গাজীপুর সিটি নির্বাচন

আওয়ামী লীগের এত ভোট কোথায় যাবে?

চার সিটি করপোরেশনের পর আবারো ভোটারদের মুখোমুখি হচ্ছে দেশের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক জোট ১৮ দল ও ১৪ দল। নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণ আগামী ৬ জুলাই। যতই বলা হোক স্থানীয় সরকার নির্বাচন কিন্তু গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রার্থীদের ভরাডুবির পর আলোচনা হচ্ছে যে ভোট হয়েছে জাতীয় ইস্যুতে। অর্থাত্ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক জয়-পরাজয় হয়েছে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে। এবার কি হবে গাজীপুরে? গণমাধ্যমে যা আলোচনা হচ্ছে, আর সরজমিনে যারা যাচ্ছেন তারা বলছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব পড়বে চার মহানগরের। যদিও গাজীপুরের আওয়ামী লীগ নেতারা জোর দিয়েই বলছেন গাজীপুর আওয়ামী লীগের বড় ভোট ব্যাংক, তাই সাংগঠনিক জোরে লড়ছেন আজমত উল্লাহ। আর তার সঙ্গে আছেন বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী দলের চার এমপি। একজন এমপি মেহের আফরোজ চুমকি প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় তিনি নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারছেন না। যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। কিন্তু ফিরে এসে কেউই জোর দিয়ে বলছেন না যে আজমত উল্লাহ জিততে পারবেন। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে গাজীপুরের পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কা যে ভোট পেয়েছিল তা কি সবই উল্টে যাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে। পাঁচ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পাওয়া মোট ভোটের পরিমাণ ছিল ১০ লাখের বেশি। আর বিএনপির পাঁচ প্রার্থী পেয়েছিলেন ৫ লাখ ৬১ হাজার ভোট। বলা যায়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনায় থাকলে কিভাবে তাদের জনপ্রিয়তা কমে যায় তার প্রমাণ হবে গাজীপুরে। বিগত সংসদ নির্বাচনের একটি আসনে কিন্তু প্রার্থী হয়েছিলেন এবারের শক্তিশালী মেয়র প্রার্থী এম এ মান্নান। গাজীপুর-৩ আসনে নৌকা প্রতীকে অ্যাডভোকেট রহমত আলী পেয়েছিলেন ২ লাখ ৩৭ হাজার ভোট আর এম এ মান্নান পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮ হাজার ভোট। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন ১ লাখ ২৯ হাজার ভোটে। যদিও এই আসনটি সিটি করপোরেশনের বাইরে শ্রীপুর উপজেলায়, অবশ্য এর সঙ্গে ছিল গাজীপুর সদরের দুটি ইউনিয়ন যা এবারের সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গাজীপুর-১ আসনে কালিয়াকৈর উপজেলা ছাড়াও গাজীপুর সদরের ৩টি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আকম মোজাম্মেল হক পেয়েছিলেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৩০৪ ভোট। আর বিএনপির প্রার্থী চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩৫। পার্থক্য ৮৭ হাজার ৪৬৯ ভোট। গাজীপুর-২ আসনটি সদর উপজেলা ও টংগী থানা সঙ্গে দুটি পৌরসভা ও ২টি ইউনিয়ন। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহিদ আহসান রাসেল ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৩২ ভোটে পরাজিত করেছিলেন বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারকে। জাহিদ আহসান পেয়েছেন ২ লাখ ৬৪ ৭১০ ভোট। হাসান উদ্দিন সরকার পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৮ ভোট। গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তানজীম আহমেদ সোহেল বিএনপি প্রার্থী আবদুল মজিদকে পরাজিত করেছিলেন ৪৬২১৬ ভোটে। গাজীপুর-৫ আসনে কালিগঞ্জের সঙ্গে গাজীপুর সদরের ২টি ইউনিয়নও আছে। এই আসনে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ বিএনপি’র প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক মিলনকে হারিয়েছিলেন ৫১ হাজার ১৮০ ভোটে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৮। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৭৭ এবং মহিলা ৪ লাখ ৯৯ হাজার ১৬১। এখানে আরো উল্লেখ করা যায় যে, বিগত সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের পাঁচ আসনে জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী ছিল না। সংবাদ মাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে, গাজীপুরের নির্বাচনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর একটি হচ্ছে জাহাঙ্গীর নাটক, অন্যটি হচ্ছে জাতীয় পার্টির সমর্থন। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাকে আশ্বাস দেয়ায় অশ্রুসজল চোখে সে আজমত উল্লাহকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ব্যালট পেপারে থেকে যাবে তার নাম। এটি ভালোভাবে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও। আর জাহাঙ্গীর নাটক শেষ না হলেও শুরু হয়েছে জাপা নাটক। মন্ত্রিসভার দুই সদস্য ওবায়দুল কাদের ও জাহাঙ্গীর কবীর নানক বৈঠক করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও একান্ত বৈঠক করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গে। কিন্তু রবিবার পর্যন্ত গণমাধ্যমে যেসব সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় গাজীপুরে মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য করবে না জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা। যদিও গাজীপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি কাজী মাহমুদ হাসান মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও পরে তা প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পরও যখন এইচ এম এরশাদ কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা দেন যে আগামী নির্বাচন জাতীয় পার্টি এককভাবে করবে, তখন তার ইঙ্গিত বুঝে নিতে কষ্ট হয় না গাজীপুরের জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের। গাজীপুরের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বলছেন, হেফাজতের সহযোগিতায় প্রচারে ১৮ দলীয় জোট সমর্থক এম এ মান্নান এগিয়ে থাকলেও তারা আস্থা রাখতে চান ভোটারদের ওপর। টংগী পৌরসভার তিনবারের মেয়র আজমত উল্লাহ। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা আরো বলছে যে চারটি সিটি করপোরেশনে বিদায়ী মেয়ররা পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু আজমত উল্লাহ সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন না। উল্টো সরকারের শেষ সময়ে এসে গাজীপুরের মেয়ে মেহের আফরোজ চুমকিকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। কিন্তু তারও পাল্টা যুক্তি আছে যে মেহের আফরোজ চুমকি প্রতিমন্ত্রী হবার পর অনুষ্ঠিত তার নিজ নির্বাচনী এলাকা কালীগঞ্জ পৌরসভায়ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। ফলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা অবশ্য জানলেন, গাজীপুরের এবারের ভোট হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ ইস্যুতে। আজমত উল্লাহ টংগীর মানুষ, তাই তিনি উত্তরের আর এম এ মান্নান সালনার তাই দক্ষিণের। তিনি একথাও জানালেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডের ভোটের ওপর জয়- পরাজয় নির্ভর করবে। এগুলোতে ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এছাড়াও এরশাদনগর, রাজেন্দ্রপুর, বাসন, কোনাবাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, কাশিমপুর, টংগী দিলু মার্কেটের ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। লেখক :এডিটর (আউটপুট-ইনপুট), এটিএন নিউজ pranab67@gmail.com