উন্নতির স্বার্থে নিয়ম মানিতেই হইবে

‘রাস্তা দখল করে বাজার, জমজমাট চাঁদাবাজি’, ‘রাস্তা দখল করে প¬ট বিক্রি’, ‘রাস্তা দখল করে ট্রাক ও টেম্পোস্ট্যান্ড’, ‘ফুটপাত দখল করে সারি সারি দোকান’—পত্রিকার পাতায় প্রায় নিত্যদিন আমরা এমন অসংখ্য খবর দেখি। ইন্টারনেটে এই বিষয়ে সার্চ দিয়া যাহা দেখিতে পাই, তাহা প্রথমে চক্ষু চড়কগাছ করিয়া দেয়। শুধু বাংলাদেশ নহে, সমগ্র উপমহাদেশেরই বৈশিষ্ট্য ইহা। অর্থাত্ দরিদ্র-অধ্যুষিত উপমহাদেশে এমন চিত্রের বাড়াবাড়ি দেখিয়া বাকরুদ্ধ হইবার কিছু নাই। আমাদের জনসংখ্যার বৃহত্তর দরিদ্র অংশের জীবনযাপন কীরূপে চলিবে, তাহারা কোন উপায়ে বাঁচিবে—সেই উপায় তাহারা নিজেরাই খুঁজিয়া লইয়া থাকেন। জনঘনত্বে আমরা শীর্ষে, রাষ্ট্রের কোষাগারে আয়কর দিবার ন্যূনতম সীমার আয়কারী জনগোষ্ঠীও আমাদের দেশে অতি স্বল্প। সুতরাং গরিবদের জন্য রাষ্ট্রের কিছু করিবার সামর্থ্য খুব প্রণিধানযোগ্য হইবে না, ইহা স্বাভাবিক। তাহা হইলে তাহাদের বাঁচিবার কী উপায়? রাষ্ট্রযন্ত্র গরিব হইলেও তাহার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এই ক্ষেত্রে একটি শৃঙ্খলা আনিতে পারিত। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও লুটেরা মানসিকতা যদি আমাদের মজ্জাগত হইয়া যায়, তাহা হইলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। সমপ্রতি আমরা দেখিয়াছি, রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) নাকের ডগায় রাস্তা দখল করিয়া মার্কেট তৈরি হইতেছে। পত্রিকায় প্রকাশের পর তাহার নির্মাণকাজ সাময়িক বন্ধ থাকে। ইহার পর পুনরায় নূতন কৌশলে কাজ চলিতেছে। আমরা দেখিয়াছি রাজধানীর ফুলবাড়িয়া হইতে শুরু করিয়া গোলাপশাহ মাজারের একটু পশ্চিম ও দক্ষিণ পার্শ্বের হাঁটিবার রাস্তার উপর ছোট ছোট দোকান নির্মাণ হইয়াছে। ফার্মগেট হইতে শুরু করিয়া ঢাকার এমন কোনো ব্যস্ত রাস্তা নাই যাহার সংযোগস্থল ও ফুটপাতে অবৈধ কেনাকাটার দৃশ্য চোখে পড়িবে না। এই অবাধ হকারবৃত্তি সারা দেশেরই সাধারণ চিত্র। ‘পজিশন’ বা ‘টং’ দোকানের জন্য অল্পবিস্তর চাঁদার বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষ তাহাদের অন্ন সংস্থান করিয়া থাকেন এই হকারবৃত্তির মাধ্যমে। পথচলতি মানুষও তুলনামূলক অল্পমূল্যে জিনিস খরিদ করিতে পারে এই সকল অবৈধ দোকান হইতে। আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম কিছু করিয়া খাইবার এই চেষ্টা একদিকে রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচকও। কারণ তাহারা যদি এই শ্রমের পরিবর্তে জীবন ধারণ করিবার অর্থ সংস্থানার্থে তস্করবৃত্তির দিকে অধিক আগ্রহী হইয়া উঠে, তবে আমাদের নাগরিক জীবনে তাহা স্বস্তি আনিবে না কোনো অর্থেই। কিন্তু তাহার অর্থ এই নহে যে, যাবতীয় অবৈধ বাণিজ্যকে মানবিক বৈধতার সীলমোহর পরাইয়া অরাজকতা আরো বৃদ্ধি করা। আমাদের মূল প্রশ্ন কিছু সুবিধাভোগী ক্ষমতাবানদের অব্যবস্থাপনা ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করিবার হীন মানসিকতা লইয়া। নিউইয়র্কে এককালে যখন অশ্ব চলিবার মাটির রাস্তা ছিল, তখনও তাহার দুই ধারে পথচারীদের ফুটপাত ছিল সুনির্দিষ্টভাবে। জগত্ জুড়িয়া নিয়ম মানিবার বিধান যেইখানে পালন হইবার উদাহরণ দেখা গিয়াছে, সেইখানেই ‘উন্নতি’ তকমা তাহাদের পদাবনত হইয়াছে এক সময়। সুতরাং, নিয়ম, নিয়ম এবং নিয়ম। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভিতরে তাহা মানিয়া চলিতেই হইবে। তাহা হইলেই সকল সমস্যা অল্প অল্প করিয়া সমাধানের পথে আসিবে একদিন। রূপকথার আলাদীনের চেরাগ পাইয়া কোনো দেশ উন্নতি লাভ করে নাই। আমাদেরও উন্নতির সোপানে আসন পাতিতে হইলে নিয়ম-কানুন মানিয়া যাবতীয় অব্যবস্থাপনা হঠাইতেই হইবে।