পরমাণু অস্ত্র হ্রাস না বিলোপ সাধন

পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ কমাইয়া ফেলিবার প্রস্তাব করিয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রধান পরমাণু-প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার প্রতি এই আহ্বান জানানো ছাড়াও তিনি ইউরোপ হইতে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র হ্রাস করিবার প্রস্তাবও হাজির করিয়াছেন। পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য নূতন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো দাঁড় করাইবার আহবানও জানাইয়াছেন ওবামা। যদিও সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না হওয়া অবধি মানবজাতি পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকি হইতে কোনভাবেই রক্ষা পাইবে না, তথাপি প্রধানতম পরমাণু শক্তিধর দেশের প্রেসিডেন্টের মুখ হইতে কয়েক দিন আগে জার্মানীতে অবস্থানকালে নিঃসৃত এই আহবান শান্তিকামী মানুষের মত আশাবাদ যোগায় বৈকি। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, ওবামার আহবানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া সাড়া দেওয়ার পক্ষপাতি নহে। পরমাণু শক্তিধর অন্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যেও এই আহবানে আগাইয়া আসিবার সামান্য প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে না। বস্তুত পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকিমুক্ত ধরিত্রী উপহার পাইবার তেমন কোন আশাবাদ এখন অবধি দৃশ্যমান হইতেছে না। প্রথম কথা হইতেছে পরমাণু অস্ত্র নির্মূলের পরিবর্তে হ্রাসের প্রস্তাব কার্যকর হইলেও বিশ্ব ঝুঁকি মুক্ত হইবে না। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রসম্ভার হইতে কেবলমাত্র ৩০০টি যদি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানে তাহা হইলে প্রথম ৩০ মিনিটেই দেশটির সাড়ে সাত হইতে ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারাইবে। আর আঘাত হানিবার এক মাসের মধ্যে পরমাণু আঘাতের নানাবিধ প্রতিক্রিয়াতে পড়িয়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষই মরিয়া যাইবেন বলিয়া আশঙ্কা করেন বিশেষজ্ঞরা। কোন কারণে যদি একবার বিশ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রস্তাবিত হ্রাসকৃত সংখ্যক পরমাণু অস্ত্র সমেতও যুদ্ধ বাঁধিয়া যায়, তাহা হইলেও বিশ্বে এমন অকল্পনীয় মাত্রার ধবংসযজ্ঞ সাধিত হইবে যে তাহা সামাল দিয়া মানবসভ্যতা টিকাইয়া রাখাটা দুষ্কর হইয়া পড়িবে। বিজ্ঞানীদের অনেকের ধারণা এহেন একটি যুদ্ধের পরিণতিতে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ প্রাণ হারাইবে। এমত ভয়ঙ্কর ভবিষ্যত্ এড়াইবার জন্য পরমাণু অস্ত্রমুক্ত পৃথিবীর জন্য কাজ করাটাই যৌক্তিক; বারাক ওবামাদের মত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অসংখ্য হিসাব-নিকাশ মাথার মধ্যে রাখিয়া এই কার্য সিদ্ধ করা যাইবে বলিয়া মনে হয় না। এইদিকে, পরমাণু অস্ত্র নির্মূল থাকুক, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে আস্থাহীনতার দিকটি এতটাই প্রবল যে পরমাণু অস্ত্র হ্রাসের সর্বশেষ আহবানটিকে গুরুত্বের সহিত শুনিতে পর্যন্ত চাহিতেছে না অপর পরমাণু-পরাক্রমশালী দেশ রাশিয়া। বস্তুত জর্জ বুশের আমল হইতে ইউরোপের নিরাপত্তার নাম করিয়া রাশিয়ার প্রতিবেশি কয়েকটি মিত্র দেশের মাটিতে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম গড়িয়া তুলিবার যে চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র চালাইতেছে তাহাকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে মস্কো। প্রকল্পটি বলবত্ অবস্থাতে পরমাণু অস্ত্র হ্রাসের মার্কিন আহবানে সাড়া দেওয়ার কোন কারণ দেখা যাইতেছে না বলিয়া জানাইয়াছে রাশিয়া। প্রধান দুই দেশের মধ্যে এহেন আস্থাহীনতা বিরাজ করিতে থাকা অবস্থাতে পরমাণু অস্ত্রধারী অন্য দেশগুলি যে এক কদমও আগাইয়া আসিবে না তাহা বলাইবাহুল্য। এমতাবস্থায় প্রধান দুই দেশকেই কথার মারপ্যাঁচ বাদ দিয়া পরমাণু অস্ত্র হ্রাস নয় মানব সভ্যতার স্বার্থে পরমাণু অস্ত্র বিলোপের নিমিত্তে কার্যকরভাবে আগাইয়া আসিতে হইবে। এই কার্য সম্ভব হইলে পরমাণু অস্ত্রধারী অন্য দেশগুলিকে পথে লইয়া আসাটা কঠিন কিছু হইবে না। আর একবার যদি পরমাণু শক্তিধর সকল রাষ্ট্র মিলিয়া পরমাণু অস্ত্র বিলোপে একমত হইতে পারে তাহা হইলে সামনের দিনগুলিতে একই রকমের শক্তি অর্জনের চেষ্টা-চরিত্রকারী দেশগুলিকে বাগে আনিতে তেমন কোন কষ্ট হইবার কারণ থাকিবে না।