেন তিনি...
এভাবে একের পর এক বলে যেতে থাকে অনন্ত। ওরা উত্সাহ দেয়, আর বলে যেতে থাকে অনন্ত, যখন আর কিছু মনে করতে পারে না, বলে—
এবার একটু ঘুমোতে দেন আমাকে।
নিশ্চয়ই। আরেকটু সহায়তা দিন আমাদের।
হ্যাঁ, এসএম সুলতান ছিলেন একজন প্রকৃতিপ্রেমিক, ইউরোপের চাকচিক্য ছেড়ে এসে গ্রামের নিভৃত সবুজ নিসর্গের ভেতর সঁপে দিয়েছিলেন নিজেকে... তাঁর কাছে পৃথিবীর সেরা নদী ছিল চিত্রা, আর শিশুরা ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়... ওদের নিয়ে নৌকোয় ঘুরে বেড়াতেন চিত্রার বুকে... ছবি আঁকা শেখাতেন, তাঁর আশা ছিল এই সব শিশুরা বড় হয়ে একদিন এই দুঃখিনী বাংলার ছবি আঁকবে... মানুষের কাছে প্রকৃত সত্য তুলে ধরবে...
আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে অনন্ত। পরীক্ষা করে ডাক্তার বলে, ওর হার্টটা সত্যি দুর্বল, আপাতত অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে ওকে। এ রকম একটা বাজে পরামর্শ কোনোভাবে পছন্দ হতে পারে না ওদের। শিরার ভেতর ইঞ্জেকশন পুশ করে চেতনা ফিরিয়ে আনে আবার। ঠোঁট নড়ে ওঠে অনন্তর—
ঘুম... ঘুম... এস এম...
এই তো, এই তো, অনন্ত সাহেব, বলুন, বলুন, সব ঠিকঠাক বলছেন অনন্ত সাহেব। বলুন গত হপ্তায় কোথায় ছিলেন, বলুন।
প্রাণপণে ওটা মনে করার চেষ্টা করে অনন্ত, হালকা একটা সুতোর মতো স্মৃতি এসে ধরা দেয় স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে, প্রচণ্ড চিত্কার দিয়ে বলার চেষ্টা করে সে, অথচ শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করেও উচ্চারণ করতে পারে না শব্দটা। চোখের সামনে জ্বলে থাকা ওই কুিসত আলোটা কেঁপে ওঠে, অন্তর থেকে ইথারে মিলিয়ে যায় ছোট্ট একটা শব্দতরঙ্গ। শরীর ও মস্তিষ্ক, দুটোই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই রিমান্ডের কোনো আইনগত ভিত্তি আছে কি, যদি থাকে এটা কাদের গড়া আইন? মুহূর্তের জন্য প্রশ্নটা মাথায় এসেই মিলিয়ে যায়, শরীরের অবশিষ্ট শক্তি কণ্ঠে জড়ো করে জবাব দেয় অনন্ত—
রিমান্ডে।
সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায় না-বাস্তব না-ভৌতিক না-অলৌকিক ওই আলোটা।