এলব্রুস চূড়ায় বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযান

ইউরোপ মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এলব্রুসে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযান গত ২৬ জুন সফলভাবে শেষ হয়েছে। রাশিয়া-জর্জিয়া সীমান্তে অবস্থিত পশ্চিম ককেশাস পর্বতামালার সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৫শ’ দশ ফুট উঁচু এলব্রুস পর্বতচূড়ায় গত বুধবার স্থানীয় সময় সকাল আটটা চল্লিশ মিনিটে অভিযাত্রীরা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার পতাকা ওড়ান। এই মৈত্রী অভিযানে টিম বাংলাদেশের সদস্য ছিলেন এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি মুসা ইব্রাহীম, নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও সিফাত ফাহামিদা নওশিন। এর আগে এভারেস্টজয়ী দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী ওয়াসফিয়া নাজরিন গত ২৮ মার্চ এলব্রুস পর্বত জয় করেন। রাশিয়ার কাবারডিনো বলকারিয়া রিপাবলিক এবং কারাচে-চেরকেশিয়া রিপাবলিকের মধ্যে অবস্থিত এই পর্বতটি মূলত একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম’র সূত্র মতে, এই আগ্নেয়গিরি থেকে সর্বশেষ খ্রীস্টপূর্ব ১০০ সালের আগে লাভা উদগীরণ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এলব্রুস পর্বতমালা এলাকায় তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে সামিট গ্রুপ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স ও আব্দুল মোনেম লিমিটেড। এছাড়া এতে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশে রাশিয়ার দূতাবাস এবং রাশিয়ার কাবারডিনো বলকারিয়া রিপাবলিকের ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। অভিযানটির আয়োজন করে এভারেস্ট একাডেমী ও নর্থ আলপাইন ক্লাব, বাংলাদেশ। টিম বাংলাদেশের অভিযাত্রীরা গত ১৩ জুন রাশিয়ার মস্কো থেকে রওয়ানা দিয়ে এলব্রুস পর্বতের সাউথ রুটের পাদদেশ আজাউ ভ্যালিতে পৌঁছান। ১৪ জুন থেকে শুরু হয় মূল অভিযান। এরপর তারা উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে খাপ খাওয়াতে প্রায় সাড়ে দশ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ক্রুগাজর এবং ওয়েদার অবজাভেটরি টাওয়ারে ঘুরে আসেন। ১৭ জুন তারা প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এলব্রুস পর্বতের দ্বিতীয় ক্যাম্প ‘গারা বাসি’ পৌঁছান। এর পর উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে খাপ খাওয়াতে প্রায় ১৩ হাজার একশ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ‘প্রিউট ইলেভেন’ এবং প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ‘পার্স্তুহভ রক’ থেকে ঘুরে আসেন। ২০ জুন গারা বাসি থেকে সামিট পুশ করার কথা থাকলেও আবহাওয়া খারাপ থাকায় তা বদলে ২২ জুন করা হয়। এদিন ভোররাত ৩টায় গারা বাসি থেকে সামিট পুশ করা হলেও প্রায় ৫৫ কিলোমিটার বেগে তুষারঝড় শুরু হওয়ায় ১৬ হাজার চারশ ফুট উচ্চতা থেকে মাইনাস পনের ডিগ্রি তাপমাত্রায় নিরাপত্তার কারণে অভিযান বাতিল করা হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দেখে ২৬ জুন নতুন করে সামিট পুশের পরিকল্পনা করা হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে গারা বাসি থেকে রাত সোয়া তিনটায় অভিযাত্রীরা সামিট পুশ শুরু করেন। ভোর সাতটার দিকে তারা প্রায় ১৭ হাজার চারশ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ‘সেদলেভিনা’য় পৌঁছানোর পর ফের তুষারঝড় শুরু হয়। এর মধ্যেই সেদলেভিনা’য় খানিকটা বিশ্রামের পর তারা আবার চূড়ার দিকে যাত্রা শুরু করেন। একটানা পর্বতারোহণ শেষে সকাল আটটা চল্লিশ মিনিটে অভিযাত্রীরা ককেশাস পর্বতমালার সর্বোচ্চ চূড়া এলব্রুস পর্বতের ১৮ হাজার ৫শ দশ ফুট উঁচু ওয়েস্টার্ন সামিট জয় করেন। এ সময় তারা এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযানের অংশ হিসাবে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার পতাকা এবং কাবারডিনো বলকারিয়া রিপাবলিকের পতাকা ওড়ান। ২৬ জুনই টিম বাংলাদেশের অভিযাত্রীরা এলব্রুস পর্বতের পাদদেশ আজাউ ভ্যালিতে নেমে আসেন। এখানে তাদেরকে কাবারডিনো বলকারিয়া রিপাবলিকের মাউন্টেনিয়ারিং, রক ক্লাইম্বিং অ্যান্ড স্পোর্টস ট্যুরিজম ফেডারেশন থেকে এলব্রুস পর্বতের স্মারক হিসাবে সনদ দেয়া হয়। উল্লেখ্য, মুসা ইব্রাহীমের সেভেন সামিট অভিযানের এটি তৃতীয় সফল অভিযান। এর আগে তিনি ২০১০ সালের ২৩ মে এভারেস্ট এবং ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিয়াজ পাটওয়ারীসহ আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমানজারো জয় করেন।