‘শহীদ জননী’ জাহানারা ইমাম
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৩, ১৯:৪৬
‘শহীদ জননী’ জাহানারা ইমাম মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদের মা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বড় সন্তান শফি ইমাম রুমী শহীদ হলে তাঁকে সকল মুক্তিযোদ্ধা মা হিসেবে বরণ করে নেন। জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ু। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাবার কাছেই তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু। দশ থেকে বারো বছর বয়স পর্যন্ত কেটেছে কুড়িগ্রামে। বাল্যকাল থেকে শ্রেণিকক্ষের পড়াশুনার পাশাপাশি প্রচুর বই পড়তেন তিনি।
বাসায় নিয়মিত আসতো পত্র-পত্রিকা। বাড়িতে কলের গান ছিলো। আর ছিলো হারমোনিয়াম। সপ্তাহে দু-দিন তাঁকে গানের শিক্ষক এসে গান শিখিয়ে যেতেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নারী শিক্ষা আন্দোলন, মুসলিম সমাজের জাগরণে বেগম রোকেয়ার সাধনা—এসব বিষয়ের ওপর রচিত বই তাঁর মেধা ও মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।
১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন রংপুর থেকে। আইএ পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। এই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৬০ সালে প্রথম শ্রেণিতে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানডিয়াগো স্টেট কলেজ থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন।
শিক্ষকতার মাধ্যমে জাহানারা ইমামের কর্মজীবন শুরু হয়। সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে ১৯৪৮-৪৯ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী গার্লস হাই স্কুলে ছিলেন। বিয়ের পর ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যুক্ত হন। এরপর তিনি বুলবুল একাডেমির কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী এবং পরে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বাংলা একাডেমীর কার্যনির্বাহী পরিষদে ১৯৮০-৮২ সাল পর্যন্ত সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটে খণ্ডকালীন চাকরি করেছেন। ঢাকা বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেছেন।
১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট শরীফুল আলম ইমাম আহমদের সঙ্গে জাহানারা বেগমের বিয়ে হয়। শরীফ ইমাম ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ১৯৫১ সালের ২৯ তাঁদের পরিবারে জন্ম হয় শফি ইমাম রুমীর। এই রুমীই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন দুঃসাহসী গেরিলার ভূমিকায় ছিলেন। স্বাধীনতার পর শহীদ রুমী বীরবিক্রম (মরণোত্তর) উপাধিতে ভূষিত হন। প্রাণপ্রিয় সন্তান রুমীকে ঘিরেই জাহানারা ইমাম রচনা করেন অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’।
১৯৫৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তাদের দ্বিতীয় সন্তান সাইফ ইমাম জামী জন্মগ্রহণ করে। তাঁর স্বামী শরীফুল আলম ইমাম ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর মারা যান। ১৯৮২ সালে জাহানারা ইমাম আক্রান্ত হলেন ক্যান্সারে। এদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন জাহানারা ইমাম। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠন করলেন ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। ২৮ মার্চ ১৯৯৩ নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম। তিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান রাজপথে। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয়। এ সময় খুব দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ২ এপ্রিল চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি মারা যান।