সবুজবিপ্লবের পূর্বাভাস

বাংলাদেশ খুব দ্রুতই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে। প্রায় ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে যে বাংলাদেশ, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি বজায় রাখা এবং একই সাথে পরিবেশ সংরক্ষণ এক বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন কৃষি ও কম মূল্যের শিল্প উত্পাদন থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে জ্ঞান-নির্ভর এক উত্পাদন ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া। নতুন ধারণা, গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতার ওপর দাঁড় করাতে হবে এদেশের অর্থনীতিকে। এমনই এক সুন্দর সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে তাড়িত কয়েকজন তরুণ নগর পরিকল্পনাবিদের হাতে তৈরি হয় ‘বরিশাল বিভাগীয় শহরের মাস্টার প্ল্যান’। তাদের লক্ষ্য ছিলো ‘নতুন ধারণা ও সৃজনশীলতার শহর’ হিসেবে বরিশাল গড়ে উঠবে, দিক নির্দেশনা দেবে বাংলাদেশকে—জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে। পরিকল্পনা তৈরির প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের অন্যান্য নগর পরিকল্পনার মতো সহজ ছিল না; পরিকল্পনাকারী দলের সদস্যরা প্রচলিত নগর পরিকল্পনার অনুমান, লক্ষ্য এবং পদ্ধতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলেন। ১৮,৬৭০ একর এলাকা নিয়ে তৈরি করা হয় এই স্ট্রাকচার প্ল্যানটি। বরিশাল নগর উন্নয়ন পরিকল্পনাটি সম্ভবত প্রথম নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা যা মানবোন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রচলিত নগর উন্নয়ন পরিকল্পনাসমূহ গুরুত্বারোপ করে অর্থনীতিক প্রবৃদ্ধির ওপর, যা পরিমাপ করা হয় ‘মোট দেশজ উত্পাদনের’ (জিডিপি) মাপকাঠিতে। ১৯ অক্টোবর ২০১১ তারিখে বাংলাদেশ সরকার এক গেজেটের মাধ্যমে এই পরিকল্পনাটির অনুমোদন দেয়। তিন ধাপের এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত আছে স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান। স্ট্রাকচার প্ল্যানে যে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে সেই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ২০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান তৈরি এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। ২০১১ সালে বরিশাল নগর উন্নয়নের যে পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হয়, সেখানেই প্রথমবারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। অনুমোদন পায় ‘নগর সরকার’ প্রস্তাব ও কাঠামো। এটা শুধু বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ উন্নয়নের জন্য এক নতুন পথ খুলে দিল। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, বরিশাল নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রথমবারের মতো পথচারী ও জ্বালানি সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেমন—সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক ভবন, বাণিজ্যিক ও শিল্প-স্থাপনায় সাইকেল পার্কিং-এর বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত নির্দেশাবলী এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নগরের ভেতরে যাতায়াতের পথ হিসেবে খালের ব্যবহারকে সড়ক পথের সাথে সমন্বয় করা হয়। বেশকিছু স্থানান্তরণ-বন্দরের (যেখান থেকে মানুষ সড়কপথ ছেড়ে নৌ-পথে বা নৌ-পথ ছেড়ে সড়কপথে যাত্রা করবে) প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পথচারীর অগ্রাধিকার, জ্বালানিবিহীন যাতায়াত ব্যবস্থা ও নৌ-পথের ব্যবহার যে শুধু ব্যাপক জনগণকে স্বাচ্ছন্দ্যে ও স্বল্প খরচে যাতায়াতে সাহায্য করবে তা-ই নয়, বরং পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস করবে, স্থানীয় বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে এবং গ্রিন-হাউজ-গ্যাস নির্গমন হ্রাস করবে। গড়ে উঠবে পরিবেশ-বান্ধব এক শহর যার লক্ষ্য জনকল্যাণ। প্রকৃতির সুরক্ষা, বিভিন্ন শ্রেণী, গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিতকরণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সময় লক্ষ রাখা যে, এই পৃথিবী শুধু আমাদের নয়, তা পরবর্তী প্রজন্মেরও। এই রূপ একনীতি ও কৌশলই পারে সেই টেকসই পথের নির্দেশ দিতে, যার ইঙ্গিত বহন করছে ‘সবুজ উন্নয়ন’-এর ধারণা। স্ট্রাকচার প্ল্যানের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কার্যক্রম (ইউএনডিপি)-এর সহযোগিতায় ২ ও ৩ অক্টোবর ২০১২ তারিখে বরিশাল শহরের ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা একটি ‘সবুজ উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা, বরিশাল’ তৈরি করে। প্রথাগত সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত পরিকল্পনা তৈরির পদ্ধতি থেকে এই পরিকল্পনা তৈরির ধারণাটি ছিল ভিন্ন। এটি ছিল সম্পদ সম্ভাবনাতাড়িত একটি পরিকল্পনাপদ্ধতি। সাগরদী খাল এবং তারা আশপাশের সম্পদ চিহ্নিতকরণ এবং তার সাথে মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এই পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়। ‘নতুন ধারণা, গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতার শহর বরিশাল’-এর জন্য নতুন প্রজন্ম যে বিজয়গাথা তৈরি করে গেল, সেই গল্প নিয়ে লেখা ‘সবুজ উন্নয়ন’ বইটি। উপর্যুপরি ব্যর্থতার ছেদ ঘটানোর ইতিহাস লেখা হয়েছে এই বইয়ে।