যেন ক্রিকেট-উত্সবের রাত

আতাহার আলী খান, খালেদ মাসুদ, হাবিবুল বাশার, মিনহাজুল আবেদীনরা পিছিয়ে ছিলেন ভাবার কোনো কারণ নেই। কী সাজপোশাক, কী নজর কাড়া; এখনও এই সাবেকরা যেন তরুণ বয়সের মতোই স্মার্ট!  শেন জার্গুনসেনকে দূর থেকে ‘গল্প-দাদু’র মতো লাগছিল। একদল শিশু ঘিরে ধরেছে তাকে। কি যেন বলার চেষ্টা করছে; আর জার্গুসেনও খুব মন দিয়ে ওদের বাংলা কথাবার্তা বোঝার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে ছবি তোলার আবদার। জার্গুসেন অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে পনেরো-বিশজন এই ক্ষুদে ভক্তকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে ছবি তোলার জন্য তৈরি! শুধু জার্গুসেন কেন; যেদিকে চোখ যায়, তারকাদের এই ছবি তোলার উত্সব। কোথাও আশরাফুল, কোথাও মাশরাফি, কোথাও মুশফিক আবার কোথাও হাবিবুল বাশার কিংবা মিনহাজুল আবেদীন; সবাই ভক্তদের আবদার মেটাচ্ছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। সব দেখেশুনে মনে হল বুঝি ক্রিকেটারদের কোনো এক উত্সবে এসে পড়েছি। উত্সবই বটে; তবে সেটা ক্রিকেটারদের সবার নয়। এ উত্সব ছিল তামিম ইকবাল ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকাকে ঢাকায় বরণ করে নেয়ার উত্সব-বৌভাত বা সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান! এই অনুষ্ঠানই বৃহস্পতিবার রাতে এমন সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটারদের পুনর্মিলনীতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তামিমের বিয়ে মহা ধুমধাম করেই চট্টগ্রামে হয়েছে। সেখানেই নজরকাড়া অনুষ্ঠান করে জীবনসঙ্গিনী করে নিয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রেমিকা আয়েশা সিদ্দিকাকে। আর কাল সেই ধুমধাম হল ঢাকাতে। বৃহস্পতিবার রাতে এমন ধুমধাম করা কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। আর দশটা বিয়েতে যেমন হয়; তেমনই হল। ঢাকার একটি অভিজাত গলফ ক্লাব রেস্টুরেন্টে তামিম আর আয়েশা হাসি হাসি মুখে মঞ্চে দাঁড়িয়ে রইলেন। প্রত্যেক অতিথি মঞ্চে গিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন আর ছবি তুললেন এই দম্পত্তির সঙ্গে। কিন্তু এই একটা দৃশ্য দেখে আসলে অনুষ্ঠানটার মজাটা বোঝা যাবে না। এই অনুষ্ঠান আলোয় আলোয় ভরে গেল অতিথিদের কল্যাণে। আপ্যায়নকারী খান পরিবারেও তো তারকার অভাব নেই। একেবারে গেটের কাছে দাঁড়িয়েই অতিথি বরণ করছিলেন তামিমের চাচা। কে সেই চাচা? বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জয়ী জাতীয় দলের অধিনায়ক, সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার এবং বর্তমান প্রধান নির্বাচক আকরাম খান। ভেতরে অতিথিদের ভালোমন্দ খোঁজ করার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন তামিমের বড় ভাই। কে সেই ভাই? বাংলাদেশের একসময়ের অমিতপ্রতিভাধর ব্যাটসম্যান বলে বিবেচিত ক্রিকেটার, টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান, অ্যাশলে জাইলসের ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়া সেই নাফিস ইকবাল। ‘গৃহস্থ’ পক্ষে যখন এমন আলোকিত তারকারা; অতিথিরা কম যাবেন কেন? অতিথিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়লেন মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক এই দারুণ ব্যস্ততার সময়েও ছুটে এসেছেন তিনি তামিম ও তার স্ত্রীকে আশীর্বাদ জানাতে। শুধু অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন, তাই নয়; মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী নবদম্পত্তির সঙ্গে নৈশাহার করেও আন্তরিকতাটা প্রকাশ করে গেলেন। এদিকে তামিমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেল, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে না এলেও তার শুভাশীষ পেয়েছেন তামিম দম্পত্তি। অত্যন্ত ক্রীড়ানুরাগী প্রধানমন্ত্রী তামিম ও তার স্ত্রীকে নিজের বাসভবনে দাওয়াত করেছেন বলেও শোনা গেল। একইরকম দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের আরো নেতারাও সব ভেদাভেদ বাইরে রেখে ছুটে এসেছিলেন অনুষ্ঠানে। হাত মেলানো আর হাসিমুখে পরস্পরের সঙ্গে গল্প করতে দেখে বোঝা গেল, অন্তত ক্রিকেটের এই জগতে তারা রাজনীতিকে দূরে রেখেই এসেছেন। তবে বলাই বাহুল্য যে, এর মধ্যে উপস্থিত অতিথিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলেন জাতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটাররা। ২২ জুন চট্টগ্রাম কাজীর দেউড়িতে তামিমের বিয়ের অনুষ্ঠানে চাচা আকরাম খানের সতীর্থরা অনেকে উপস্থিত হলেও জাতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটাররা সেভাবে কেউ যেতে পারেননি। গতকালের অনুষ্ঠান আলোকিত করে তুললেন তামিমের সেই বর্তমান সতীর্থ মুশফিক, মাশরাফি, আশরাফুল, মাহমুদউল্লাহ, রাজ্জাক, ইলিয়াস সানি, মোশাররফ রুবেলরা। তরুণদের কাছে হয়তো বর্তমানের এই তারকাদের কদরটা একটু বেশি ছিল। তাই বলে আতাহার আলী খান, খালেদ মাসুদ, হাবিবুল বাশার, মিনহাজুল আবেদীনরা পিছিয়ে ছিলেন ভাবার কোনো কারণ নেই। কী সাজপোশাক, কী নজর কাড়া; এখনও এই সাবেকরা যেন তরুণ বয়সের মতোই স্মার্ট! বিয়ের অনুষ্ঠানে শুধু তারকা, গৃহস্থ থাকলে মানায় না। বয়স্কদেরও একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ আনতে হয়। আর সেটা করতেই দেশের শীর্ষ ক্রীড়া সংগঠকরা উপস্থিত ছিলেন। আর এতো জগতের এতোশত তারকারা এক হলে সময় কী আর ফুরোতে চায়? মনে হয়, এই আড্ডা চলতেই থাকুক অনন্ত কাল ধরে। তাই মাশরাফিকে বারবার তাড়া দেয়ার পর চলে যেতে যেতে হেসে বলেন, ‘তামিম তো রোজ রোজ বিয়ে করবে না। আজ একটু সবাই আনন্দ করেই যাই।’ উত্সব ফুরিয়ে গেল। কিন্তু আনন্দ ফুরানোর নয়। তামিমের জীবনে এবং এই ক্রিকেটারদের জীবনে এমন উত্সব অক্ষয় হয়ে থাকাটাই হবে বাংলাদেশের বড় পাওয়া।