ষড়যন্ত্রকারীদের সাধারণ মানুষই প্রতিহত করবে
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৩, ২২:৪২
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংক সাধারণ মানুষের ব্যাংক, তারাই এটাকে রক্ষা করবে, ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করবে। কেউ এটাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। যে প্রতিষ্ঠান দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করেছে সেটাকে অবহেলা করে ধ্বংস করে দেয়া যায় না।
চতুর্থবারের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গতকাল ২৮ জুন পালিত হয়েছে সামাজিক ব্যবসা দিবস। রাজধানীর একটি হেটেলে গতকাল শুক্রবার ইউনূস সেন্টার আয়োজিত দিনব্যাপী সামাজিক ব্যবসা দিবস উদযাপন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস এ মন্তব্য করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের ৮ নারী পরিচালকের পরিচয়কালে তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রত্যেকে ১০ লাখ নারীর প্রতিনিধিত্বকারী। আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকবো। আপনাদের বাংক (গ্রামীণ ব্যাংক) কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
উদ্বোধনশেষে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের সাথে চলমান বিরোধের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠান দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করেছে সেটাকে অবহেলা করে ধ্বংস করে দেয়া যায় না। এটা মানুষের প্রতিষ্ঠান, মানুষই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে। সরকার এটাকে দখলে নিচ্ছে, এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সরকারকেই জিজ্ঞেস করুন। গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো ভেঙ্গে দেয়ার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কমিশন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটা ঠিক নয়। এ বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, এমনটি হলে তো আর কোন সমস্যা থাকে না। গ্রামীণ ব্যাংক ভেঙ্গে ফেলার বিষয়ে কমিশন সরকারকে যে সুপারিশগুলো দিয়েছে সেগুলোকে ‘ক্রেজি সুপারিশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আমি মনে করি সরকারের এমন উদ্যোগ গ্রামীণ ব্যাংক ধ্বংস করে দেয়ার উদ্যোগ।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ড. ইউনূস একজন ভাল রাজনীতিবিদ। এ বিষয়ে তার মতামত জানতে চাইলে ড. ইউনূস বলেন, আমি তো জানি না অর্থমন্ত্রী প্রশংসা করলেন নাকি দুর্নাম করলেন। রাজনীতিবিদ হওয়া মানে কি ভালো মানুষ হয়ে গেলাম নাকি খারাপ মানুষ হয়ে গেলাম এটা পরিষ্কার বুঝা গেল না। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফখরুল গত বৃহস্পতিবার ড. ইউনূসের সাথে সাক্ষাত্ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন, এমন প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব না দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক পাওয়ার পর তারা আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন।
ধারাবাহিকভাবে ২০১০ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। সামাজিক ব্যবসার ধারণার প্রবক্তা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্মদিনে এ দিবসটি পালিত হয়। এবারের সামাজিক ব্যবসা দিবসের প্রতিপাদ্যঃ স্বপ্ন রূপান্তর হোক বাস্তবতায়। গতকাল দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা, জাপানের রাষ্ট্রদূত সিরো সাদোশিমা, মালয়েশিয়ান রাষ্ট্রদূত টুঙ্কু আলী রেধাউদ্দীন বক্তব্য রাখেন। উদ্বোধনী পর্বে প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফ্রান্সের ডানন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ইমানুয়েল ফেবের, ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনে প্রথমবারের মতো স্থান পাওয়া নেপালের ধনকুবের বিনোদ কে চৌধুরী, জার্মানির গ্রামীণ ক্রিয়েটিভ ল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হ্যন্স রেইটজ, কলাম্বিয়ার গ্রামীণ ক্যালডাসের সিইও মার্টিন লোফেলার, জাপানের অধ্যাপক মাসাহুরী ওকাডা প্রমুখ। এবারে সামাজিক ব্যবসা দিবসের অনুষ্ঠানে ৩০টি দেশ থেকে আসা শতাধিক বিদেশিসহ সহস াধিক অতিথি অংশগ্রহণ করেন। এই আয়োজনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সামাজিক ব্যবসার বিভিন্ন দিক নিয়ে মুখোমুখি মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার প্রসারে গ্রামীণ পরিবার অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়াও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সামাজিক ব্যবসা শুরু হয়েছে। স্পেনের বার্সেলোনা শহরকে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সামাজিক ব্যবসা শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে চীন থেকে আগত প্রতিনিধিরা ‘ড. ইউনূসকে ভালোবাসি এবং চীনে তাকে প্রয়োজন’ লেখাসম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
সামাজিক ব্যবসার বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে অনেক স্বপ্ন রয়েছে। এর অনেক কিছুই বাস্তবায়ন হয়েছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে এর কোন বিকল্প নাই। সামাজিক ব্যবসায় গত এক বছরের অগ্রগতি নিয়ে তিনি বলেন, আমরা অনেক বন্ধ দুয়ার খুলতে সক্ষম হয়েছি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো আফ্রিকায় কাজ শুরু করেছে। প্রথমবারের মতো সামাজিক ব্যবসা আফ্রিকার তানজানিয়া ও টোগোর মতো দেশে পৌঁছে গেছে। জার্মানির একটি শহর সামাজিক ব্যবসার শহর নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিতে সামাজিক ব্যবসার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। সামাজিক ব্যবসা শুরু করার জন্য বড় ধরনের কোন তহবিলের প্রয়োজন পড়ে না। এজন্য মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এর জন্য বড় কোন ফাউন্ডেশন বা বড় কোন প্রতিষ্ঠানেরও প্রয়োজন পড়ে না বলে মনে করেন ড. ইউনূস।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন ম্যাজিক ম্যান। তিনি তার স্বপ্নকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। স্যানফ্রান্সিসেকাতে গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমি যখন সেখানে যাই আমার মনে হয় যেনো আমি বাংলাদেশে রয়েছি। গ্রামীণ ব্যাংক, সামাজিক ব্যবসা ও ড. ইউনূস সম্পর্কে বলার সময় তিনি অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, একজন গরীব মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ব্যবসা করে সাবলম্বী হবেন, এ স্বপ্ন একমাত্র ইউনূসই সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন। সেই স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়নও করেছেন। অনুষ্ঠানে গ্রামীণ চেকে ড. ইউনূসের মতো পোশাকে হাজির হন জাপানে রাষ্ট্রদূত। জাপানের সামাজিক ব্যবসার সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরেন তিনি।