প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় ফোকলোর

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয়ফলক

ফোকলোর যেকোনো জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তাই বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশে ফোকলোরের গুরুত্ব ক্রমেই স্বীকৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও ফোকলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশ্বায়নের এ যুগে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি, লোকনাট্য, লোকনৃত্য, পালাগান, লোকক্রীড়া প্রভৃতি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার মাধ্যমে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বসভায় মর্যাদার আসন পেতে পারি ইংরেজি Folk শব্দের অর্থ সাধারণ লোক, আর lore শব্দের অর্থ ঐতিহ্যিক জ্ঞান বা সংস্কৃতি। এদিক থেকে Folklore-কে বলা যায় লোকজ্ঞান বা লোকসংস্কৃতি। ফোকলোর একদিকে লোকজীবনের সকল অভিব্যক্তি, প্রকাশ ও সৃষ্টি বোঝায়, অন্যদিকে সেসব বিষয়ক জ্ঞানচর্চাকে বোঝায়। ফোকলোর আমাদের নিজেদের ও অন্যদের বুঝতে সহায়তা করে। ফোকলোরের মাধ্যমে মানুষ একে-অপরকে শিক্ষা ও আনন্দ দিয়ে থাকে। ফোকলোর বলতে বোঝায় কথকতা, প্রবাদ-প্রবচন, কৌতুক, ধাঁধা, কাহিনি, গান ইত্যাদির মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাব-বিনিময়। নানা কারণে বাংলার লোকসংস্কৃতি বা ফোকলোর এখনও আমাদের বিমোহিত করে থাকে। তাতে ফুটে ওঠে আমাদের অতীত ইতিহাসের নানা দিক, আমাদের জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ, জাতিসত্তার পরিচয়। ফোকলোর আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয়ফলক। জাতিসত্তার পরিচয় সন্ধান, আধুনিক বিশ্বের কাছে দেশ-জাতির পরিচয় তুলে ধরা এবং সমাজ, সংস্কৃতি, পর্যটন, গণমাধ্যম ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমেই তাই ফোকলোরের গুরুত্ব ও তাত্পর্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিশ্বে ফোকলোর বিদ্যায়তনিকভাবে চর্চার আওতায় এসেছে। ফোকলোর আজ বিদ্যাচর্চার বহুমাত্রিক শাখায় বিস্তৃত। সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, বাণিজ্য, শিল্পকলা, সাংবাদিকতা, নাট্যকলা, জাদুঘরবিদ্যা, নগরপরিকল্পনা—ইত্যাদি নানা বিদ্যাশাখার সঙ্গে ফোকলোরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে ফোকলোরের বিশ্লেষণধর্মী ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা নতুন মাত্রা পেয়েছে। উন্মুক্ত হয়েছে এ সংক্রান্ত নানা গবেষণার নতুন নতুন দিগন্ত। ফোকলোরের বিভিন্ন উপাদান মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করে তার সমাজ-উন্নয়নভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণ গুরুত্ব পাচ্ছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ইতিহাস পুনর্গঠন, মানবিক মূল্যবোধ অর্জন, সামাজিক-উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিল্পচৈতন্য সৃষ্টি, নগর পরিকল্পনা, বাণিজ্যিক প্রচারণা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফোকলোরের ভূমিকা ও গুরুত্ব নিরূপণ করা হচ্ছে। ফোকলোরচর্চা এখন কেবল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সংকলনের মধ্যে সীমিত নয়, নানা বিদ্যাশাখায় ফোকলোরের তাত্পর্য, ভূমিকা ইত্যাদি অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্ব দাবি করছে। একুশ শতকে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উত্কর্ষের প্রেক্ষাপটে ফোকলোরচর্চা পেয়েছে নতুন মাত্রা। একদিকে ফোকলোরের নানা উপাদান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে দেখা দিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফোকলোরের উপাদান সংরক্ষণ, সম্প্রচলনের নতুন সম্ভাবনা। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে ফোকলোরের নানা উপাদানের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পত্র-পত্রিকা, বেতার-টেলিভিশন, চলচ্চিত্র প্রভৃতি গণমাধ্যমে লোকসমাজের কাছাকাছি পৌঁছানোর উপায় হিসেবে ফোকলোরের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে এগুলির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তরণ, জাতীয় চেতনার বিকাশ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্যিক প্রচারণা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ফোকলোরের উপাদান ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে। এ ছাড়া নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমায় ফোকলোর তথা আমাদের দেশজ সংস্কৃতির অধিকতর ব্যবহার গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে অধিকতর ফলপ্রসূ বিবেচিত হচ্ছে। ফোকলোর যেকোনো জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তাই বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশে ফোকলোরের গুরুত্ব ক্রমেই স্বীকৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও ফোকলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশ্বায়নের এ যুগে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি, লোকনাট্য, লোকনৃত্য, পালাগান, লোকক্রীড়া প্রভৃতি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার মাধ্যমে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বসভায় মর্যাদার আসন পেতে পারি। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় শ্রেণীকক্ষে ফোকলোর পাঠ ও ব্যবহারের উপযোগিতা। নিঃসন্দেহে নানা দিক থেকে শ্রেণীকক্ষে ফোকলোর ব্যবহারের গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কেবল নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে যথেষ্ট উপকৃত হয় না, নানা অঞ্চলের নানা দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান বাড়ে। বাংলার রয়েছে এক শক্তিশালী মৌখিক সাহিত্যের ঐতিহ্য। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বড়দের কাছে নানা ধরনের লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, কিংবদন্তি ইত্যাদি শোনে। এভাবে বাঙালির সমাজজীবনে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে লোকজ্ঞান সম্প্রচলিত হয় লোককাহিনি ও প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদির মাধ্যমে। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা মৌখিক ঐতিহ্যের সংস্পর্শে আসে। এ ক্ষেত্রে লোকজ্ঞান প্রবীণ প্রজন্মের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের কাছে সম্প্রচলিত হয়। যেমন :বয়স্ক প্রজন্মের আত্মীয়-স্বজন গল্প ও প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে পরিবারের তরুণ সদস্যদের পারিবারিক ভূমিকা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন করে থাকেন। এ ছাড়া কোনো কোনো শিক্ষার্থী শিশুতোষ লোককাহিনির বই পড়ার সুযোগ পায়। ক্লাসে সেগুলো বলার সুযোগ দেওয়া হলে ফোকলোর সম্পর্কে অন্য শিক্ষার্থীদের জানার দিগন্ত আরও বিস্তৃত হতে পারে। শিক্ষার্থীরা তাদের বাবা-মা ও পারিবারিক পরিবেশ থেকে যে সাংস্কৃতিক জ্ঞানের অধিকারী হয়, শিক্ষক তা নানাভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পান। বাংলার লোকসংস্কৃতি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের শিখন-প্রক্রিয়াকে আরও আনন্দময় করে তুলতে পারেন শিক্ষক। শ্রেণীকক্ষে ফোকলোর শোনা ও আলোচনা করা শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তা নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীকে সচেতন করে, তার জ্ঞানের ভান্ডার বৃদ্ধি করে। এর মাধ্যমে ফোকলোর সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। ভিনদেশি সংস্কৃতি সম্পর্কেও তাদের আগ্রহ বাড়ে। তারা নতুন নতুন গল্প শোনায় আগ্রহী হয়। শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে যে, তারা মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করছে। আমাদের দেশে প্রচলিত লোককাহিনিগুলো শত শত বছর ধরে মানুষকে বিমোহিত করে আসছে। দীর্ঘকাল ধরে তা ছিল বিনোদনের মাধ্যম। এখনও মানুষ লোককাহিনি শুনে আনন্দ পেয়ে থাকে। শিশুরাও লোককাহিনি শুনতে, পড়তে ও বলতে ভালোবাসে। বিশেষ করে যেসব গল্পে পশুপাখিদের কথা আছে সেগুলোই তারা পছন্দ করে সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া যেসব গল্পে মজাদার চরিত্র থাকে সেগুলোও তাদের মন কাড়ে। সে কাহিনি দেশের না দেশের বাইরের, তা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। এগুলো কেবল শিশু মনের খোরাক জোগায় না, এগুলোর মাধ্যমে শিশু-কিশোররা নানা কিছু শেখারও সুযোগ পায়। তারা অনেক ক্ষেত্রেই কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে ফারাক করতে পারে। কাহিনির মধ্যে নিহিত মর্মবস্তুও তারা অনেকটা বুঝতে পারে। রাক্ষস-খোক্কসদের হাত থেকে রাজকন্যাকে উদ্ধার করার কাহিনি শিশুমনে অন্যের কল্যাণের জন্যে বিপদ ও ঝুঁকি মোকাবেলার প্রেরণা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তাদের মনে সামাজিক দায়িত্ববোধের বীজ এভাবেই অঙ্কুরিত হয়। সুখু-দুখু কিংবা সুয়োরাণী-দুয়োরাণীর গল্প তাদের মনে জাগিয়ে দেয় ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়বোধ। শিষ্টের জয়, দুষ্টের পরাজয় এই বাণী ঠাঁই করে নেয় তাদের অন্তরে। এ ছাড়া লোককাহিনি আরও একটি কাজ করে। তা সেকালে সাধারণ মানুষের জীবনধারা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়। আন্তবিদ্যা অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও লোককাহিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। লোককাহিনি পড়ে, বিভিন্ন উত্স থেকে লোককাহিনি শুনে বা দেখে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ধারণা বাড়ে। নিজেদের অতীত সম্পর্কে তাদের জানার দিগন্ত প্রসারিত হয়। নিজেদের পূর্বপুরুষ এবং নিজেদের এলাকার লোককথার সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে। তারা তাদের নিজেদের ও সহপাঠীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কেও জানতে পারে। ফোকলোরের সঙ্গে বিশেষ যোগ রয়েছে সামাজিক বিজ্ঞানের। লোককাহিনিটির উদ্ভব কোন কালে ঘটেছে তা জানার মাধ্যমে সেই কালের মানুষের জীবনধারা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। আফ্রিকা বা রুশ দেশের লোককাহিনি পাঠনপাঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর ভৌগোলিক জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করা যায়। মানচিত্র দেখিয়ে তাদের ভূ-মণ্ডলে সেসব দেশের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেওয়া চলে। নিজেদের দেশ থেকে সেসব দেশে যাওয়ার পথ সম্পর্কে জানানো যায়। সেসব দেশের মানচিত্র আঁকায় উত্সাহিত করা যায় তাদের। এ সব পরোক্ষভাবে তাদের ভবিষ্যত্ গবেষণা-দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষক সহজেই লোককাহিনিতে বর্ণিত চরিত্র ও পরিবেশ-বর্ণনার আলোকে শিক্ষার্থীর মনে জীবপরিবেশগত ও ভৌগোলিক ধারণার উদ্ভাসন ঘটানোর সুযোগ নিতে পারেন। কোন চরিত্র কোন ভৌগোলিক পরিবেশে থাকেত, তার একটা মানসিক এবং কিছুটা ভৌগোলিক ছবি তাদের কাছে তিনি তুলে ধরতে পারেন। এভাবে বিভিন্ন লোককাহিনির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করা সম্ভব হয়। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক দিক ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তুলনা করার সুযোগও তারা পায়। সেসব দেশের আবহাওয়ার বিবরণ, উদ্ভিদজীবন ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হলে তার মাধ্যমে তাদের বিজ্ঞানবোধ ও পরিবেশ-সচেতনতা জাগিয়ে তোলা যায়। প্রসঙ্গত, পরিবেশ সংরক্ষণে লোকজ্ঞানও যে কখনো কখনো সহায়ক হয়, তা বিবেচনায় রাখা দরকার। সাম্প্রতিক কালে এই আলোচনা হচ্ছে যে, ফোকলোর এবং ঐতিহ্যিক পরিবেশগত জ্ঞান জীবপরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফোকলোরের সঙ্গে ঐতিহ্যগত জীবপরিবেশগত জ্ঞানের রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ঐতিহ্যগতভাবে জীবপরিবেশগত জ্ঞান হচ্ছে প্রকৃতিতে একটি জীবসত্তার সঙ্গে অন্য জীবসত্তার সম্পর্ক এবং পরিবেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কজনিত জ্ঞান। দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা লোকবিশ্বাস ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপ পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। যেমন ভারতের মেঘালয়ের অধিবাসীরা বিশ্বাস করে, তাদের বনাঞ্চলগুলোতে নানা দেব-দেবী অবস্থান করেন। যদি কোনো গাছ কাটা হয় তবে তাতে দেব-দেবী অসন্তুষ্ট হন এবং এর ফলে লোকালয়ে বিপর্যয় নেমে আসে। এই লোকবিশ্বাসের কারণে সেখানে অরণ্য নিধন হয় না। এর ফলে সেখানকার বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে এ ধরনের লোকবিশ্বাস যেখানে নেই সেখানে চলছে অরণ্য নিধন। বর্তমান বিশ্বে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রাবল্যে অহংবোধ হয়ে উঠছে প্রধান। আত্মস্বার্থপরায়ণতা ছাপিয়ে উঠছে সমষ্টিচেতনাকে। ব্যক্তি-আক্রান্ত হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবোধে। এই বিচ্ছিন্নতার বোধ সৃষ্টি করেছে অনেক সমস্যার। এদিক থেকে ফোকলোর পঠন-পাঠনে শিক্ষার্থীর মনে সমষ্টিচেতনার উজ্জীবন ঘটায়। ফোকলোর সমষ্টিচেতনার ফসল। আদিম কাল থেকেই মানুষ সমষ্টিগত জীবনধারার অন্তর্গত। তার অস্তিত্বও সমষ্টিচেতনার ওপর নির্ভরশীল। এই সমষ্টিচেতনা কেবল মানুষকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি, হয়েছে প্রকৃতিকে ঘিরেও। আদিম কাল থেকেই মানুষ সুদীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায় এই লোকজ্ঞানে উপনীত হয়েছে যে, মানুষের অস্তিত্বের জন্য প্রাণীজগত্, গাছপালা, জলাশয় ইত্যাদির সঙ্গ অপরিহার্য। কিন্তু আধুনিক নগরসভ্যতা মানুষকে করছে প্রাকৃতিক জগত্ থেকে বিচ্ছিন্ন। এর ফলে মানুষ ভুগছে এক ধরনের অসুস্থতায়। অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতাজনিত অসুস্থতা নিরাময়ের জন্য পরিবেশ মনোবিজ্ঞানীরা তাই প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। মানুষ যখন বুঝতে পারে, প্রাকৃতিক জগতে উদ্ভিদ ও প্রাণী, আকাশ ও মাটি, বাতাস ও পানি মানব-অস্তিত্বের অপরিহার্য অংশ, তখন তারা এগুলো সংরক্ষণে এগিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে লোকঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস-নিষেধ ইত্যাদি অনুযায়ী তারা কেনো না কোনো পদক্ষেপ নেয়। এদিক থেকে জীবপরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি লালনে লোকবিশ্বাস ও লোকজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিশুশিক্ষায় লোকসংস্কৃতির পঠনপাঠন এ ধরনের জ্ঞানের সঞ্চারে সহায়ক হতে পারে। শিশুদের গণিত শেখার ক্ষেত্রেও লোককাহিনি পরোক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে। কোনো বিশেষ শব্দ, কতবার কাহিনিতে ফিরে ফিরে এসেছে, কিংবা কাহিনিতে মোট কতটি চরিত্র আছে—এসব তাকে গুণতে শেখায় আগ্রহী করে। লোককাহিনিতে বর্ণিত গ্রামের মুরাল তৈরি বা গ্রামের ছবি আঁকার পাঠ শিশুর শিল্পবোধ ও শৈল্পিক সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর যে লোকশিল্পের জন্ম হয়েছে এমন নয়, লোকশিল্প আসলে মানবপ্রজাতির সৃজনশীলতা ও ভাববিনিময়ের সঙ্গে অপরিহার্যভাবে যুক্ত। তাই জনশিক্ষায় শিল্পকলা শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। লোককাহিনিগুলিতে সাধারণত কোনো না কোনো মর্মবাণী বা মূল্যবোধের দিক থাকে। শিশু-কিশোরদের জীবন গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বস্তুত মানুষের উত্কর্ষময় জীবনবোধের সঙ্গে নৈতিকতার রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। প্রাণিজগতের সদস্য হলেও মানুষকে করতে হয় মনুষ্যত্বের সাধনা। সেই সাধনায় সাফল্য অর্জন করতে হলে মানুষকে নৈতিক শক্তির নানা গুণে বলীয়ান হতে হয়। তাকে অর্জন করতে হয় ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত বিচার করার শক্তি। এই নৈতিক মূল্যবোধের আশ্রয়েই সার্থক হয় মানবজীবন। আধুনিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য তাই শিশুদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। এ ক্ষেত্রে ফোকলোর পঠন-পাঠন শিশু-কিশোরদের নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনে বিশেষ সহায়ক বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। লোককাহিনির মাধ্যমে তাদের মনে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা জন্মায়। লোককাহিনি থেকে তারা শেখে যে পরিশ্রমী মানুষ জীবনে সফল হয়, অলস লোকের জীবনে সুখ আসে না। তারা আরও শেখে, দয়া, অধ্যবসায়, সাহস মানুষকে বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। লোককাহিনি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে সৃজনশীল রচনার আগ্রহ তৈরি হয়। তাদের মধ্যে নিজে নিজে গল্প তৈরি ও গল্প বলার ঝোঁক জাগে। আধুনিক কালের জীবন ও পরিবেশের আলোকে তারা নতুন ধরনের কাল্পনিক ও দুঃসাহসিক অভিযানমূলক গল্প লেখায় উত্সাহিত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রচলিত অসংখ্য কৌতুক কাহিনিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেকালের লোকসমাজের বুদ্ধিদীপ্ত নানা ভাবনা ও জ্ঞানের বৈচিত্র্যময় পরিচয়। প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা ইত্যাদিও বাংলার লোকসমাজের জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর বহন করছে। কৃষিকাজে, খাদ্যাভাসে, স্বাস্থ্যরক্ষায়, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ডাক ও খনার বচন এখনও আমাদের সাহায্য করছে। প্রবাদ-প্রবচন মানুষের দীর্ঘ জীবন-অভিজ্ঞতার সারাত্সারেরই বাণীরূপ। বাংলার কৃষকসমাজ দীর্ঘকাল ধরে কৃষিব্যবস্থা সম্পর্কিত জ্ঞানে আলোকিত হয়েছে খনার বচনের মাধ্যমে। যেমন :‘ রুয়ে কলা না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।’ জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে ফোকলোর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। ফোকলোর থেকে মানুষ এই শিক্ষাই পেতে পারে যে প্রতিটি মানুষই লোকসমাজের সদস্য। এবং প্রত্যেককেই দেশ ও বিশ্বের জন্যে অবদান রাখতে হয়। ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, গ্রন্থাগার, জাদুঘর, পর্যটন, সৃজনশীল লেখালেখি এমনকি পারিবারিক ইতিহাস রচনায় ফোকলোরের উপাদান কাজে লাগে। ঐতিহাসিকরা অতীতকে ব্যখ্যা করার জন্য প্রামাণিক তথ্যকে অপরিহার্য গণ্য করেন। তাতে থাকে নাম, ঘটনা ও তারিখের সমাহার। ফোকলোরে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ইত্যাদির অনুপুঙ্খ বর্ণনা। লোকসংস্কৃতিবিদরা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকেন দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ইত্যাদির ওপর। এখন এসব বিষয়ও ইতিহাসে গুরুত্ব পাচ্ছে। সেদিক থেকে ঐতিহাসিকদের ঐতিহাসিক বিবরণ প্রণয়নে ফোকলোর সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ফোকলোর ধর্মনিরপেক্ষতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারণ চরিত্রগত এবং গঠনগত দিক থেকে ফোকলোর অসাম্প্রদায়িক। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই লোককাহিনিগুলো আগ্রহ নিয়ে শুনতে, দেখতে, পড়তে ও বলতে পারে। লোককাহিনিতে মূর্খ ব্রাহ্মণকে নিয়ে কৌতুক ও ব্যঙ্গের ভেতর দিয়ে সমাজে জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে লোকসমাজের প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। প্রাচীন কালে নিরক্ষর সমাজ এসব লোকগল্প ও প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদির মাধ্যমে পুরাণ, আচার-অনুষ্ঠান, ইতিহাস ও অন্যান্য তথ্য কেবল সংরক্ষণ করেনি, সেগুলোকে বিস্মৃতির হাত থেকেও রক্ষা করেছে। এই কারণে ফোকলোর অধ্যয়নের মাধ্যমে সংস্কৃতিকে কেবল জানা যায় না, অনেক ভেতর থেকে জানা যায়। ফোকলোর অধ্যয়ন শিক্ষার্থীদের নানা দেশের নানা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারে, বিশ্বের সব মানুষের চাহিদা অভিন্ন। সব দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, মমতা. প্রীতি, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নিরাপত্তার বোধ। তাদের সবার মধ্যে রয়েছে সুখ, অহঙ্কার, ক্রোধ, নিঃসঙ্গতা ইত্যাদি অনুভূতি। লোককাহিনিতে নানাভাবে এসব চাহিদা ও অনুভূতির কথা ব্যক্ত হয়। বর্তমান বিশ্বে সংস্কৃতির বহুত্ব সত্ত্বেও মানুষ ক্রমেই একে-অন্যের কাছাকাছি আসতে চাইছে। তাদের মনে ক্রমেই বাড়ছে এক সাথে মিলেমিশে থাকার আকাঙ্ক্ষা। এদিক থেকে ফোকলোর পালন করতে পারে ইতিবাচক ভূমিকা। তা মানুষকে শেখায় জীবনের প্রকৃত অর্থ। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারে বাস করে না বলে অনেক শিশুই লোককাহিনি শোনার সুযোগ পায় না। ফলে জীবনের এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। ঐতিহ্যবাহী লোকসাহিত্য শিশুর মনে কল্পনার বিস্তার ঘটায়। এ ধরনের সাহিত্য থেকে শিশু নৈতিক, সামাজিক, ও মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা লাভ করে। যেসব গল্পে মানুষ ও পশুর চরিত্রের ভালো ও মন্দ দিক বর্ণিত হয় এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সত্যের জয় হয়, সেসব গল্প শিশুদের নৈতিক শিক্ষাকে দৃঢ় করে। শিশুদের সাক্ষরতার উন্নয়নেও লোককাহিনির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এর কারণ, লোককাহিনির সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভাষা। শিশুরা সহজেই এগুলো বুঝতে পারে, নিজেদের মতো করে এগুলো প্রকাশ করতে পারে। তারা কাহিনির মূলভাবটুকু সহজেই বুঝে নেয়। চিত্রবত্ শব্দের মোটামুটি ও কাছাকাছি অর্থ অনুধাবন করতে পারে। তারা নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাদের শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। গল্প বর্ণনার এক ধরনের রীতি তাদের আয়ত্তে চলে আসে। বাংলা ভাষায় ব্যবহূত অনেক শব্দ ও বাকভঙ্গি এসেছে লোকসাহিত্য থেকে। তাই লোকসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত না হলে এসব শব্দ বা বাকভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সবসময় হয় না। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ফোকলোর মোটামুটি গুরুত্ব পেলেও উচ্চ শিক্ষায় তা অবহেলিত। একমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোথাও ফোকলোর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিভাগ খোলা হয়নি। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অন্তর্গত বিষয় হিসেবে লোকসাহিত্য পড়ানো হলেও অন্যান্য বিভাগে ফোকলোর পড়ানো হয় না। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। আমাদের দেশের ভবিষ্যত্ নাগরিকদের ঐতিহ্য-সচেতন, অসাম্প্রদায়িক, মানবব্রতী করে গড়ে তুলতে হলে এবং তাদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে হলে তাদের ফোকলোর পঠনপাঠনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে বিশ্বায়নের ঝড়ো হাওয়ায় আমাদের শেকড়-বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।