হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর নছিহতনামা

১. কেউ কেউ শয়তানের এমন ধোকায় আছে যে, আমি গোনাহগার, কাজেই আমার দোয়া কবুল হবে না। তা মোটেই ঠিক না। মহান আল্লাহ পাক এমন দয়ার সাগর যে, ইবলিশের মত গোনাহগারের দোয়াও কবুল করেছেন। তার দোয়া ছিল কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত দেয়া, আল্লাহ পাক তাই দিয়েছেন। কাঁন্নাকাটির সাথে দোয়া করতে থাকবেন। মানুষের কাছে একবার, দুইবার তিনবার কিছু চাইলে সে বিরক্ত হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে এর উল্টা, যত বেশি চাওয়া যায় তিনি তত বেশি খুশী হন। দোয়া করা তো আল্লাহর সাথে কথা-বার্তা বলা, কাজেই আল্লাহ পাক দোয়া কবুল করবেন বিশ্বাস রেখে খুব মনোযোগের সাথে দোয়া করা চাই। ‘দোয়া কোন সময় কবুল করলে মঙ্গল হবে, সেটা আল্লাহ পাক ভাল জানেন। কাজেই আমরা তাড়াতাড়ি করলে তিনি তাড়াতাড়ি দেবেন না, যখন দেয়া মঙ্গলজনক হবে তখনই দেবেন। তাড়াতাড়ি দেয়া মঙ্গলজনক হলে তাড়াতাড়ি দেবেন, আর দেরী করে দেয়া মঙ্গলজনক হলে দেরী করেই দেবেন, আর না দেয়া মঙ্গলজনক হইলে দেবেন না। কাজেই নিরাশার কিছু নাই। লক্ষ টাকা চেয়ে দোয়া করা হলো। কিন্তু ঐ লক্ষ টাকা না পাওয়া গেলেও ছওয়াব পাওয়া যাবে।এক বুজুর্গের ক্ষুধা লেগেছিল, কিন্তু খাবার কিছু ছিল না। তিনি ছোট ছেলে-মেয়ের মত কাঁদাকাটি আরাম্ভ করলেন। লোকেরা বলল, এ কেমন কথা, ছেলেদের মত কাঁদেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, কাঁদবো না তো আল্লাহর কাছে বাহাদুরী করব? গুনাহের কাজের কাছে যাবেন না। আর শরীরে যে গুনাহ আছে, তাহা পরিষ্কার করে ফেলেন, তা হলে উদ্দেশ্য সফল হবে। ২. আবেগ, প্রবৃত্তি ও রাগের বশবর্তী হয়ে কোন কাজ করবেন না। ৩. কোন কাজে তাড়াহুড়া করা ভাল নয়, কেননা তা শয়তানের প্ররোচনায় হয়ে থাকে। সুতরাং প্রতিটি কথা ও কাজ পরিণাম ভেবে করা উচিত। ৪. পরামর্শ ব্যতীত কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবেন না। ৫. গীবত,পরচর্চা, পরনিন্দা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবেন। ৬. গোনাহ হয়না এমন কথাও বেশি বলবেন না; বিনা প্রয়োজনে কারো সাথে মেলামেশা করবেন না; এবং বাছবিচার ছাড়া যে কাউকেই নিজের বিশ্বস্ত বানাবেন না, কেননা এর পরিণাম অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। ৭. পূর্ণ ক্ষুধা ব্যতীত আহার করবেন না। ৮. একান্ত প্রয়োজন না হলে করজ (ঋণ) করবেন না। ৯. কখনও অপব্যয়ের কাছেও যাবেন না। ১০. অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সংগ্রহ করবেন না। ১১. ব্যবহারে কঠোরতা ও কর্কশতা পরিহার করবেন এবং নম্রতা, সংযম ও সহনশীলতার অভ্যাস আয়ত্ব করার চেষ্টা করবেন। ১২. কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম, খানা-পিনা ও পোশাক-পরিচ্ছদে লৌকিকতা ও বাহুল্য পরিহার করবেন। ১৩. সম্পদশালী ও শাসকবর্গদের সাথে ধর্মীয় নেতাদের কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করা উচিত নয়, তাদের সাথে অত্যধিক মেলামেশা করবেন না এবং বিশেষতঃ পার্থিব উদ্দেশ্যে তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানাবেন না। ১৪. লেনদেনের ব্যপারে সতর্কতা অবলম্বন করাকে ‘দিয়ানত’ এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন।১৫.কোন ঘটনা বুঝা ও বর্ণনার ব্যপারে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করবেন। দ্বীনদার ও জ্ঞানীলোকদেরকেও এই ব্যাপারে অসতর্ক দেখা যায়। ১৬. প্রয়োজন ব্যতীত ঔষধপত্র ব্যবহার করবেন না, আর প্রয়োজন হলে বিজ্ঞ ডাক্তার বা হেকিমের পরামর্শ ব্যতিরেকে কোন ঔষধ ব্যবহার করবেন না। ১৭. সর্বপ্রকার গোনাহ ও অনর্থক কথা হতে নিজের জিহ্বার পূর্ণ হেফাজত করবেন। ১৮. অনর্থক ও বেহুদা কাজে নিজের অমুল্য সময় নষ্ট করবেন না। ১৯. নিজের মত ও বক্তব্যে জেদী না হয়ে সদা সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী হওয়ার চেষ্টা করবেন। ২০. ‘গায়রুল্লাহ’ (অর্থাত্ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু) এর সংগে সম্পর্ক বৃদ্ধি করবেন না। ২১. কারো ব্যক্তিগত ও পার্থিব বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ করবেন না। (২২) তালেবে-এলেম (শিক্ষার্থী) ভাইদেরকে বিশেষভাবে বলছি, শুধু কিতাবের বিদ্যাকেই যথেষ্ট মনে করবেন না। কেননা তার সুফল আল্লাহ-ওয়ালাদের সুদৃষ্টি, সাহচার্য ও তাঁদের খেদমতের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এই দিকেও গুরুত্ব সহকারে মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। ২৩. আমরা সকল আদম সন্তান একে অপরের খান্দানী ভাই। আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে বিশ্ব-জাহানের খালেক রাব্বুল আলামীন আপন খলীফা রূপে পয়দা করেছেন। মুসলমানরা আমার দ্বিনী ভাই এবং অমুসলমানরা আমার খান্দানী ভাই।’ ২৪. হজরত আদম (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা খেলাফত দিয়েই পাঠিয়েছেন। খেলাফত আমাদের মিরাছী (উত্তরাধিকারমূলক) সম্পত্তি। এই খেলাফত কায়েম করা আমাদের দায়িত্ব। প্রত্যেক নবী এই খেলাফতের দায়িত্বই পালন করে গেছেন। আমাদের হুজুর (মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম) যে সব কাজ করলে আমাদের ভাল হবে এবং যে সব কাজ করলে আমাদের মন্দ হবে - তা তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে বলে ও করে দেখিয়ে দিয়েছেন।আমাদের সেই সকল কথা ও কাজের বাস্তব অনুকরণ ও অনুসরন করতে হবে। ২৫. আমি বলিনা যে আমার হাতেই খেলাফত কায়েম হউক। তিনি (আল্লাহ) যাকে এই কাজের যোগ্য মনে করেন তার দ্বারাই এ কায়েম করুন। ২৬.‘হুকুমতের উদ্দেশ্য হলো ৪টি কাজ করা - নামাজ ও যাকাত প্রতিষ্ঠা করা, এবং ‘আমরি বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকার’ -অর্থাত্ সত্ কাজে আদেশ ও অসত্ কাজে নিষেধের কাজ করা। প্রথম দু’টি খুছুছী অর্থাত্ একা একা করা যায়, কিন্তু শেষের দুইটির জন্য হুকুমত দরকার। ২৭.খেলাফত কায়েমের জন্যই আল্লাহ পাক মানুষ পয়দা করেছেন। খেলাফত বলতে শুধু দেশের শাসনকার্য পরিচালনা বুঝায় না, এটা খেলাফতের একটি অংশ বিশেষ। প্রতিটি স্তরের প্রতিটি কাজ খেলাফতের অন্তর্গত। মাদ্রাসা পরিচালনা করা, মসজিদ পরিচালনা করা, ধর্মীয় বিধান মত সাংসারিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিয়, ব্যক্তিগত - অর্থাত্ সর্ব স্তরের সকল কাজে আল্লাহর আইন-কানুন অনুসারে চলা ও চালানোর নাম খেলাফত। ২৮.আমাদের এই শরীর আমাদের নিকট আল্লাহ পাকের এক মস্ত আমানত। এর হেফাজত করতে হবে। ছিহ্যাত (স্বাস্থ্য যাতে নিজের দোষে নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা ওয়াজেব (কর্তব্য)। ২৯.‘হাত, চোখ, কান. মুখ, দেমাগ (মাথা), দিল (অন্তর) ইত্যাদীর হেফাজত একান্ত কর্তব্য। ৩০. মানুষ সময়ের কদর বুঝে না। আপনারা সময়ের খুব কদর করবেন। সময় চলে গেলে আর পাওয়া যায় না। ৩১. দুইটি জিনিসের খুব খেয়াল রাখবেন, এক- জিকির (আল্লাহর নাম যপ করা), আর এক- ইছলাহের ফিকির (আত্ম-সংশোধের চেষ্টা)। তা হ’লে ইনশাআল্লাহ কামিয়াবী। ৩২. গীবত (পরনিন্দা), শেকায়েত (অন্যকে দোষারোপ), অহংকার, হিংসা, যিনা (ব্যাভিচার) ইত্যাদী খারাপ অভ্যাস ছেড়ে দিতে হবে। ৩৩. গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায়, প্রতিটি মসজিদে সকাল বেলা আমভাবে ছেলে-মেয়েদের কুরআন মজিদ শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য কর্মসূচি নেয়া দরকার। যে মহল্লায় মসজিদ নাই, সেখানে স্থানীয় কোন লোকের বৈঠকখানা সকালে দুই ঘন্টার জন্য মক্তব হিসাবে ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ৩৪.নামে থাকবে মাদ্রাসা, কিন্তু কাজ হবে সব খানকার। পড়া-শোনার সাথে সাথে উহা আমলে পরিণত করা এবং চারিত্রক দোষ-ত্রুটি সংশেধন করা থাকবে মাদ্রাসার কর্তব্য। তা না হলে ‘খানকা’ ‘খামাখা’ হয়ে যাবে। ৩৫. বর্তমানে মাদ্রাসা গুলো হলো নূহ্ (আ.)-এর কিস্তি। যারা উস্তাজায়ে কেরাম (শিক্ষকবৃন্দ) ও তালাবা (ছাত্র), তারা তো কিস্তিতে আছেনই। এ ছাড়া আমার মহব্বতের দোস্তেরা যারা এটা চালায়, তারাও এর মধ্যে শামিল। এটাই কামিয়াবীর পথ। ৩৬.দ্বীন হাসিল করা বা দ্বীনের খেদমত করা সবকিছু হওয়া চাই আল্লাহ পাককে রাজী-খুশী করার নিয়তে, দুনিয়া কামাই করার নিয়তে নয়। তথ্যসূত্র:১.হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) স্মারকগ্রন্থ, ৪. হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে হযরত হাফেজ ক্বারী মাওলানা আতাউল্লাহ 2. hafezzi-huzur.blogspot.com/2011/10/blog-post.html. 3.bangladeshkhelafatandolan.blogspot.com/.../blog-post.html ই-মেইল:anwar.aldin@gmail.com